in

যে কারণে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অনেকের কাছে গ্রেট ওয়ার হিসেবেও পরিচিত এটি, যা ১৯১৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে বলকান অঞ্চলে এই যুদ্ধের শুরু হয়। আর যুদ্ধ শেষ হয় ১৯১৮ সালের ১১ই নভেম্বর বেলা ১১টায়।

ছয় কোটি ইউরোপীয়সহ আরো সাত কোটি সামরিক বাহিনীর সদস্য ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এই যুদ্ধে একত্র হয়। এ যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ছিল ব্যাপক। নিহত হয় এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ, এবং আহত হয় আরো দুই কোটি। তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশ তথা পাকিস্তান-ভারত-বাংলা থেকেও ১৩ লাখ সৈন্য ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে, যাদের মধ্যে ৭৪ হাজার প্রাণ হারায়।

গ্রেট ওয়ার নামেও পরিচিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ; Image Source: Wikimedia Commons

কিন্তু ঠিক কী কারণে, কোন পরিস্থিতিতে এ যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটেছিল, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তবে এ যুদ্ধ শুরুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে অনেকেই বিবেচনা করেন ১৯১৪ সালের ২৮শে জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকান্ডকে।

গাভরিলো প্রিন্সিপ নামের এক অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় নাগরিক, যে জাতিতে ছিল বসনীয় সার্ব, ফার্দিনান্দকে হত্যা করে। পেশায় ছাত্র প্রিন্সিপ ছিল ‘তরুণ বসনিয়া’ দলের সদস্য, অস্ট্রো-হাঙ্গেরী শাসন থেকে বসনিয়াকে মুক্ত করা ছিল যাদের প্রধান লক্ষ্য।

বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে যখন বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাটি ঘটে, তখন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও সার্বিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এবং খুব দ্রুতই, তৎকালীন ইউরোপীয় ছয় পরাশক্তি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে, নিজের মধ্যে জোট গঠনের মাধ্যমে এ যুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। এক পক্ষে ছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া; অন্য পক্ষে জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইটালি।

ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ডের পরই শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ; Image Source: Getty Images

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাক্রমকে সাজিয়েছে এভাবে:

  • ২৮ জুন, ১৯১৪ – গাভরিলো প্রিন্সিপ কর্তৃপ ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ খুব।
  • ২৮ জুলাই, ১৯১৪ – অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি কর্তৃক সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।
  • ২ আগস্ট, ১৯১৪ – অটোমান সাম্রাজ্য (তুরস্ক) এবং জার্মানির মধ্যে একটি গোপন মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর।
  • ৩ আগস্ট, ১৯১৪ – জার্মানি কর্তৃক ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।
  • ৪ আগস্ট, ১৯১৪ – জার্মানি কর্তৃক বেলজিয়াম আক্রমণ, ফলে ব্রিটেন কর্তৃক জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।
  • ১০ আগস্ট, ১৯১৪ – অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি কর্তৃক রাশিয়া আক্রমন।

যুদ্ধ যত এগোতে থাকে এবং যুদ্ধের আগ্রাসন যত বৃদ্ধি পেতে থাকে, অন্যান্য বিভিন্ন দেশও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে থাকে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রও যুক্ত হয় যুদ্ধে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং আফ্রিকার বেশিরভাগ উপনিবেশও তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের হয়ে লড়াই শুরু করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয় ভারতীয় সৈন্যরাও; Image Source: Wikimedia Commons

তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যে মৈত্রী তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে, অনেক ইতিহাসবিদই এখন সেটিকে অতিমাত্রায় সাধারণীকরণ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তেমন একজন হলেন সামরিক ইতিহাসবিদ গ্যারি শেফিল্ড, যিনি মনে করেন ইউরোপে এই যুদ্ধ কোনো দুর্ঘটনার মাধ্যমে আসেনি, এসেছে পরিকল্পিতভাবে।

শেফিল্ডের মতে, ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মূলত দুইটি মৌলিক কারণে: “প্রথমত, বার্লিন ও ভিয়েনার নীতি নির্ধারকরা এমন একটি রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন, যার মাধ্যমে তারা ভেবেছিলেন কিছু তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে, এমনকি এতে যদি কোনো সাধারণ যুদ্ধ শুরু হয়ও। দ্বিতীয়ত, মৈত্রী রাষ্ট্রের সরকারগুলো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল।”

শেফিল্ড আরো যোগ করেন: “সহজ ভাষায় বলতে গেলে, জার্মানি এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এমন অপরিণামদর্শী একটি বাজি ধরেছিল, যা শেষ পর্যন্ত খুব বাজেভাবে তাদের বিপক্ষে যায়। ১৯১৪ সাল দেখেছিল আক্রমণ ও আগ্রাসনের পূর্ব পরিকল্পিত কিছু প্রয়োগ, যেগুলোর পরবর্তী ফলাফল সম্পর্কে তারা কিছু চিন্তাভাবনা করেনি।”

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কেন্দ্রীয় শক্তি ও মিত্র শক্তি; Image Source: deviantart.com

কোনো পরিণামের কথা চিন্তা না করে এক ভয়াবহ একটি যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পেছনে তৎকালীন গোপনীয়তায় ভরা ও জটিল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল।

প্রথমত, ফ্রান্সের সাথে ব্রিটেনের শত্রুতা ঐতিহাসিক। আবার ফ্রান্সের সাথে বিরোধ ছিল জার্মানিরও। শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু, এ নীতি মেনে তাই ব্রিটেন প্রথমদিকে জার্মানির প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিল। কিন্তু সমস্যাটা হয় তখনই, যখন জার্মানি নৌ-প্রযুক্তিতে ব্রিটেনের সাথে পাল্লা দিতে শুরু করে সম্ভাব্য বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটিকে প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত করে ফেলে।

এদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার কারণ ছিল ফ্র্যাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধ। তখন জার্মানদের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলে, ফরাসিরা মৈত্রী তৈরি করে রুশদের সাথে। এদিকে অস্ট্রিয়া-রাশিয়া আগে থেকেই রাশিয়াকে হুমকি হিসেবে দেখত। তাই ফ্রান্স-রাশিয়াকে একাট্টা হয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে দেখে, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি মৈত্রী চুক্তি করে ফেলে জার্মানির সাথে।

একই সমান্তরালে, ইউরোপীয় রাজনীতিতে সার্বিয়ার উত্থান ঘটলে, জোরদার হয়ে ওঠে স্লাভ জাতীয়তাবাদ। তখন সুযোগ বুঝে সার্বিয়াকে কোনঠাসা করে ফেলে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। কিন্তু সার্বিয়ার বন্ধু রাষ্ট্র ছিল রাশিয়া। তারা সার্বিয়াকে অনুপ্রাণিত করে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির হুমকি অগ্রাহ্য করতে। পাশাপাশি তারা সৈন্য সমাবেশও শুরু করে।

এভাবে বিভিন্ন মৈত্রী চুক্তি, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন পর্যায়ে সত্যের বিভিন্ন বিকৃতি, উনিশ শতকে শিল্পে বিপ্লবের কারণে সহজে কাঁচামাল সংগ্রহ এবং তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতা প্রভৃতির ফলে ইউরোপীয় রাজনীতিতে অনেকদিন ধরেই একটি অস্থিরতা বিরাজ করছিল।

এক কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ নিহত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে; Image Source: Washington Post

একটি যুদ্ধের আগমনী বার্তা অনেক আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু কোনো পক্ষই সাহস করে সামনে এগোচ্ছিল না। সকলেরই প্রয়োজন ছিল একটি ইস্যুর। ফার্দিনান্দ হত্যাকান্ড সেই ইস্যুরই জন্ম দেয়, এবং অনেকদিন ধরেই প্রস্তুত হয়ে থাকা যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে দেয়।

সুতরাং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণ হিসেবে এই সকল প্রেক্ষাপটকেই আমলে নিতে হবে। কেবল অস্ট্রিয়ার যুবরাজের হত্যাকাণ্ডকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর একমাত্র কারণ হিসেবে অভিহিত করা একদমই অমূলক, এবং এতে করে প্রকৃত ইতিহাসের বিকৃতিও ঘটে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

ক্রুসেড (পর্ব ২): প্রথম দুই ধর্মযুদ্ধ এবং জেরুজালেমের পতন

৩৮ মিনিটে শেষ হয়েছিল যে যুদ্ধ