in

রেনেসাঁ: ইউরোপে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ

রেনেসাঁ শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে রাইনাসিমেন্টো বা পুনর্জন্ম থেকে। এটি হলো চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যস্থিত একটি সময়কাল, যখন ইউরোপে মধ্যযুগের অবসান ঘটে শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এক নবজন্ম লাভ করে। এ সময়ই সৃষ্টি হয় অসংখ্য ধ্রুপদী দর্শন, সাহিত্য ও শিল্পের, যার মাধ্যমে মানবসভ্যতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

রেনেসাঁর মূল কথা হলো মানবতাবাদ। অর্থাৎ পূর্বের অন্ধকার সময়কে পার করে এ যুগে মানুষ মানবতাবাদে দীক্ষিত হয়। আর তাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদান করে ইউরোপ মহাদেশ, কিংবা আরো সুস্পষ্ট করে বলতে গেলে, ইটালির ফ্লোরেন্স। মধ্যযুগ ও আধুনিক মানবসভ্যতার মাঝে সেতুবন্ধনকে রেনেসাঁরই অবদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইউরোপে জ্ঞানের পুনর্জাগরণই রেনেসাঁ; Image Source: Wikimedia Commons

মানবতাবাদ

রেনেসাঁ যেকোনো বিষয় নিয়ে মানুষের চিন্তাধারাকে বদলে দিয়েছিল। মধ্যযুগে মানুষ মনে করত, জীবন হবে কঠোর ও কঠিন। এই পুরোটা সময় তারা ভেবে এসেছিল, জীবন মানেই হলো কঠোর পরিশ্রম, আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাস ও আদর্শের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা।

মধ্যযুগের সূচনা ঘটেছিল রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মধ্য দিয়ে। এরপর গ্রিক ও রোমানদের তৈরি করে রেখে যাওয়া অধিকাংশ বিজ্ঞান, শিল্প ও সরকারি নিদর্শনই খোয়া যায়। মধ্যযুগের কিছু সময়কে তাই “অন্ধকার যুগ” হিসেবে বিবেচনা করা হয়, মূলত এ কারণে যে এ সময় ইতিপূর্বে অর্জিত সকল জ্ঞানই হারিয়ে যায়।

রেনেসাঁ হলো এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোর পথে আসা। চতুর্দশ শতকের দিকে ফ্লোরেন্সের (ইটালি) মানুষেরা জীবন নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে ভাবতে শুরু করে। তারা গ্রিক ও রোমানদের রেখে যাওয়া কাজ ও নিদর্শন নিয়ে গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করতে গিয়ে উপলব্ধি করে যে, অতীতে এক সময় মানবসভ্যতা একদমই ভিন্নভাবে জীবনযাপন করত।

রেনেসাঁ যুগের শিল্পে মুখ্য ছিল মানবতাবাদ; Image Source: Getty Images

তখন ফ্লোরেন্সের মানুষেরাও নতুন করে ভাবতে শুরু করে। নতুন করে এই ভাবনার নামই হলো মানবতাবাদ। মানবতাবাদের অংশ হিসেবে মানুষ ভাবে, জীবন মানে কেবল যুদ্ধ-বিগ্রহই নয়, জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেরও উপস্থিতি থাকতে পারে, এবং জীবনটাকে মানুষ চাইলে নিজেদের মতো করে উপভোগও করতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা, জীবনে অন্য কিছু নয়, মনুষ্যত্বকেই দিতে হবে সর্বাধিক প্রাধান্য।

এ ভাবনা থেকে মানুষের মনে এক নতুন ধারণার উন্মেষ ঘটে। তা হলো: তাদেরকে শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে, এবং শিল্প, সঙ্গীত, বিজ্ঞান প্রভৃতি সকল মানুষের জীবনেই এক ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এভাবেই মানুষ লম্বা একটা সময় নিজেদের অস্তিত্বকে অস্বীকার বা খাটো করে দেখার পর, প্রথমবারের মতো মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু দেখতে ও বুঝতে শুরু করে।

বিশ্বখ্যাত মোনালিসা রেনেসাঁ যুগেরই শিল্পকর্ম; Image Source: Metro

ফ্লোরেন্স, ইটালি

রেনেসাঁর সূচনালগ্নে ইটালি ছিল বেশ কিছু নগর-রাষ্ট্রে বিভক্ত। এমন অনেক অঞ্চল ছিল, যেগুলো তখন বৃহত্তর কোনো নগর কর্তৃক শাসিত হচ্ছিল। সকল নগর-রাষ্ট্রেরই একটি করে নিজস্ব সরকার ব্যবস্থা ছিল। মিলান, ভেনিস, ফেরেরার পাশাপাশি এমনই একটি বড় নগর-রাষ্ট্র হলো ফ্লোরেন্স।

ফ্লোরেন্সে যে সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, সেটি ছিল প্রজাতন্ত্রী, ঠিক প্রাচীন রোমের মতো। অর্থাৎ নাগরিকরা নিজেরাই তাদের নেতা নির্বাচন করার সুযোগ পেত।

চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে এসে ফ্লোরেন্স একটি খুবই ধনী নগরীতে পরিণত হয়। ধনবান বণিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণে অর্থ ছিল শিল্প ও শিল্পীদের পেছনে খরচ করার জন্য। এর ফলে তখনকার শিল্পী ও চিন্তাবিদদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়। শিল্প ক্রমশ উন্নত থেকে উন্নততর হতে থাকে, আর নতুন নতুন, যুগান্তকারী সব চিন্তা-ভাবনা ও ধারণার উন্মেষ ঘটতে থাকে।

মেডিসি পরিবার

পঞ্চদশ শতকে ফ্লোরেন্সের ক্ষমতায় আসে মেডিসি পরিবার। তারা প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক ছিল, এবং বিভিন্ন শিল্পীকে নিজস্ব তহবিল থেকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে তারা শিল্পের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে থাকে। এভাবে মানবতাবাদী আন্দোলনও বেগবান হয়।

রেনেসাঁর বিস্তারে মেডিসি পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য; Image Source: Barnebys

আন্দোলনটি প্রথমে ফ্লোরেন্স নগরীর গণ্ডি পেরিয়ে ইটালির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নগর-রাষ্ট্র যেমন ভেনিস, মিলান, বলগনা, ফেরেরা ও রোমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সেটি ইটালি থেকে ফ্রান্স পর্যন্তও পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সমগ্র পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপেই মানবতাবাদী আন্দোলন বিস্তার লাভ করে।

যদিও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে রেনেসাঁর অভিজ্ঞতা এসেছিল ইটালির অনেক পরে, কিন্তু তবু এর প্রভাব ছিল সমান বৈপ্লবিক।

রেনেসাঁ যুগের বুদ্ধিজীবীরা

রেনেসাঁ যুগে বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, শিল্পী ও লেখকের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এদের মধ্যে সবার আগে অবশ্যই বলতে হবে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কথা। তাকে বলা চলে একজন “রেনেসাঁ ম্যান”, অর্থাৎ এমন একজন মানুষ যিনি রেনেসাঁ যুগের বিচিত্র খাতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। দা ভিঞ্চি একাধারে ছিলেন একজন চিত্রকর, ভাস্কর, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, প্রকৌশলী, এবং লেখক। এছাড়া আরো একজন গুরুত্বপূর্ণ রেনেসাঁ ম্যান হলেন মাইকেলেঞ্জেলো, যিনি চিত্রকর, ভাস্কর ও প্রকৌশলী হিসেবে সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

দা ভিঞ্চি ছিলেন একজন রেনেসাঁ ম্যান; Image Source: Institute for Educational Advancement

রেনেসাঁ যুগের আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন: রাফায়েল, সান্দ্রো বত্তিচেল্লি, দোনাতেল্লো, উইলিয়াম শেক্সপিয়ার, জন মিল্টন, নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, দাঁতে, থমাস হবস, নিকোলাস কোপার্নিকাস, উইলিয়াম বায়ার্ড, গিয়োত্তো, টিটিয়ান, উইলিয়াম টিন্ডেল, জিওফ্রে চসার, রেনে দেসকার্তেস, গ্যালিলিও, দেসিদেরিয়াস ইরেসমাস প্রমুখ।

রেনেসাঁ যুগের ব্যাপারে কিছু চমকপ্রদ তথ্য

⦁ রেনেসাঁ যুগের মানুষদের কাছে খুবই পরিচিত ছিলেন প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো। ফ্লোরেন্সের অ্যাকাডেমিতে অনেকেই প্লেটোর লেখা পাঠ করতেন।
⦁ রেনেসাঁ যুগে ভেনিস তার কাঁচ শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল, আর মিলানের বিশেষ পরিচিতি ছিল কামার শিল্পের জন্য।
⦁ ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিস শিল্পের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, এবং তার সাহায্যেই রেনেসাঁ ইটালি থেকে ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে।
⦁ শিল্পীদের সাধারণ মানুষ শুরুর দিকে কারিগর বলে মনে করত। তারা কর্মশালায় কাজ করতেন, এবং সকলে একটি সমবায় সংস্থার অংশীদার ছিলেন।
⦁ মধ্যযুগ থেকে রেনেসাঁ যুগের শিল্পের দুইটি সবচেয়ে বড় পার্থক্য ছিল অনুপাত ও পরিপ্রেক্ষিত ধারণার পরিবর্তন।
⦁ মাইকেলেঞ্জেলো এবং দা ভিঞ্চি একে অন্যের শত্রুতে পরিণত হন, যখন একটি ঘোড়ার মূর্তি শেষ না করায় মাইকেলেঞ্জেলো দা ভিঞ্চিকে উপহাস করেন।
⦁ রেনেসাঁ যুগে ধনাঢ্য মানুষের কাছে বিনোদনের খুবই জনপ্রিয় একটি মাধ্যম ছিল শিকার।
⦁ শিল্পী ও প্রকৌশলীরা প্রায় সময়ই কোনো একটি চাকরি, লভ্যাংশ কিংবা কোনো শিল্প তৈরির অনুদানের জন্য একে অপরের বিপক্ষে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

আধুনিক বিশ্বের একনায়কেরা

কালো মৃত্যু: মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম মহামারী