in

টিম বার্নার্স-লি: সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘আনসাং হিরো’

সাল ১৯৯০। এক ৩৫ বছর বয়সী নিতান্তই তরুণ ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী প্রকাশ করলেন একটি বৈপ্লবিক ধারণার প্রস্তাবনা, যার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল কম্পিউটারকে একে অপরের সাথে যুক্ত করা সম্ভব। তিনি অনুধাবন করতে পারলেন, কী ভীষণ তাৎপর্যময় হতে চলেছে তার এই আবিষ্কার। তাই তো তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, বিনামূল্যে পৃথিবীকে বিলিয়ে দেবেন নিজের এই আবিষ্কার।

সেই সময় ঘুণাক্ষরেও হয়তো তিনি টের পাননি, পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেয়ার মতো এক আবিষ্কার সত্ত্বেও তিনি পরিণত হতে চলেছেন সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ “আনসাং হিরো”-দের একজনে।

যার কথা বলছি, তিনি টিম বার্নার্স-লি। এখনো হয়তো অনেক পাঠকই চোখ পিটপিট করছেন। কেননা এই নামের সাথে আপনারা পরিচিত নন। বিল গেটস, স্টিভ জবস কিংবা হালের মার্ক জাকারবার্গকে সম্ভবত আপনারা চেনেন ঠিকই, কিন্তু চেনেন না বার্নার্স-লিকে। স্বয়ং ইন্টারনেটের উদ্ভাবককে! কারণ ওই একটিই, নিজের আবিষ্কারকে বিনামূল্যে বিলিয়ে দেয়ার “হঠকারী সিদ্ধান্ত”।

টিম বার্নার্স-লি; Image Source: Getty Images

প্রাথমিক জীবন ও ক্যারিয়ার

১৯৫৫ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন বার্নার্স-লি। তার বাবা-মা দুজনেই ছিলেন কম্পিউটার বিজ্ঞানী। তাই তিনিও যে খুব অল্প বয়স থেকেই প্রযুক্তির ব্যাপারে অতিশয় আগ্রহী হয়ে উঠবেন, সে আর এমন বিচিত্র কী!

নিজের বয়সের আরো অনেকের মতোই বালক বার্নার্স-লিরও ছিল একটি ট্রেন সেট। কিন্তু অন্যদের সাথে তার পার্থক্য হলো, ট্রেন সেট পেয়েই তিনি সেটি নিয়ে খেলতে লেগে পড়েননি, বরং ভাবতে শুরু করেছিলেন, কীভাবে এমন একটি গ্যাজেট তৈরি করা যায় যার মাধ্যমে বিনা স্পর্শেই ট্রেনগুলোর জায়গা পরিবর্তন করা সম্ভব।

এর কয়েক বছর পর তরুণ প্রডিজি বার্নার্স-লি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে বের হন অক্সফোর্ড থেকে। সেখানে তার সময় বেশ ভালোই কাটছিল টিভি সেটকে কম্পিউটারে রূপান্তরের মজার খেলায়। গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পরও অক্ষুণ্ন থাকে কম্পিউটারের প্রতি বার্নার্স-লির প্রেম। তিনি যোগদান করেন সুইজারল্যান্ডের বৃহৎ পার্টিকল ফিজিক্স ল্যাবরেটরি সিইআরএন-এ।

সুইজারল্যান্ডে কাজ করার সময় বার্নার্স-লির সুযোগ হয় বিশ্বসেরা বিজ্ঞানীদের সাথে ওঠাবসা, এবং তাদের সাথে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে নিজের কম্পিউটার বিষয়ক জ্ঞানকে আরো ক্ষুরধার করার। কিন্তু একটি বিষয় তার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল। সেটি হলো, ভিন্ন ভিন্ন কম্পিউটারে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থাকে, এবং সেগুলোর নাগাল পেতে গেলে সরাসরি প্রতিটি কম্পিউটারেই লগ-ইন করা আবশ্যক। একটি কম্পিউটারে বসেই বাকি সকল কম্পিউটারের তথ্য-উপাত্ত পেয়ে যাওয়া ছিল নিতান্তই দুরাশা।

বিশ্বের সব কম্পিউটারের মধ্যে পারস্পরিক আন্তঃযোগাযোগের পথ খুঁজছিলেন বার্নার্স-লি; Image Source: Wikimedia Commons

যুগান্তকারী সেই ধারণা

সমস্যা যেহেতু আছে, তার সমাধানও তো থাকতে বাধ্য। ভাবতে ভাবতে সেই সমাধান বের করে ফেললেন বার্নার্স-লি, তার যুগান্তকারী ধারণার মাধ্যমে। হাইপারটেক্সট নামক এক নতুন ঘরানার প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন কম্পিউটারের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক সৃষ্টির একটি সম্ভাব্য রাস্তা খুঁজে বের করলেন তিনি।

বার্নার্স-লি পরিকল্পনা করলেন তিনটি মৌলিক প্রযুক্তির, যারা আজো বিবেচিত হয় ওয়েবের মূল ভিত্তি হিসেবে।

  • এইচটিএমএল: হাইপারটেক্সট মার্কআপ ল্যাঙ্গুয়েজ
  • ইউআরআই: ইউনিফর্ম রিসোর্স আইডেন্টিফায়ার
  • এইচটিটিপি: হাইপারটেক্সট ট্রান্সফার প্রটোকল

এর মাধ্যমে এক অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললেন বার্নার্স-লি। কোনো নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত এখন থেকে কেবল আর একক কম্পিউটারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মুহুর্তেই মধ্যেই সেগুলোকে পাঠিয়ে দেয়া যাবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের কম্পিউটারে।

স্বাভাবিকভাবেই আবেগে থরথর করে কাঁপছিলেন বার্নার্স-লি। ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে উৎফুল্ল চিত্তে তার নতুন ধারণার প্রস্তাবনা খসড়া আকারে লিখে রেখে দিলেন তার বস মাইক সেনড্যালের ডেস্কে।

কিন্তু যেমন প্রতিক্রিয়া পাবেন ভেবেছিলেন, তেমনটি পেলেন না বসের কাছ থেকে। বরং তার শব্দচয়নে কিছুটা যেন অনুৎসাহই প্রতিফলিত হলো। বার্নার্স-লির ধারণাকে তিনি অভিহিত করলেন “অস্পষ্ট তবে উত্তেজনাপূর্ণ” হিসেবে।

অবশ্য এতে দমে গেলেন না বার্নার্স-লি। তিনি নিজের কাজ চালিয়ে গেলেন পুরোদমে, এবং ১৯৯০ সালের অক্টোবরে সম্পন্ন করলেন প্রকল্পটি। এবার সেনড্যালও বাধ্য হলেন সেটিকে অনুমোদন দিতে।

১৯৯০ সালে সম্পন্ন হয় বার্নার্স-লির আপাত অসম্ভব প্রকল্প; Image Source: Getty Images

এর পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে সৃষ্টি হলো বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম ওয়েব ব্রাউজার, এবং প্রকাশিত হলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনাটিও।

প্রাথমিকভাবে নতুন এই প্রযুক্তিটি অবরুদ্ধ থাকল কেবল সিইআরএনের বিজ্ঞানীদের মাঝেই। তবে যতই এটির কার্যকারিতা স্পষ্ট হতে থাকল, বার্নার্স-লি তার কোম্পানির উপর চাপ প্রয়োগ করতে লাগলেন এটিকে বিনামূল্যে বিশ্বব্যাপী ছেড়ে দেয়ার জন্য।

কেন এই কাজ করেছিলেন তিনি, তার যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও কিন্তু রয়েছে বার্নার্স-লির কাছে। “যদি প্রযুক্তিটি প্রোপ্রাইটারি হতো, এবং এর নিয়ন্ত্রণ আমার কাছে কুক্ষিগত থাকত, তাহলে সম্ভবত এটি এতটা সফলতা পেত না। এমনটি আপনি চাইতে পারেন না যে কিছু একটা বিশ্বজনীন হবে, আবার একই সাথে আপনার নিয়ন্ত্রণাধীনও থাকবে।”

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবকে সবার জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেন বার্নার্স-লি; Image Source: BBC

সাফল্য

শেষ পর্যন্ত, ১৯৯৩ সালে বার্নার্স-লির কোম্পানি সম্মত হলো ওয়েবকে বিনামূল্যে ছেড়ে দিতে। বিনামূল্যে বলতে আক্ষরিক অর্থেই বিনামূল্যে, কোনো কানাকড়ি ছাড়াই। এবং তারপর তা কীভাবে গোটা বিশ্বকে জয় করে নিল, তা তো আজ আমাদের চোখের সামনেই জ্বাজল্যমান।

তবে ব্যক্তিগতভাবে কি বার্নার্স-লিকে সফল বলা চলে? বিবেচ্য যদি হয় অর্থনৈতিক অবস্থা, তাহলে উত্তরটি নেতিবাচকই হবে। ওয়েবকে ব্যবসায়ের বস্তু বানাননি তিনি। তাই মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের মতো বিলিয়নিয়ারও হতে পারেননি তিনি।

অবশ্য বার্নার্স-লির মনে এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ রয়েছে বলে মনে হয় না। দৃশ্যত খুবই সুখী-স্বাচ্ছন্দ্যময় একটি জীবনই পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ফাউন্ডেশনের, যাদের কাজ ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারকে উৎসাহিত করা।

২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উদযাপিত হয় বার্নার্স-লির সাফল্য; Image Source: The Telegraph

আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি যে একেবারেই পাননি তিনি, তা-ও অবশ্য বলা যাবে না। ২০১২ সালে নিজ শহর লন্ডনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উদযাপন করা হয় তার সৃষ্ট ইন্টারনেটের সাফল্যকে। বিশ্বের সিংহভাগ মানুষই তখন প্রথমবারের মতো জানতে পারে তার নাম। কিন্তু তখনো বরাবরের মতোই বিনয়ের অবতার ছিলেন তিনি। টুইট করে জানিয়েছিলেন, “এর ভাগিদার সকলে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

কলেজ স্ট্রিট মানে কি শুধুই বই?

সুয়েজ সংকট: যেভাবে ব্যর্থ হয়েছিল ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন