in

দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস: জনমনে ভীতি সঞ্চারের নেপথ্যে

এটি ছিল হ্যালোইনের আগের দিন। ৩০ অক্টোবর, ১৯৩৮। হেনরি ব্রাইলস্কি যাচ্ছিলেন ওয়াশিংটন ডিসির অ্যাডামস মরগান অ্যাপার্টমেন্টে, ডেটিংয়ের জন্য তার প্রেমিকাকে তুলে নিতে।

গাড়ি চালাতে চালাতে এক ফাঁকে রেডিওটি চালিয়ে দিলেন তিনি। এবং তারপরই ২৫ বছর বয়সী আইনের ছাত্রটি শুনতে পেলেন এক চমকপ্রদ সংবাদ। একটি বিশালাকার উল্কাপিণ্ড নাকি আঘাত হেনেছে নিউ জার্সির এক খামারে। নিউ ইয়র্ক হয়েছে মার্শানদের (মঙ্গল গ্রহের অধিবাসী) আক্রমনের শিকার!

“আমি বুঝেছিলাম এটি আসলে নিছকই একটি ভাঁওতাবাজি,” বলেন ব্রাইলস্কি।

কিন্তু অন্যরা এতটা নিশ্চিত ছিল না। ব্রাইলস্কি যখন তার প্রেমিকার অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে পৌঁছালেন, তিনি দেখতে পেলেন তার প্রেমিকার বোন খুব তাড়াহুড়া করে নিজের বুটজোড়া পায়ে গলাচ্ছেন। “কারণ সে ভেবেছিল, সংবাদটি সত্য।”

কিন্তু আসলে সংবাদটি সত্য ছিল না। সেদিন সিবিএস রেডিওর শ্রোতারা যা শুনেছিলেন, তা ছিল অরসন ওয়েলসের “মার্কারি থিয়েটার গ্রুপ” পরিচালিত একটি নাটক। নাটকটি ছিল ৪০ বছর আগে এইচ জি ওয়েলস রচিত “দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস” নামক উপন্যাসটির রেডিও রূপান্তর।

কিন্তু এক্ষেত্রে অরসন ওয়েলসের নিজের ধারাভাষ্যে বর্ণিত নাটকটির চিত্রনাট্য এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, এবং সেটি এতটাই নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হচ্ছিল যে, শুনলে যে কারোই মনে হবে এটি বুঝি কোনো বাস্তব সংবাদ। মঙ্গল গ্রহের অধিবাসীরা প্রকৃতপক্ষেই হানা দিয়েছে পৃথিবী নামক গ্রহটিতে।

নাটকটি রেকর্ডের সময় অরসন ওয়েলস; Image Source: AP

হাজার হাজার মানুষ, মঙ্গল গ্রহের অধিবাসী কর্তৃক আক্রমণের সংবাদটি বিশ্বাস করে, সংবাদপত্র অফিস, রেডিও ও পুলিশ স্টেশনে ফোন কলের বন্যা বইয়ে দিতে থাকে। সবার মনে তখন একটিই প্রশ্ন: কীভাবে শহর ছেড়ে পালানো যায়, কিংবা গ্যাস আক্রমণ থেকে নিজেদের বাঁচানো যায়। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তো এমনকি এতটাই ভীত ও হিস্টেরিয়াগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যে, তাদের জন্য জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনও পড়েছিল।

ভাঁওতাটি কাজে লেগেছিল, এমনটিই বিশ্বাস ইতিহাসবিদদের। এর নেপথ্যের ব্যাখ্যাও রয়েছে তাদের কাছে। “নাটকের উপস্থাপনাটি ছিল হুবহু সেরকম, যেরকমভাবে জরুরি অবস্থায় সংবাদ প্রচার করে থাকে রেডিওগুলো।”

এ ব্যাপারে আরো সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন মিচেল হিলমস, ম্যাডিসনের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের যোগাযোগ বিষয়ের একজন অধ্যাপক, যিনি একই সাথে Radio Voices: American Broadcasting, 1922-1952 নামক বইটিরও লেখক।

“শ্রোতারা সেদিন শুনতে পেয়েছিল যে নির্ধারিত অনুষ্ঠানমালা মাঝপথে থেমে যাচ্ছে, এবং সেখানে শুরু হচ্ছে ব্রেকিং নিউজ। এরপর স্টেশনটি সরাসরি চলে যায় নিউ জার্সির যেখানে আক্রমণটি হয়েছে, সেখানে উপস্থিত একজন লাইভ রিপোর্টারের কাছে। এবং অনুষ্ঠানটি মাঝপথে পৌছানোর আগেই, রেডিও স্টেশনটি নিজেরাও হামলার সম্মুখীন হয়।”

ওয়েলসের বয়স তখন সবে ২৩; Image Source: AP

দেরিতে টিউন করার ফল

অরসন ওয়েলস এবং তার দল আগেও “দ্য কাউন্ট অব মন্টে ক্রিস্টো” কিংবা “ড্রাকুলা”-র মতো জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোকে নাটকে রূপান্তরিত করেছিলেন। ‘দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস” নাটকটি সম্প্রচারের আগেও সিবিএস রেডিও স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিল যে এটি একটি নাটক, যার কাহিনী নেয়া হয়েছে এইচ জি ওয়েলসের একটি উপন্যাস থেকে।

কিন্তু অনেক শ্রোতাই শুরুর সে অংশটি শোনেনি। কেননা অনুষ্ঠানটি যখন শুরু হয়, তখন তারা এনবিসি রেডিও নেটওয়ার্কে জনপ্রিয় “চেস অ্যান্ড স্যানবর্ন আওয়ার” অনুষ্ঠানটি শুনছিল, যেখানে ছিলেন ভেন্ট্রিলোকুইস্ট এডগার বারজেন এবং তার ডামি চার্লি ম্যাকার্থি।

অনুষ্ঠানটি দশ মিনিট চলার পর এর প্রধান তারকা যখন খানিকক্ষণের জন্য বিরতিতে যান, তখন অনেক শ্রোতাই ডায়াল ঘুরিয়ে সিবিএস রেডিওতে দেন, যেখানে চলছিল “দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস” নাটকটি। ওই মুহুর্তে তারা শুনতে পান নিউ ইয়র্কের হোটেল পার্ক প্লাজা থেকে অর্কেস্ট্রা বাজাচ্ছেন র‍্যামন র‍্যাকুয়েলো।

আদতে অর্কেস্ট্রাটি বাজানো হচ্ছিল সিবিএসের স্টুডিও থেকে। নৃত্যসংগীতটি কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়, এবং শুরু হয় জরুরি নিউজ বুলেটিন। শোনা যায় ওয়েলসের কণ্ঠস্বর, যিনি অভিনয় করছিলেন এক জ্যোতির্বিদের ভূমিকায়। তিনি জানান, মঙ্গল গ্রহে নাকি বেশ কিছু দ্যুতিময় গ্যাসের বিস্ফোরণ ঘটেছে।

মার্শানদের পৃথিবী আক্রমণ নিয়ে কাহিনী নাটকটির; Image Source: National Geographic

এর কিছুক্ষণ পরই প্রচারিত হয় আরেকটি নিউজ বুলেটিন, যেখানে বলা হয় গ্রোভার্স মিল, নিউ জার্সির নিকটে একটি খামারে নাকি বিশাল একটি জ্বলন্ত বস্তু আঘাত হেনেছে। এক সংবাদপাঠক বর্ণনা করেন কীভাবে একটি মহাকাশযান থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে এক ভিনগ্রহবাসীকে।

উত্তেজিত কণ্ঠে সংবাদপাঠক বলেন, ‘হায় ঈশ্বর! ছায়ার ভেতর থেকে মোচড় দিয়ে কিছু একটা বেরিয়ে আসছে। দেখে মনে হচ্ছে এটি যেন ভেজা চামড়ার মতো পিচ্ছিল। কিন্তু তার মুখ, এটি, এটি যেন বর্ণনারও অতীত!”

সংবাদপত্র বনাম রেডিও

সময়টা তখন ১৯৩৮। বিশ্ব রাজনীতির অবস্থা খুবই ভয়াবহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগমনধ্বনি বেজে গেছে ইতিমধ্যেই। তাই শ্রোতারা সর্বদাই সচকিত, উৎকণ্ঠিত। আর “দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস” নাটকটি যে আঙ্গিকে প্রচারিত হচ্ছিল, অর্থাৎ নিউজ বুলেটিন ও উত্তেজিত ধারাভাষ্য, তা ছিল অনেকটাই রেডিও কর্তৃক “মিউনিক ক্রাইসিস” (ইউরোপীয় শক্তিদের একটি সম্মেলন, যাকে মনে করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তাবনা হিসেবে) এর কভারেজের মতো।

“ওয়েলস ও তার দল সাম্প্রতিক সময় রেডিওতে প্রচারিত সংবাদ কভারেজের ধরন ও আঙ্গিককে খুব কাছাকাছি পর্যন্ত অনুকরণ করতে পেরেছিলেন,” বলেন এলিজাবেথ ম্যাকলিওড, একজন সাংবাদিক, সম্প্রচার বিষয়ক ইতিহাসবিদ, এবং ১৯৩০-এর দশকের রেডিও বিশেষজ্ঞ। “কিছু শ্রোতা তো কেবল ‘গুলি নিক্ষেপ হচ্ছে’ কথাটি শুনেছিল, এবং ভেবে নিয়েছিল এটি নির্ঘাত হিটলারের কাজ।”

যেমন ছিল সংবাদপত্রে সংবাদটির উপস্থাপন; Image Source: The Telegraph

একই সাথে এটি ছিল সেই সময়, যখন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ক্রমশই একটি জনপ্রিয় ঘরানা হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করেছে। আর তাই মঙ্গল গ্রহের অধিবাসী কর্তৃক পৃথিবীর আক্রমণ হওয়ার বিষয়টিও অনেকের কাছে বাস্তবসম্মতই ঠেকেছিল।

“আমরা তখন ছিল মহাকাশ বিষয়ে নতুন নতুন সব বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের দ্বারপ্রান্তে। বাইরের দেশ থেকেও ইতিমধ্যেই আমরা হামলার শিকার হচ্ছিলাম, তাহলে মহাশূন্য থেকে কেন নয়?” প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন হিলমস।

ভীতসন্ত্রস্ত শ্রোতারা রখন রাস্তায় নেমে আসে, নিজেদের সেলারে গিয়ে লুকিয়ে পড়তে থাকে, কিংবা নিজেদের বন্দুক লোড করে রাখে। পরের দিন নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিওয়ার্ক, নিউ জার্সির ২০টির মতো পরিবার নাকি ভেজা তোয়ালে মুখে চেপে তাদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে, যাতে করে মার্শান বিষাক্ত গ্যাস থেকে নিজেদের রক্ষা করা যায়।

তবে ইতিহাসবিদরা এ-ও দাবি করেন যে, সংবাদপত্রে মানুষের হিস্টেরিয়ার বিষয়টি নাকি একটু বেশিই অতিরঞ্জিত আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল। এক হিসাব বলছে, মোট শ্রোতার মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশই নাকি সংবাদটিকে সত্য বলে মনে করেছিল। সে হিসেবে আতঙ্কিত মানুষের সংখ্যা এক মিলিয়নেরও কম হওয়ার কথা।

সংবাদপত্রে সংবাদটিকে খুবই অতিরঞ্জিত করে ছাপা হয়েছিল; Image Source: Pacific Standard

তাহলে কেন সংবাদপত্রে এমন অতিরঞ্জন? এর একটি প্রধান কারণ রেডিওর প্রতি সংবাদপত্রের ঈর্ষা। সংবাদপত্র কর্মীরা তখন রেডিওকে তাদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। মিউনিখ ক্রাইসিস কিংবা অনুরূপ জাতীয় ইস্যুগুলোতে রেডিও যেভাবে সংবাদপত্রের চেয়ে শ্রেয়তর কভারেজ দিয়েছে, তাতে সংবাদপত্র সংশ্লিষ্ট অনেকের মনেই ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছিল। তাই রেডিও সম্প্রচারের একটি খুঁত ধরা পড়তে, সেটিকে পুঁজি করে তিলকে তাল বানাতে তারা একদমই দেরি করেনি।

ম্যাকলিওডের মতে, “ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস প্রসঙ্গে এমন অতিরঞ্জনকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, এটি ছিল প্রিন্ট মাধ্যমের একটি প্রতিশোধ। প্রতিশোধ এ কারণে যে, আগের মাসেই সংবাদ প্রচারে রেডিওর কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল তারা।”

শ্রোতাদের কল্পনা শক্তিকে নাড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন ওয়েলস ও তার দল; Image Source: AP

কল্পনার শক্তি

শ্রোতাদের মধ্যে রেডিওর যে একটি স্বতন্ত্র প্রভাব ছিল, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ম্যাকলিওড ব্যাখ্যা করেন, “বিশেষত গ্রামীণ শ্রোতাদের কাছে, বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ থেকে শুরু করে সংবাদ, বিনোদন, সঙ্গ – সব ক্ষেত্রেই তাদের প্রাথমিক বিন্দু ছিল রেডিও।”

অরসন ওয়েলসও খুব ভালো করেই জানতেন, কীভাবে রেডিওর কাল্পনিক সম্ভাব্যতাকে কাজে লাগান সম্ভব। কল্পনা ও বাস্তবতার মাঝে যে ছেদ বিন্দু রয়েছে, সেটিকে উধাও করে দেয়ায় তার জুড়ি মেলা ছিল ভার।

“এমনকি চলচ্চিত্রেও কোনো স্পেশাল ইফেক্ট দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে বিশ্বাস করানো সম্ভব ছিল না যে হাডসন নদীর উপর দিয়ে ধেয়ে চলেছে বিশালাকার এলিয়েনরা। কিন্তু ওয়েলস তার শব্দ দিয়েই সেটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কারণ তিনি সাধারণ মানুষের কল্পনার জায়গাটিকে নাড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন,” বলেন হিলমস।

“দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস” আরো প্রমাণ করে, গণ যোগাযোগ কীভাবে নাটকীয় ইন্দ্রজাল সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে কিছু মানুষের মতে, এই নাটকের সম্প্রচারের ফলেই গণমাধ্যম সাধারণ মানুষের কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা খুইয়ে ফেলে।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের আরেক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এমনকি ওয়েলস নিজেও পরবর্তীতে পুড়েছিলেন আক্ষেপের অনলে। তিনি নাকি চিন্তাও করতে পারেননি তার কৌশলটির ফলাফল এত ভয়াবহ হবে। তাই তিনি বলেছিলেল, “আমার মনে হয় না আমরা আবার কখনো এমন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

আফ্রিকার প্রভাবশালী পাঁচ সাম্রাজ্য

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দুই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মৃত্যু: কাকতাল না অন্য কিছু?