in

সুইজারল্যান্ড কেন একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র?

কয়েক শতক ধরে, সুইজারল্যান্ড নামক ছোট্ট আল্পাইন দেশটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে আসছে। এমন নয় যে সুইজারল্যান্ডই বিশ্বের একমাত্র নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। একই খেতাব রয়েছে আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া কিংবা কোস্টারিকার মতো দেশগুলোর নামের পাশেও।

এই দেশগুলোও কখনো অন্য কোনো দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলায় না, কিংবা দুই বা ততোধিক ভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান বিবাদ-সংকটে পক্ষপাত করে না। কিন্তু তারপরও, অন্য দেশগুলোর চেয়ে সুইজারল্যান্ডই বেশি সম্মানিত ও পরিচিত নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে। একই সাথে তারা সবচেয়ে প্রাচীনও বটে। কীভাবে বৈশ্বিক রাজনীতির মানচিত্রে সুইজারল্যান্ড দখল করে নিল এমন স্বতন্ত্র একটি স্থান?

সরকারিভাবেই একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ড; Image Source: Getty Images

সুইজারল্যান্ড সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতেই রয়েছে নিরপেক্ষতার বিষয়টি। সেখানে তারা মোট পাঁচটি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেছে। সেগুলো হলো:

  • যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকা
  • নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করা
  • বিবদমান বা যুদ্ধরত দেশগুলোতে যুদ্ধ সামগ্রী রপ্তানির ক্ষেত্রে সাম্য নিশ্চিত করা
  • যুদ্ধরত দেশগুলোতে বেতনভোগী সৈন্য না প্রেরণ করা
  • যুদ্ধরত দেশগুলোকে নিজেদের অঞ্চল ব্যবহার করতে না দেয়া

চার নম্বর পয়েন্টটি খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই: যুদ্ধরত দেশগুলোতে বেতনভোগী সৈন্য না প্রেরণ করা। এটিই মূলত সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পেছনে প্রধান ভিত্তি।

মধ্যযুগীয় ইউরোপে যুদ্ধজয়ের ক্ষেত্রে সুইসদের মুনশিয়ানা ছিল অদ্বিতীয়। যুদ্ধ করাকে একটি শিল্পে পরিণত করেছিল তারা, এবং বিভিন্ন যুদ্ধরত দেশকে সৈন্য ধার দেয়ার মাধ্যমে দারুণ একটি ব্যবসাও ফেঁদে ফেলেছিল তারা। কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নয়, স্রেফ অর্থনৈতিক কারণেই বিভিন্ন দেশকে বেতনভোগী সৈন্য দিয়ে সাহায্য করত তারা। আর এছাড়া তাদের তখন উপায়ও ছিল না।

প্রাচীন সুইস কনফেডারেসি ছিল খুবই দরিদ্র একটি দেশ। বৃহৎ পরিসরে কৃষিকাজের সুযোগ ছিল না সেখানে। তাদের ছিল না কোনো উপনিবেশিক সম্পদের উৎসও, এবং ছিল না সরাসরি সমুদ্রের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থাও। ফলে বাণিজ্যের দিক থেকেও তারা বেশ পিছিয়ে ছিল। এরকম একটি অবস্থায় মার্সিনারি বা বিভিন্ন দেশকে সৈন্য ধার দেয়াই ছিল তাদের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস।

ভৌগোলিক কারণেই ইউরোপে সুইজারল্যান্ডের ছিল বিশেষ গুরুত্ব; Image Source: Getty Images

যুদ্ধে যেহেতু সুইসরা অনেক ভালো ছিল, তাই এ খাত থেকে তারা বেশ ভালোই আয় করছিল – যতদিন না তারা হারের সম্মুখীন হয়। সেই হারটি আসে ১৫১৫ সালে, ব্যাটল অব মারিগনানোতে। সেবার ফরাসি ও ভেনেশিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় সুইসরা। প্রতিপক্ষ শিবির যুদ্ধের ময়দানে এসেছিল কামান ও সশস্ত্র অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে। অপরদিকে সুইসদের সঙ্গে ছিল বর্শা ও বল্লম। দুর্ভাগ্যক্রমে, যুদ্ধ কৌশলে যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পরও, শেষ পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির কাছে হাঁটু গেড়ে হার মানতে বাধ্য হয় সুইসরা।

সেই হারের পর বোধোদয় হয় সুইসদের। তারা উপলব্ধি করে, যোদ্ধা হিসেবে তারা যত ভালোই হোক না কেন, উন্নত প্রযুক্তির বিরুদ্ধে তাদের কিছুই করার নেই। আর তাছাড়া তারা অতটা সম্পদশালীও নয় যে নিজেরাও যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে। তাই তখন থেকেই সুইসরা ইউরোপের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বগুলোতে অংশগ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়। এর পরিবর্তে, তারা নিজেদেরকে ইজারা দিয়ে দেয় ফরাসিদের কাছে। কিন্তু ফরাসিদের অধীনে চলে যাওয়ার পরও তাদের সমস্যা মেটেনি। যেহেতু ইতিপূর্বে সুইসরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে সাহায্য করেছে, তাই অনেক সময়ই দেখা যেত যে ফরাসিদের কোনো একটা যুদ্ধে তারা দুই পক্ষের সাথেই জড়িয়ে পড়েছে। আর তখন তাদেরকে সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতে হতো, না জানি কখন কোন পক্ষ তাদের উপর হামলা চালিয়ে বসে।

একটা সময় পর্যন্ত অসংখ্য যুদ্ধ করেছে সুইসরা; Image Source: Epic World History

মোদ্দা কথা হলো, ততদিনে সুইসরা এত বেশি যুদ্ধের সাথে নিজেদের নাম জড়িয়ে ফেলেছে ও বিভিন্ন পক্ষকে সাহায্য করেছে যে, তাদের পক্ষে আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো পক্ষ নেয়া সম্ভব ছিল না, এবং তা বিশ্বাসযোগ্যও হতো না। তাই সুইসরা তখন থেকেই ভাবতে থাকে, কীভাবে সব পক্ষের সাথে সংশ্লিষ্টতা ঝেড়ে ফেলে, পুরোপুরি নিরপেক্ষ হয়ে যাওয়া যায়।

কিন্তু তখনো আরেকটি বড় সমস্যা রয়েই গিয়েছিল। ভৌগোলিক কারণে, অর্থাৎ আল্পস পর্বতমালাকে ঢেকে রাখায়, ইউরোপের বৃহৎ শক্তিরা সব সময়ই চাইত সুইজারল্যান্ডকে নিজেদের করে পেতে।

সুইজারল্যান্ডের রয়েছে শক্তিশালী সেনাবাহিনী; Image Source: rt.com

এই সমস্যা একটা সময় চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। ফরাসি বৈপ্লবিক যুদ্ধের সময় সুইসরা ফরাসি রাজতন্ত্রের পক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়। এবং নেপোলিয়নের যুদ্ধগুলোর সময় ফ্রান্স সুইজারল্যান্ড আক্রমণ করে পুরনো কনফেডারেসি ভেঙে দেয়। আর তাই ১৮১৪-১৫ সালে কংগ্রেস অব ভিয়েনায় গিয়ে সুইসরা এমন একটি প্রস্তাব দেয়, যাতে করে গোটা মহাদেশের জন্যই সুবিধাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। তারা বলে, “আমাদেরকে নিরপেক্ষ হতে দাও।”

এখন একটি ব্যাপার খেয়াল করে দেখুন: ছোটখাট কিংবা অপ্রভাবশালী কোনো দেশ যদি নিরপেক্ষ হতে চায়, তাতে বড় দেশগুলোর কিছু যায় আসে না। কিন্তু কোনো প্রভাবশালী দেশ যদি নিরপেক্ষতা বেছে নেয়, তাতে প্রায় সব বড় দেশেরই কিছু না কিছু লাভের রাস্তা খোলা থাকে। ততদিনে ইউরোপে সুইজারল্যান্ড হয়ে উঠেছে তেমনই একটি নিরপেক্ষ দেশ, যে কারণে বড় দেশগুলো তাদের নিরপেক্ষ হওয়ার দাবি মেনে নেয়।

রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাও নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সুইজারল্যান্ডের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করে। এর সূত্র ধরেই ১৮৬৪ সালে জেনেভা কনভেনশন হয়, এবং ১৯০১ সালে রেড ক্রস প্রতিষ্ঠার সুবাদে শান্তিতে প্রথম নোবেল পুরস্কারটি জিতে নেন সুইজারল্যান্ডের হেনরি ডুনান্ট। এভাবে ইউরোপের “নরম শক্তি” হিসেবে আবির্ভূত হয় সুইজারল্যান্ড, যারা সরাসরি কোনো হুমকি নয়, কিন্তু তারপরও সমীহ জাগাতে সক্ষম।

জেনেভায় অবস্থিত রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট মিউজিয়াম; Image Source: Getty Images

অবশ্য বিশ্বযুদ্ধগুলো সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষ খেতাবের জন্য একটি “লিটমাস টেস্ট” হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন তারা নাজি জার্মানির কাছ থেকে ইহুদি স্বর্ণ কেনে, অথচ ইহুদিদের আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে করে বিশ্বব্যাপী প্রচুর বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অনেকেই সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে থাকে। তবে এর জবাবটাও সুইসদের কাছে ভালোভাবেই ছিল, “কই, আমরা তো সরাসরি যুদ্ধে জড়াইনি!”

অনেকের মনেই আরেকটি প্রশ্ন আসতে পারে, সুইজারল্যান্ড যদি আসলেই নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়, তাহলে তাদের সেনাবাহিনীর কী প্রয়োজন! এ প্রশ্নেরও সদুত্তর পাওয়া যাবে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতেই। দুই নম্বর পয়েন্টে বলা আছে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই দেবে। আর সেজন্যই তাদের রয়েছে সশস্ত্র সেনাবাহিনী। কেননা তারা নিজেরা নিরপেক্ষ হলে কী হয়েছে, অন্য কোনো দেশ যে তাদের আক্রমণ করে বসবে না, এমন তো কোনো নিশ্চয়তা নেই।

জেনেভায় রয়েছে জাতিসংঘের কার্যালয়; Image Source: Glassdoor

শেষ করা যাক একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে। বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের যে প্রধান চারটি কার্যালয় রয়েছে, তার মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তমটির অবস্থান সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। অথচ তা সত্ত্বেও, দেশটি জাতিসংঘের সদস্য হয়েছে মাত্র ২০০২ সালে। এবং এখনো তারা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য নয়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

যেভাবে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে মানুষের সঙ্গী হলো ছাতা

কেন অতীতে ছবি তোলার সময় মানুষ হাসত না?