in

ক্রুসেড (পর্ব ৩): কনস্টান্টিনোপল পতন ও খ্রিস্টানদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা

ধারাবাহিক এ আয়োজনে আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি ক্রুসেড তথা একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যে সংগঠিত ধর্মযুদ্ধের ইতিহাস। গত পর্বে আপনাদের বর্ণনা করেছিলাম প্রথম দুই ক্রুসেড ও জেরুজালেম পতনের আখ্যান। এ পর্বে থাকছে তৃতীয় থেকে সপ্তম ক্রুসেডের কাহিনী।

তৃতীয় ক্রুসেড (১১৮৭-৯২)

বেশ কয়েকবার মিশর দখলের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় জেরুজালেমের ক্রুসেডাররা। এদিকে নূর আল-দিনের সৈন্যরা (সেনাপতি শিরকুহ এবং তার ভাতিজা সালাদিনের নেতৃত্বে) ১১৬৯ সালে কায়রো দখল করে নেয়, এবং ক্রুসেডার সৈন্যদেরকে বাধ্য করে পিছু হটতে।

সালাদিন ক্ষমতায় বসলে মুসলিমদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধি বেগবান হয়; Image Source: Al Jazeera

শিরকুহ’র মৃত্যুর পর সালাদিন ক্ষমতার অধিকারী হয়। ১১৭৪ সালে নূল আল-দিনের মৃত্যুর পর নতুন এলাকা জয় ও সাম্রাজ্য বৃদ্ধির যে অভিযান শুরু হয়েছিল, এবার তা আরো যেন গতি পায়।

১১৮৭ সালে সালাদিন শুরু করেন জেরুজালেমের ক্রুসেডার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক বিশাল অভিযান। হাত্তিনের যুদ্ধে তার যোদ্ধারা খ্রিস্টান সৈন্যদের বলতে গেলে প্রায় গুঁড়িয়েই দেয়, এবং তার সুবিশাল সাম্রাজ্যে যোগ করে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরীটিকে।

এই পরাজয়গুলো ইউরোপের খ্রিস্টানদেরকে ক্রুদ্ধ করে তোলে, এবং তারা আবারো সুযোগ খুঁজতে থাকে পবিত্র ভূমিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দখলদারিত্ব ফিরে পাওয়ার। এ সময়ই জার্মানির সম্রাট ফ্রেডেরিক বারবারোসা, ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ, এবং রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট নামে খ্যাত ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম রিচার্ডের হাত ধরে তৃতীয় ক্রুসেডের সূত্রপাত ঘটে।

১১৯১ সালে রিচার্ডের দল আরসুফের যুদ্ধে পরাহত করে সালাদিনকে। তৃতীয় ক্রুসেডের একমাত্র সত্যিকারের যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয় এটিকেই।

পুনরায় দখলীকৃত জাপ্পা নগরী থেকে রিচার্ড এ অঞ্চলের বেশ কিছু অংশে খ্রিস্টান ধর্মের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, এবং তিনি জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। তবে তিনি সরাসরি জেরুজালেম আক্রমণের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন।

জেরুজালেম আক্রমণে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট; Image Source: Fine Art America

বেশ কয়েক মাস যাবত মুখোমুখি অবস্থানের পর, ১১৯২ সালের সেপ্টেম্বরে রিচার্ড ও সালাদিন একটি শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে জেরুজালেম সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় (যদিও মূল জেরুজালেম শহর বাদে)। এভাবেই সমাপ্তি ঘটে তৃতীয় ক্রুসেডের।

চতুর্থ ক্রুসেড: কনস্টান্টিনোপলের পতন

১১৯৮ সালে পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট নতুন একটি ক্রুসেডের ডাক দেন। কিন্তু ইউরোপ ও বাইজেন্টিয়ামের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে ক্রুসেডারদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বাইজেন্টাইন সম্রাট তৃতীয় অ্যালেক্সিয়াসের বদলে তার ভাতিজাকে সিংহাসনে বসানো। ১২০৩ সালে এ প্রচেষ্টায় তারা সাফল্যও পায়, এবং সে বছরের মাঝামাঝি সময় ক্ষমতা অধিগ্রহণ করেন চতুর্থ অ্যালেক্সিয়াস।

সম্রাট চতুর্থ অ্যালেক্সিয়াসকে ক্ষমতায় বসতে সাহায্যের বিনিময়ে তিনি কথা দিয়েছিলেন বাইজেন্টাইন চার্চকে রোমের অধীনস্থ করার। বাস্তবে তিনি যখন সে চেষ্টা শুরু করেন, তখন তাকে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। ফলে ১২০৪ সালে এক প্রাসাদ অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন।

কনস্টান্টিনোপলের পতন; Image Source: Wikimedia Commons

সম্রাটের মৃত্যুর পর ক্রুসেডাররা কনস্টান্টিনোপলে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কনস্টান্টিনোপলে আক্রমণ করে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল ও মনোরম এ রাজধানী শহরটিকে প্রথমে তারা দখল করে। এরপর অসীম রক্তপাত ও লুটতরাজের মাধ্যমে সহিংসতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তারা। সেখানে তারা রোমান চার্চের প্রতিদ্বিন্দ্বী “ইস্টার্ন অর্থডক্স” চার্চের বহু ভবনে আগুন লাগিয়ে সেগুলোকে নিঃশেষ করে দেয়। এছাড়া চার্চের যাজক ও নানদের উপর অকথ্য অত্যাচারও চালায়। এভাবেই সমাপ্তি ঘটে চতুর্থ ক্রুসেডের।

ছোটখাটো ক্রুসেড ও চিলড্রেন’স ক্রুসেড (১২০৮-১২২৯)

ত্রয়োদশ শতকের বাকি অংশ জুড়ে বেশ কিছু ক্রুসেড সংগঠিত হয়। তবে এসব ক্রুসেডের উদ্দেশ্য যতটা না ছিল পবিত্র ভূমিতে মুসলিম শক্তিকে পরাজিত করে নিজেদের দখলদারিত্ব নিশ্চিত করা, তারচেয়েও বেশি যেকোনো খ্রিস্টান বিশ্বাস বিরোধী বা ধর্মদ্রোহীদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে নিঃশেষ করে দেয়া।

১২০৮ থেকে ১২২৯ সাল পর্যন্ত চলে আলবিগেনশিয়ান ক্রুসেড। এর লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সের ভিন্নমতাবলম্বী কাথারি বা আলবিগেনশিয়ান খ্রিস্টান সম্প্রদায়েকে উৎখাত করা। এছারাও ১২১১ থেকে ১২২৫ সাল পর্যন্ত আরেকটি ক্রুসেড চলে প্যাগান ট্রানসিলভেনিয়ার বিরুদ্ধে।

অনেক ইতিহাসবিদই সন্দিহান চিলড্রেন’স ক্রুসেডের সত্যতার ব্যাপারে; Image Source: History

১২১২ সালে সংগঠিত হয় একটি তথাকথিত “চিলড্রেন’স ক্রুসেড”। বলা হয়ে থাকে, এ ক্রুসেডে নাকি হাজার হাজার কমবয়সী শিশু ঈশ্বরের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে জেরুজালেমের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। তবে এ ক্রুসেডের সত্যতা নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক রয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদই এটিকে প্রকৃত ক্রুসেড হিসেবে স্বীকার করতে চান না। অনেক বিশেষজ্ঞই আবার প্রশ্ন তোলেন, আসলেই দলটিকে কোনো শিশু ছিল কি না। তবে শেষ পর্যন্ত দলটি পবিত্র ভূমি অবধি পৌঁছাতে পারেনি। নিকোলাস নামের এক কিশোরকে অনুসরণ করে শিশুরা বাদেও অনেক নারী এবং প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ রাইনল্যান্ড থেকে ইটালি পর্যন্ত আসে।

পঞ্চম থেকে সপ্তম ক্রুসেড (১২১৬-৫৪)

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট তার মৃত্যুর আগে ১২১৬ সালে নতুন একটি ক্রুসেডের ডাক দিয়ে যান, যার মাধ্যমে সূচনা ঘটে পঞ্চম ক্রুসেডের। ক্রুসেডাররা এবার স্থল ও জল উভয় পথেই মিশর আক্রমণ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১২২১ সালে সালাদিনের ভাতিজা আল-মালিক আল-কামিলের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

১২২৯ সালে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক শুরু করেন ষষ্ঠ ক্রুসেড। তিনি আল-কামালের সাথে একটি শান্তি চুক্তি করে বিনিময়ে জেরুজালেম নগরীতে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। তবে এ চুক্তির মেয়াদ ছিল মাত্র দশ বছর। এরপরই আবার জেরুজালেম মুসলিমদের কর্তৃত্বে চলে যায়।

১২৪৮ থেকে ১২৫৪ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের রাজা নবম লুই মিশরের বিরুদ্ধে একটি ক্রুসেড আয়োজন করেন। এটি সপ্তম ক্রুসেড নামে পরিচিত, যা লুইয়ের জন্য কেবল ব্যর্থতাই বয়ে আনে।

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্টের কথায় শুরু হয়েছিল পঞ্চম ক্রুসেড; Image Source: ThoughtCo

বারবার ব্যর্থতার পরও কিন্তু খ্রিস্টানরা হাল ছেড়ে দেয়নি। তারা আবারো আঘাত হানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে। এবং এক পর্যায়ে ক্রুসেডের সমাপ্তিও ঘটে। শেষ পর্যন্ত কারা জয়ী হয় ক্রুসেডে? আর পরবর্তীতে কী কী প্রভাব দেখা যায় ক্রুসেডের? এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সাজানো হবে এ ধারাবাহিকের আগামী পর্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

ক্রুসেড (পর্ব ১): যেভাবে সূচনা ঘটেছিল ধর্মযুদ্ধের

ক্রুসেড (শেষ পর্ব): ধর্মযুদ্ধের সমাপ্তি ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব