in

কেন কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেয়া হয় ভারতের রাজধানী?

১৯৩১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নয়া দিল্লি যাত্রা শুরু করে অবিভক্ত ভারতবর্ষের নতুন রাজধানী হিসেবে। কিন্তু বললাম আর হয়ে গেল, বিষয়টি মোটেই তেমন ছিল না। রাজা পঞ্চম জর্জের মাধ্যমে নতুন রাজধানী হিসেবে নয়া দিল্লির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল সেই ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর, দিল্লি দরবার নামক রাজকীয় অনুষ্ঠানে। এরও ২০ বছর পর, ১৯৩১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, ভারতের গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয় লর্ড আরউইন নতুন রাজধানী হিসেবে উদ্বোধন ঘোষণা করেন নয়া দিল্লির।

কিন্তু কেন?

এই ‘কেন’ মূলত দুইটি প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রথম ‘কেন’-র মানে, ভারতের রাজধানী কেন কলকাতা (তৎকালীন ক্যালকাটা) থেকে সরিয়ে নয়া দিল্লিতে নিয়ে আসা হলো। আর দ্বিতীয় ‘কেন’ অর্থ, কেন রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে নয়া দিল্লিকে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলো।

১৯১১ সালের দিল্লি দরবার; Image Source: Wall Street Journal

প্রায় ১০৮ বছর পূর্বে, ভারতের তখনকার ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ, তার লেখা একটি চিঠিতে ব্যাখ্যা করেছিলেন কেন গ্রেট ব্রিটেনের উচিৎ তাদের ভারতীয় ঔপনিবেশিক রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া উচিৎ।

চিঠিটি ১৯১১ সালের ২৫ আগস্ট পাঠানো হয়েছিল সিমলা থেকে লন্ডনে। প্রাপকের ঘরে নাম লেখা ছিল তৎকালীন সেক্রেটারি অভ স্টেট ফর ইন্ডিয়া, আর্ল অভ ক্রুইর। হার্ডিঞ্জ সেখানে গুরুত্বারোপ করেছিলেন ভারতের চরমভাবাপন্ন এলাকা কলকাতা থেকে গোটা অঞ্চলের শাসনকার্য পরিচালনা করতে গিয়ে উদ্ভূত বিশৃঙ্খলার ব্যাপারে। তিনি সেখানে আরো লিখেছিলেন, রাজধানী হিসেবে ভারতবর্ষের প্রয়োজন আরো কেন্দ্রীভূত একটি শহর।

ভারতের রাজধানী হিসেবে কলকাতার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গেলে স্বভাবতই চলে আসবে বঙ্গভঙ্গের বিষয়টি

বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী দাঙ্গা; Image Source: Wikimedia Commons

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের শুরু থেকেই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি কিংবা অর্থনীতি ও বাণিজ্য, সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র ছিল কলকাতা। কিন্তু ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর, প্রশাসনিক সুবিধার্থে, বাংলাকে ভেঙে দুইভাগ করে দেয় ব্রিটিশরাজ। এক অংশে ছিল মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব বাংলা, অন্য অংশে হিন্দু অধ্যুষিত পশ্চিম বাংলা।

এভাবে বঙ্গভঙ্গ করা হয়েছিল “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতি অনুযায়ী। কিন্তু এ নীতি আঘাত হানে বাংলার — বিশেষত পশ্চিম বাংলার — মানুষের জাতীয়তাবাদী চেতনায়। তারা ঘোষণা দেয় সকল বিদেশী পণ্য বর্জনের। এবং বঙ্গভঙ্গ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন এক পর্যায়ে এমন চরম রুপ নেয় যে, বোমাবাজি ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড পরিণত হয়ে কলকাতার নিত্যকার ঘটনায়।

কলকাতার আকাশ-বাতাস যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, তখন লর্ড হার্ডিঞ্জ বেশ ভালোভাবেই বুঝে গিয়েছিলেন কলকাতা আর তাদের জন্য শাসনকার্য পরিচালনার উপযোগী, মিত্রাভাবাপন্ন শহর নেই। তাই তিনি চাইছিলেন যত দ্রুত সম্ভব এই শহর ত্যাগ করতে।

হার্ডিঞ্জ তার পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনার কথা লিখে পাঠান, এবং তা অনুমোদন পেয়ে যায় রাজা পঞ্চম জর্জের মাধ্যমে। তিনি ঘোষণা দেন কলকাতার পরিবেশ ঠাণ্ডা করতে বঙ্গভঙ্গ রদ করার, কিন্তু সেই একই সাথে অতিসত্ত্বর রাজধানী অন্য কোথাও স্থানান্তরেরও।

দিল্লি দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ; Image Source: Charterhouse

এছাড়া নয়া দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরের পেছনে ছিল আরো দুইটি প্রধান কারণ:

  • দিল্লিতে রাজধানী স্থাপনের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই যে, অতীতে ভারতবর্ষ শাসন করা বেশ কিছু সাম্রাজ্যেরও বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল এই দিল্লিই।
  • আরেকটি প্রধান কারণ অবশ্যই দিল্লির অবস্থান। কলকাতা যেখানে অবস্থিত দেশের পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে, সেখানে দিল্লির অবস্থান দেশের উত্তরাঞ্চলে। তাই ব্রিটিশরাজ বিশ্বাস করত কলকাতা অপেক্ষা দিল্লি থেকেই সমগ্র ভারতবর্ষ শাসন করা তাদের জন্য সুবিধাজনক হবে।

এখন নিশ্চিতভাবেই আপনার মনে প্রশ্ন জন্মাচ্ছে, রাজা পঞ্চম জর্জের ঘোষিত ‘অতিসত্ত্বর’ বলতে কি ২০ বছর বোঝায়? অবশ্যই না। তাহলে কেন ১৯১১ সালে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হতে হতে ১৯৩১ সাল চলে এলো? তার পেছনেও রয়েছে কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণ

নিঃসন্দেহে শাহজাহানবাদ (পুরনো দিল্লি) ছিল মুঘল যুগের রাজধানী। কিন্তু তারপরও, ব্রিটিশদের ধারণ করার মতো পর্যাপ্ত যোগ্যতা তখনো ছিল না এই শহরের। তাই দুই ব্রিটিশ স্থপতি, স্যার এডউইন লুটিয়েন্স ও স্যার হারবার্ট বেকারের উপর দেয়া হয় শহরটিকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দায়িত্ব।

রাজধানী হিসেবে নতুন করে ঢেলে সাজানো হয় দিল্লিকে; Image Source: Wikimedia Commons

নতুন রাজধানীটিকে বের করে নিয়ে আসা হয় তৎকালীন অবিভক্ত পাঞ্জাব প্রদেশ থেকে, এবং ১৯২৭ সালে এর নামকরণ করা হয় “নয়া দিল্লি” হিসেবে।

প্রাথমিকভাবে সকলে ভেবেছিল, নতুন রাজধানীটিকে প্রস্তুত করে ফেলতে প্রয়োজন হবে বড়জোর চার বছর। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এসে নষ্ট করে দেয় যাবতীয় পরিকল্পনা। তাই তো চার বছর শেষমেষ গিয়ে স্পর্শ করে বিশ বছর।

প্রথম বিশযুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশরাজ। তাই তাৎক্ষণিকভাবে নয়া দিল্লিতে নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তাদের হাতে ছিল না।

যেমনটি বলা হয়ে থাকে, প্রথমে সিভিল লাইনসে সরকারের একটি অস্থায়ী আসন স্থাপন করে ব্রিটিশরা। ১৯১২ সালে সরকারি কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য একটি সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং-ও তৈরি হয়ে যায়, এবং রাইজিনা হিলে স্থাপিত হয় উত্তর ও দক্ষিণ ব্লকগুলো।

যেভাবে কাজ এগোচ্ছিল, তাতে লুটিয়েনস ও বেকারের পক্ষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে ফেলা খুব একটা অসম্ভব ছিল না। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল ও অর্থনৈতিক সংকটে খেই হারিয়ে ফেলেন তারা, এবং নয়া দিল্লি পুরোপুরি সংস্কার হতেই লেগে যায় ১৯৩১ সাল। কেবল তারপরই সম্ভব হয় এটিকে অবিভক্ত ভারতবর্ষের নতুন রাজধানী হিসেবে উদ্বোধন।

সব মিলিয়ে কলকাতা থেকে যাবতীয় প্রশাসন নয়া দিল্লিতে স্থানান্তরের পেছনে খরচ হয়েছিল চার মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড।

১৯৩১ সালে ভারতের নতুন রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নয়া দিল্লি; Image Source: Wikimedia Commons

শেষ করার আগে জানানো আবশ্যক আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। লর্ড কার্জন, বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া প্রাক্তন ভাইসরয়, বিরোধিতা করেছিলেন রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার। হাউজ অভ লর্ডসে দেয়া এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ব্রিটিশরাজ অহেতুক তাড়াহুড়া করছে। পাশাপাশি তিনি এ-ও দাবি করেছিলেন যে, সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে ব্রিটিশরা বুঝি বাংলার উত্তপ্ত পরিবেশ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে।

দিল্লিতে নতুন রাজধানী স্থাপনের পেছনে হার্ডিঞ্জ এর ভৌগোলিক অবস্থান, মুঘল সাম্রাজ্যের সাবেক রাজধানী, এবং হিন্দুদের “পবিত্র কিংবদন্তী”-র যোগসূত্র থাকার কথা উল্লেখ করলেও, তা নাকচ করে দিয়েছিলেন কার্জন। তার দৃষ্টিতে, ব্রিটিশ ভারতে দিল্লির থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল মাদ্রাজ ও রেঙ্গুন। তাছাড়া দিল্লির মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী হওয়ার বিষয়টিকেও তিনি আমলে নিতে চাননি। তার মতে, মুঘলরা দিল্লিকে রাজধানী বানিয়েছিল “কেবল তাদের শাসনামলের ক্ষয়িষ্ণু সময়ে এসে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

প্রাচীন গ্রিস ও নগর-রাষ্ট্রের উদ্ভব

ক্রুসেডের কিছু অজানা ইতিহাস