in

ক্রিকেট খেলায় ব্যবহৃত যত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি

এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেটের যে ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা, তা নেই পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে, এমনকি ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডেও। কিন্তু একটি ক্ষেত্রে ক্রিকেট বিশ্বের সকল খেলার মধ্যেই শীর্ষস্থানে রয়েছে। সেটি হলো, প্রযুক্তির ব্যবহারে। ক্রিকেট খেলায় যে পরিমাণ প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটে, অন্য কোনো খেলাতেই তা ঘটে না।

তবে একটি সমস্যা হলো, যারা নিয়মিত ক্রিকেটের খবরাখবর রাখেন না, কিংবা প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন না, তাদের পক্ষে প্রায় সময়ই ক্রিকেট খেলার মাঝে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলোর নিয়মাবলি ও কার্যকারিতা বুঝে উঠতে সমস্যা হয়। ২০১৯ বিশ্বকাপ যেহেতু দ্বারপ্রান্তে, চলুন জেনে নেয়া যাক ক্রিকেট খেলার প্রযুক্তিগুলোর ব্যাপারে।

হট স্পট

ক্রিকেট খেলায় বোলার একটি বল ছুঁড়ে দেয়ার পর তা এত দ্রুত ব্যাটসম্যানের কাছে পৌঁছে যায় যে, অনেক সময়ই খালি চোখে বোঝা যায় না ব্যাটে-বলে সংযোগ হয়েছে কি না। এজন্য আম্পায়ার, ধারাভাষ্যকার কিংবা সাধারণ দর্শক, সবাইকেই বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। তবে সেই বিভ্রান্তি দূর করার জন্য রয়েছে হট স্পট। এর মাধ্যমে বোঝা যায় আসলেই বল ব্যাটে লেগেছে কি না।

হট স্পট; Image Source: Live Sports

যখন বল গিয়ে ব্যাটে আঘাত করে, তখন ব্যাটে সামান্য পরিমাণ তাপ উৎপন্ন হয়। আর সেটি দৃশ্যমান হয় ইনফ্রা-রেড ক্যামেরার মাধ্যমে। ইনফ্রা-রেড ক্যামেরা ক্রিকেট মাঠের ক্রিজের দুই প্রান্তেই বসানো থাকে, এবং সেগুলো প্রতিটি বলকেই ধারণ করে। ফলে এর মাধ্যমে বলের সাথে ব্যাটসম্যানের প্যাড কিংবা গ্লাভসের সংযোগ সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়।

এলইডি লাইট

এলইডি লাইট স্থাপন করা হয় স্টাম্প ও বেইলে। যখনই বল গিয়ে স্টাম্পে আঘাত করে এবং বেইল তার জায়গা থেকে উঠে যায়, তখন এলইডি লাইট জ্বলে ওঠে। অনেকেই এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন। কেননা বল স্টাম্পে লাগলে বেইল তো এমনিতেই পড়ে যাবে। তাহলে আর এত খরচ করে এলইডি লাইট স্থাপনের কী দরকার!

দরকার আছে। কেননা খুব বিরল হলেও, মাঝেমধ্যে এমনটি দেখা যায় যে বল স্টাম্পে লেগেছে, বেল কিছুটা উঠেও গেছে, কিন্তু আবার সে তার পূর্বের জায়গায় বসে গিয়েছে। এমন ঘটনা খালি চোখে বোঝা সম্ভব না-ও হতে পারে।

এলইডি স্টাম্প ও বেইল; Image Source: BBC

কিন্তু এলইডি লাইট যদি জ্বলে ওঠে, তাহলে বেইল তার পূর্বাবস্থায় ফিরে গেলেও আম্পায়ার বিষয়টি বুঝতে পারবেন। আবার থার্ড আম্পায়ার কর্তৃক রান আউটের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ফ্রেম-বাই-ফ্রেম মূল্যায়নেও এই প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে। তাছাড়া বল যখন স্টাম্পে আঘাত করে বেইল ফেলে দেয়, তখনো এলইডি লাইট জ্বলে উঠে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা ঘটায়, যা অনেক দর্শকই পছন্দ করে।

স্পাইডার ক্যাম

এই প্রযুক্তিটি কেবল ক্রিকেটেই নয়, আরো বেশ কিছু খেলায়ও ব্যবহৃত হয়। এটি হলো তারের এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে মাঠের অনেক উপর থেকে ক্যামেরা আনুভূমিক ও উল্লম্ব দুইভাবেই নড়াচড়া করতে পারে।

এই ক্যামেরার ব্যবহার মূল খেলায় বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না বটে, তবে সম্প্রচারকরা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক লাভবান হয়। তারা একদম ভিন্ন ও চমকপ্রদ একটি অ্যাঙ্গেল থেকে খেলার দৃশ্যধারণ করতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে দর্শকদের কাছে খেলার আকর্ষণ বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে।

স্পাইডার ক্যাম; Image Source: BGR India

সুপার সপার

এই প্রযুক্তিটিও মূল খেলায় ব্যবহৃত হয় না, তবে খেলার মাঠকে খেলার উপযোগী করে তুলতে সাহায্য করে। মাঠ যদি ভেজা থাকে, তাহলে ক্রিকেট খেলা মাঠে গড়ায় না। অনেক সময় খেলার আগে বৃষ্টি হয়, আবার অনেক সময় খেলার মাঝপথেও বৃষ্টি শুরু হতে পারে। যখনই বৃষ্টি হোক না কেন, তার পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয় এবং মাঠ পুরোপুরি ভিজে যায়, তাহলে আর সেই মাঠে খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।

সুপার সপার; Image Source: India Today

ইতিপূর্বে এমন ক্ষেত্রে ম্যাচ বাতিল বা স্থগিত করতে হতো। তবে এখন সুপার সপারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভেজা মাঠ শুকিয়ে ফেলা সম্ভব হয়। সবসময়ই যে এর মাধ্যমে ম্যাচ বাঁচানো যায়, তা হয়তো না। কিন্তু মাঠ যদি খুব বেশি ভিজে গিয়ে না থাকে, আর ওই মাঠের ড্রেইনেজ ব্যবস্থা মোটামুটি ভালো হয়ে থাকে, তাহলে সুপার সপার তার কাজটা ঠিকভাবে করে ম্যাচ পন্ড হওয়া রোধ করতে পারে।

হক আই

৯০’র দশকের মাঝামাঝি থেকে স্নিকোমিটার ব্যবহৃত হতো। কিন্তু সেটি তেমন কার্যকর না হওয়ায়, ২০০১ সালে হক আই প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছিল, এবং তারপর থেকে এটি ক্রিকেট খেলার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে একটি বল প্রথমবার পিচে পড়ার পর ঠিক কোন গতিপথ ধরে উইকেটের দিকে ধাবিত হবে, তা অনেকটা নির্ভুলভাবেই বের করা যায়।

হক আই; Image Source: Hawk-Eye

আর তার গতিপথের মাঝে যদি বলটি ব্যাটসম্যানের পা বা প্যাড লাগে, তাহলে এটিও বোঝা যায় যে অন্যথায় বলটি উইকেটে আঘাত করত কি না। এর মাধ্যমে আম্পায়ারের পক্ষে এলবিডব্লিউ আউটের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়।

এই প্রযুক্তিতে কাজে লাগিয়ে বলের গতিপথ নির্ধারণের জন্য মাঠের বিভিন্ন দিকে অন্তত ছয়টি ক্যামেরা বসানো থাকে। এসব ক্যামেরা থেকে প্রাপ্ত ফুটেজ ত্রিভুজাকৃতির হয়ে থাকে, এবং তার মাধ্যমে একটি ত্রিমাত্রিক দৃশ্য তৈরি করা হয়।

বল স্পিড মেজারমেন্ট

বল স্পিড মেজারমেন্ট; Image Source: Quora

স্পিড ক্যামেরার মাধ্যমে যেমন কোনো যানবাহনের সঠিক গতি জানা যায়, ঠিক একইভাবে বল স্পিড মেজারমেন্টেও একটি ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে বোলার বল ছাড়ার পর সেটি কোন গতিতে ব্যাটসম্যান পর্যন্ত গেল তা পরিমাপ করা সম্ভব হয়।

এক্ষেত্রে একটি রাডার গান ব্যবহৃত হয়, যেখানে একটি রিসিভার ও একটি ট্রান্সমিটার থাকে। চলমান বস্তু তথা ক্রিকেট বলটি থেকে বেতার তরঙ্গ প্রতিফলিত হয়। সেই তরঙ্গটিকে চিহ্নিত করে ডপলার শিফট নীতি অনুসরণকারী গান, আর এর মাধ্যমে বলের গতি পরিমাপ করা যায়।

আল্ট্রা এজ

এটি ক্রিকেটের একদম সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে একটি। খেলা চলাকালীন বল যখন কোনো বস্তুর সাথে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তখন সেটি যে ক্ষীণ ও মৃদু আওয়াজ সৃষ্টি করে, সেটিকে ধরা হয় আল্ট্রা এজের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে স্টাম্প মাইক্রোফোনকে শব্দধারণের কাজে ব্যবহার করা হয়, আর বলের সাথে আঘাত লাগা বস্তুটি হতে পারে ব্যাট, প্যাড কিংবা ব্যাটসম্যানের পোশাক।

আল্ট্রা এজ; Image Source: YouTube

রিয়েল-টাইমে ভিডিও ও আল্ট্রা এজের শব্দ সৃষ্টির লেখচিত্র পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় যে একটি বল আদৌ ব্যাটসম্যানের ব্যাট, প্যাড বা শরীরের আর কোথাও লেগেছে কি না। এলবিডব্লিউ বা ক্যাচের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আপিল করা হলে, অর্থাৎ ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম (ডিআরএস)-এ এই প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

চীনের মহাপ্রাচীর: মানুষের এক অসামান্য সৃষ্টি

আইফোনের বিবর্তন: জেনে নিন শুরু থেকে