in

কলম্বাস সম্পর্কিত কিছু অস্বস্তিকর সত্য

ইতিহাস সম্পর্কে অনেকেরই একটি অভিযোগ রয়েছে, তা হলো: ইতিহাস সব সময় সত্য কথা বলে না। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অনুরাগীর পক্ষেও এ অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই। কেননা বাস্তবিকই, ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের সামনে ভুল তথ্য পরিবেশন করে, যে কারণে কোনো ব্যক্তি বা ঘটনা সম্পর্কে আমাদের মধ্যে একদমই ভুল দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয়, বাস্তবের সাথে যার কোনো মিলই নেই।

বিকৃত বা অসত্য ইতিহাসের দরুণ কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে আমাদের মনে ভুল ধারণা জন্মেছে, এমন কথা ইতিহাসের যে চরিত্রটির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য, তিনি হলেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস। অনেকেই বিশ্বাস করে থাকে, কলম্বাসই নাকি নিনা, পিন্টা, সান্তা মারিয়ায় চড়ে আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন, এবং এ কাজ করতে গিয়ে তিনি এটিও নাকি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে পৃথিবী আসলে সমতল নয়।

এ বিশ্বাস কতটুকু সত্য? এক চিলতেও নয়। কলম্বাস সম্পর্কে এমন ভুল ধারণার কারণ হলো, বিশ্বব্যাপী অনেক স্কুল-কলেজেই শিক্ষার্থীদের কলম্বাস সম্পর্কিত ভুল ইতিহাস পড়ানো হয়েছে। তাই প্রকৃতপক্ষে কলম্বাস যে নির্ভীক হওয়ার পাশাপাশি নৃশংসও ছিলেন, এ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয় অনেকেই। কিন্তু এখন সময় এসেছে প্রকৃত বাস্তবতাটা জানার। তাই চলুন পাঠক, একে একে জেনে নিই কলম্বাস সম্পর্কিত অস্বস্তিকর সত্যগুলো

কলম্বাসের ব্যাপারে রয়েছে অনেকেরই নানা ভুল ধারণা; Image Source: BrainPop

কলম্বাস প্রমাণ করেননি পৃথিবী গোলাকার

পৃথিবী গোলাকার এ কথা কে প্রমাণ করেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে অনেক স্কুলপড়ুয়া শিশুই কলম্বাসের নাম বলবে। কেননা তাদের পাঠ্যপুস্তকে বলা হয়েছে, ১৪৯২ সালে কলম্বাস যখন ইস্ট ইন্ডিজে গমনের নতুন একটি সমুদ্রপথ খুঁজে বের করতে তার জাহাজ পানিতে ভাসিয়েছিলেন, তখন নাকি অনেকেই ভয় পেয়েছিল তার জাহাজ এক সময় পৃথিবীর প্রান্ত থেকে নিচে পড়ে যাবে, কেননা পৃথিবীকে যে সমতল বলে মনে করত মানুষ।

কিন্তু এমন তথ্যের ভিতর সত্যের চেয়ে মিথ্যার পরিমাণই বেশি। হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে অনেক মানুষই আগেকার দিনে বিশ্বাস করত পৃথিবী সমতল, এমনকি সেরকম মানুষ এই একবিংশ শতকেও বিদ্যমান। কিন্তু অন্য আরেকটি তথ্য ভুলে গেলে চলবে না যে, পৃথিবী যে সমতল নয়, এমন জ্ঞানের চর্চাও কিন্তু শুরু হয়েছে সেই খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে, যখন পিথাগোরাস লিখেছিলেন গোলাকার পৃথিবী সম্পর্কে। পরবর্তীতে একই কাজ করেছিলেন অ্যারিস্টটল এবং ইউক্লিডও। তাই ইতিহাসবিদদের মনে এতটুকুও সন্দেহ নেই যে, কলম্বাসের আমলে সকল শিক্ষিত ব্যক্তিই খুব ভালো করে জানত যে পৃথিবী গোলাকার।

সমতল পৃথিবীর কিংবদন্তী প্রচলিত ছিল কলম্বাসের সময়; Image Source: BahaiTeachings.org

এবং প্রকৃতপক্ষে, স্বয়ং কলম্বাসের কাছেও ছিল টলেমি রচিত “জিওগ্রাফি” নামক বইটির একটি কপি, যেটি রচিত হয়েছিল রোমান সাম্রাজ্যের সূর্য মধ্যগগণে থাকতে, কলম্বাস তার যাত্রা শুরুর ১,৩০০ বছর পূর্বে। এছাড়াও ইউরোপে ১২০০ থেকে ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝে আরো অনেকগুলো বই রচিত হয়েছিল পৃথিবীর আকৃতি সম্পর্কে। সেসব বইয়ের মধ্যে একটি হলো ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে রচিত “স্ফেয়ার”, যা ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হতো।

সুতরাং একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, কলম্বাস পৃথিবীর আকৃতি নিয়ে মোটেই ভাবিত ছিলেন না। তিনি যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন তার মনে যুক্তিসঙ্গত একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাওয়ার কথা, তা হলো: যে সমুদ্রটি তিনি পাড়ি দেয়ার পরিকল্পনা এঁটেছেন সেটি আদতে কত বিশাল।

এখানে আরেকটি তথ্যও আপনাদের সামনে তুলে ধরা যেরে পারে। অনেকেই মনে করে, আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেয়ার জন্য কলম্বাস ১৪৯২ সালে যে জাহাজগুলোতে যাত্রা করেছিলেন, সেগুলোর নাম বুঝি আসলেই নিনা, পিন্টা ও সান্তা মারিয়া। কিন্তু আসলে তা নয়। নিনার নাম মূলত ছিল লা গাল্লেগা, যাকে ইংরেজি করলে হয় “দ্য গ্যালিসিয়ান”। এছাড়া নিনা ছিল সান্তা ক্লারা নামক একটি জাহাজের ডাকনাম, এবং পিন্টাও সম্ভবত অন্য কোনো জাহাজেরই ডাকনাম ছিল, যদিও জাহাজটির প্রকৃত নাম এখন পর্যন্ত উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি।

কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেননি, এবং তিনি কখনো উত্তর আমেরিকায় পা-ও রাখেননি

১৪৯২ সাল থেকে কলম্বাস যে চারটি যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন তিনি ক্যারিবীয় বিভিন্ন দ্বীপে অবতরণ করেছিলেন। সেগুলোর কয়েকটি আজ বাহামা দ্বীপপুঞ্জ নামে পরিচিত, এবং অন্য একটি দ্বীপের নাম হিস্পানিওলা। এছাড়া তিনি কেন্দ্রীয় এবং দক্ষিণ আমেরিকার সমুদ্র উপকূলবর্তী বিভিন্ন দ্বীপেও নেমেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই উত্তর আমেরিকায় যাননি। তাছাড়া উত্তর আমেরিকায় ইতিমধ্যেই বহু বছর ধরে বসবাস ছিল নেটিভ আমেরিকান তথা আমেরিকার আদিবাসীদের। এবং জানিয়ে রাখা ভালো, কলম্বাস নিজেও কখনো মনে করেননি যে তিনি কোনো নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করেছেন।

অনেকেই কলম্বাসকে আমেরিকার আবিষ্কর্তা মনে করে; Image Source: Business Insider

আপনারা অনেকেই হয়তো নর্স অনুসন্ধানকারী লেইফ এরিকসনের নাম শুনে থাকবেন, যিনি কলম্বাসের জন্মেরও অন্তত ৫০০ বছর আগে কানাডায় পৌঁছেছিলেন। তাছাড়া অনেক ইতিহাসবিদ এটিও মনে করেন যে, ফিনিশীয় নাবিকরাও আরো অনেক আগেই আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিলেন।

এবং এবার আপনাদের জানাই এমন একটি বিষয়, যা হয়তো অনেকেই জানতেন না।

কলম্বাস ছিলেন একজন খুবই নির্মম ভাইসরয় ও গভর্নর

লরেন্স বারগ্রিন রচিত জীবনীগ্রন্থ “কলম্বাস” থেকে জানা যায়, এ ইটালীয় নাবিক ক্যারিবীয় দ্বীপগুলোতে গিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের উপর স্বৈরশাসন কায়েম করেছিলেন এবং ভাইসরয় ও গভর্নর হিসেবে তাদের উপর নানাভাবে অত্যাচার চালাতেন। এছাড়া তিনি স্প্যানিশ উপনিবেশগুলোতে গিয়েও আতঙ্ক ছড়িয়েছিলেন।

কলম্বাস ছিলেন খুবই নির্মম ও নৃশংস; Image Source: Snopes.com

যুক্তরাষ্ট্রে কেন পালন করা হয় “কলম্বাস ডে”?

পুরনো নথি ঘেঁটে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম “কলম্বাস ডে” পালন করা হয়েছিল নিউ ইয়র্কে, ১৭৯২ সালের ১২ অক্টোবর, অর্থাৎ যেদিন তিনি প্রথম আমেরিকায় অবতরণ করেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। এ দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য ছিল ইটালিয়ান-আমেরিকান ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। ১৯৩৭ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ঘোষণা দেন যে ১২ অক্টোবর তারিখটি যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালন করা হবে। ১৯৭১ সালে অবশ্য তারিখটি বদলে অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবারে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পালিত হয় কলম্বাস ডে; Image Source: Ask Ideas

বিভিন্ন কারণে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জায়গাতেই “কলম্বাস ডে”-র নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। বার্কলি, ক্যালফোর্নিয়ায় যেমন ১৯৯২ সালে কলম্বাসের অবতরণ করা দ্বীপগুলোর প্রকৃত বাসিন্দাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের লক্ষ্যে “কলম্বাস ডে” পালটে দিবসটির নাম রাখা হয় “ইন্ডিজিনিয়াস পিপলস ডে”। ১৯৮৯ সাল থেকে সাউথ ডাকোটার বাসিন্দারা দিবসটিকে ডাকতে থাকে “নেটিভ আমেরিকান ডে” হিসেবে। অ্যালাবামায় আবার দিবসটি পালন করা হয় “কলম্বাস ডে” এবং “ইন্ডিয়ান হেরিটেজ ডে”র সংমিশ্রণ হিসেবে। হাওয়াইয়ের মানুষ দিবসটির নাম দিয়েছে “ডিসকভারি ডে”।

এছাড়া অন্য অনেক দেশেই কলম্বাসকে স্মরণ করা হয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন ছুটির দিনে। উদাহরণস্বরূপ, বাহামা দ্বীপপুঞ্জে এ দিবসটিকে ডাকা হয়ে থাকে “ডিসকভারি ডে” নামে। আবার স্পেনে এ দিবসটির নাম ‘দিয়া দে লা হিস্পানিদাদ” এবং “ফিয়েস্তা নাসিওনাল”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

যে হত্যাকাণ্ড উসকে দিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধ

যেভাবে এল বাবা দিবস