in

সুয়েজ সংকট: যেভাবে ব্যর্থ হয়েছিল ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী স্বীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো সুয়েজ সংকট। সরাসরি এ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়ন কারোই সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও, শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই এগিয়ে আসতে হয়েছিল এ সংকট নিরসনে, যার মাধ্যমে এটিও দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে বিশ্বের অধিপতি এখন এই দুই রাষ্ট্রই।

সুয়েজ সংকটের গভীরে প্রবেশের আগে আমাদের জানা প্রয়োজন, সুয়েজ আসলে কী এবং কেন।

সুয়েজ খাল; Image Source: Marine Insight

সুয়েজ হলো একটি খাল। এটি মিশরের একটি মনুষ্যসৃষ্ট জলপথ। ১২০ মাইল লম্বা ও ৬৭০ ফুট চওড়া জলপথটি লোহিত সাগরের সাথে ভূমধ্যসাগরকে সংযুক্ত করে। এটি ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত রুটে চলাচলকারী জাহাজের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ।

ফার্দিনান্দ দে লেসেপ্স নামক একজন ফরাসি প্রকৌশলী ছিলেন এই খাল খননের উদ্যোক্তা। খালটি খনন করতে দশ বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল, এবং খননের কাজে অংশগ্রহণ করেছিল ১৫ লক্ষাধিক কর্মী। ১৮৬৯ সালের ১৭ নভেম্বর খালটি খুলে দেয়া হয়।

এবার আসা যাক মূল প্রেক্ষাপটে। ১৯৫৪ সালে মিশরের ক্ষমতা গ্রহণ করেন জামাল আবদেল নাসের। নাসেরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মিশরের আধুনিকীকরণ। তিনি দেশটির উন্নয়নের অংশ হিসেবে নীলনদের উপর আসওয়ান বাঁধ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র আর ব্রিটেন এজন্য মিশরকে ঋণ প্রদানে সম্মতিও জানিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তারা সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে, কেননা মিশরের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে। এতে রেগে যান নাসের।

জামাল আবদেল নাসের; Image Source: Wikimedia Commons

যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায়নি তো কী হয়েছে, নাসের ছিলেন বাঁধ নির্মাণে বদ্ধপরিকর। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সুয়েজ খাল দখলের। এতদিন এটি ছিল মিশরের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের দখলে, যাতে এটি বিনামূল্যে সকল দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকে। ১৯৫৬ সালে নাসের খালটির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিলেন, এটির জাতীয়করণ করলেন, এবং এই জলপথ দিয়ে যাওয়ার জন্য সকল জলযানের কাছ থেকে টোল নিতে থাকলেন। এভাবেই তিনি আসওয়ান বাঁধ নির্মাণের খরচ তুলতে চাচ্ছিলেন।

এমতাবস্থায় চিত্রপটে ব্রিটিশদের সাথে প্রবেশ ফরাসি ও ইসরায়েলিদের। ওই সময়ে নাসেরের সরকারের সাথে বিভিন্ন কারণে বিরোধ চলছিল তিন দেশেরই। তাই তারা ঠিক করল, সুয়েজ খালকে ইস্যু করে মিশর আক্রমণ করবে। গোপনে ঠিকও হয়ে গেল আক্রমণের যাবতীয় নীলনকশা। ইসরায়েল প্রথমে মিশর আক্রমণ করে খালের দখল নিয়ে নেবে। এরপর শান্তি-সমঝোতার নাম করে ফরাসি আর ব্রিটিশরাও এই সংকটে প্রবেশ করবে, এবং তারাও খালটির নিয়ন্ত্রণ নেবে।

পরিকল্পনা মোতাবেক সবকিছুই হলো। ১৯৫৬ সালের ২৯ অক্টোবর প্রথমে ইসরায়েল আক্রমণ করে ছিনিয়ে নিল খালের দখল। এরপর সাধু সেজে আগমন ঘটল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের। তারা আহবান জানাল দুই পক্ষকেই যুদ্ধ থামাতে। কিন্তু যখন মিশর থামল না, নভেম্বরের ৫ তারিখ তারা মিশরীয় বিমানবাহিনীর উপর বোমাবর্ষণ করল।

সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ নেয় ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইসরায়েল; Image Source: National Army Museum

যদিও ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইসরায়েলের ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে সফল হলো, কিন্তু এটি তাদের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনল। গোটা বিশ্ব তাদের ধিক্কার জানাতে থাকল মিশরীয় সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানার অভিযোগে। ব্রিটেনের নয়া-ঔপনিবেশিক আচরণে ক্ষোভে ফেটে পড়ল ইসলামি রাষ্ট্রগুলো।

সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন আক্রমণ চালাচ্ছিল হাঙ্গেরির উপর। তারা চলমান সুয়েজ সংকটে মিশরের পক্ষ নিল, এবং হুমকি দিল পশ্চিম ইউরোপে পারমাণবিক মিসাইল বর্ষণের। এদিকে যে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করে ছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেন ও তার চ্যান্সেলর হ্যারল্ড ম্যাকমিলান, সেই তারাও মুখ ঘুরিয়ে নিল।

১৯৫৬ সালে চলছি হাঙ্গেরিয়ান বিপ্লবও; Image Source: TIME Magazine

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার ব্রিটেনের উপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে লাগলেন, যেন ব্রিটেন সুয়েজ খাল থেকে তাদের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন আচরণের মূল কারণ ছিল স্নায়ুযুদ্ধ। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে তখন তার দেশের তুমুল উত্তেজনা চলছে, এবং তিনি কোনোভাবেই চাচ্ছিলেন না সুয়েজ সংকটকে কেন্দ্র করে সোভিয়েতদের সাথে তাদের সম্মুখ সমরে লড়াই বাধুক।

যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশাপাশি জাতিসংঘও তিন আক্রমণকারী পক্ষকে সরে আসতে তাগাদা দিচ্ছিল। এই চতুর্মুখী চাপে ভেঙে পড়ে ব্রিটিশ, ফরাসি, ইসরায়েলিরা। তারা বাধ্য হয় সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ মিশরের হাতে ফিরিয়ে দিতে।

সুয়েজ সংকটের এমন ফলাফল থেকে একটি বিষয় দৃশ্যমান হয়ে যায় যে, একসময় বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হলে কী হয়েছে, দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের বিশ্ব রাজনীতিতে গ্রেট ব্রিটেনের আর কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তিই অবশিষ্ট নেই। পরাশক্তি এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন, তাই অন্য সব দেশকে তাদের মন যুগিয়েই চলতে হবে।

সুয়েজ সংকট নিরসনের অব্যবহিত পরেই প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন অ্যান্থনি ইডেন। অপরদিকে এই সংকটের সূত্র ধরে মিশরসহ গোটা আরব বিশ্বেই তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন নাসের। কেননা সুয়েজ খালের সূত্র ধরে মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা চলছিল, তা বানচাল করে দিতে সক্ষম হন তিনি। তাই তার ভাগ্যে জুটতে থাকে বীরোচিত সম্মাননা।

১৯৫৭ সালেই ক্ষমতা ছাড়েন ইডেন; Image Source: The National

এছাড়া এই সংকট নিরসনে বিশেষ ভূমিকা রাখায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন কানাডিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিস্টার বোলস পিয়ারসন। ১৯৫২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনি, এবং সুয়েজ সংকট চলাকালে বিবদমান পক্ষগুলোকে পৃথক করার উদ্দেশ্যে সেখানে জাতিসংঘের একটি জরুরি বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন।

প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে শান্তিতে নোবেল জেতেন লিস্টার পিয়ারসন (মাঝে); Image Credit: Duncan Cameron/Library and Archives Canada

নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছা হচ্ছে, বর্তমানে কী অবস্থা সুয়েজ খালের? এখনো উন্মুক্ত রয়েছে খালটি, এবং সকল দেশের জলযানই অবাধে যাতায়াত করতে পারে এই খালের উপর দিয়ে। বর্তমানে খালটির মালিক ও পরিচালকের ভূমিকায় রয়েছে মিশরের সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

যেভাবে এফসি বার্সেলোনা হয়ে উঠেছে কাতালান গৌরবের প্রতীক

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ৮টি অনুপ্রেরণাদায়ী উক্তি