in

চন্দ্রজয় নিয়ে জনমনে যত প্রশ্ন

চলতি বছর, অর্থাৎ ২০১৯ সালের ২০ জুলাই ৫০ বছর পূর্ণ হলো ঐতিহাসিক অ্যাপোলো মিশনের, যা মানুষকে নিয়ে গিয়েছিল চাঁদে। টিভি পর্দায় ৬৫০ মিলিয়ন দর্শককে সাক্ষী রেখে প্রথম মানবসন্তান হিসেবে রূপকথার চাঁদের দেশে পা ফেলেছিলেন নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সেটি ছিল এক অনন্য অর্জন। তাই তো আর্মস্ট্রং পরবর্তীতে বলেছিলেন এমন একটি কথা, যা সার্বিক অর্জনটিকে সংজ্ঞায়িত করতে সক্ষম। তিনি বলেছিলেন, “একজন মানুষের জন্য এটি সামান্য একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবতার জন্য এ এক বিশাল লাফ।”

অ্যাপোলো মিশন ও এর সফলতা নিয়ে এত বেশি আলোচনা হয়ে গিয়েছে যে, বিজ্ঞানমনস্ক থেকে শুরু করে ইতিহাসের আগ্রহী ছাত্র, সকলেই কমবেশি অবগত রয়েছেন এর সম্পর্কে। তাই সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার বদলে, চলুন এমন কিছু তথ্য জানা যাক, যেগুলোর ব্যাপারে হয়তো বহুদিন ধরেই আপনাদের মনে প্রশ্ন খেলা করে গেছে, কিন্তু কোনো সদুত্তর পাননি।

অ্যাপোলো ১১ মিশনের তিন নভোচারী; Image Source: Getty Images

মানুষের চাঁদে পৌঁছাতে কতদিন লেগেছিল?

সোয়া চার দিনের কিছু বেশি। অ্যাপোল ১১ স্যাটার্ন ৫ নভোযানটি ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই সকাল ৯টা ৩৬ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উড্ডয়ন করে। সেটির ভিতরে উপস্থিত ছিলেন তিনজন নভোচারী – নীল আর্মস্ট্রং, মাইকেল কলিংস এবং এডউইন ‘বাজ’ অলড্রিন। তাদের এ যাত্রাটি দীর্ঘায়িত হয়েছিল ৪ দিন, ৬ ঘণ্টা, এবং ৪৫ মিনিট। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই রাত ৮টা ১৭ মিনিটে (ইউটিসি) চাঁদের বুকে অবতরণ করে নভোযানটি।

অ্যাপোলো ১১ স্যাটার্ন ৫; Image Source: Getty Images

চাঁদে অবতরণ কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

চাঁদের বুকে অবতরণ একদমই সহজ ব্যাপার ছিল না। অবতরণের ঠিক আগেই নভোচারী ত্রয়ী এমন কিছু অ্যালার্ম মেসেজ শুনতে থাকেন, যা আগে কখনো তারা শোনেননি। এই অ্যালার্মগুলো বেজেছিল কারণ গাইডেন্স কম্পিউটারকে যে টাস্কগুলো দেয়া হয়েছিল তার সবগুলো সেটি ঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারেনি। তবে অ্যালার্মগুলো খতিয়ে দেখে পৃথিবী থেকে কম্পিউটার প্রকৌশলীরা জানান যে সবকিছু ঠিকই আছে, তারা নিরাপদে অবতরণ করতে পারেন।

কিন্তু এটিই একমাত্র সমস্যা ছিল না। এক পর্যায়ে লুনার মডিউলের সাথে মিশন কন্ট্রোলের কম্পিউটার যোগাযোগ বিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ফলে অবস্থা এমন হয়েছিল যে, পুরো অভিযানটিই বাতিল হতে বসেছিল। অলড্রিন বারবার নভোযানের রেডিও অ্যান্টেনা ঠিক করছিলেন, আর গ্রাউন্ড কন্ট্রোলও সমস্যাটি সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তারপরও যোগাযোগের সংকেত বারবার আসছিল, এবং খানিক বাদেই চলে যাচ্ছিল।

নভোচারীরা কোথায় অবতরণ করেছিলেন?

না, পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক স্থানে অবতরণ করা সম্ভব হয়নি। আগের সমস্যাগুলোর সমাধান হতেই নতুন আরেকটি সমস্যার আবির্ভাব ঘটে। চাঁদের অভিকর্ষ বল এবং অর্জিত কিছু অতিরিক্ত গতির কারণে, আর্মস্ট্রং ও অলড্রিং অবতরণের মূল জায়গাটি হারিয়ে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত তারা রুক্ষ ও প্রতিকূল একটি জায়গাকে অবতরণের স্থান হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হন। এদিকে ফুয়েল সাপ্লাই ক্রমশ কমে আসছিল, যার ফলে আর্মস্ট্রংয়ের সামনে মাত্র ৬০ সেকেন্ড নির্ধারিত হয়, এর মধ্যেই হয় লুনার মডিউলটিকে চাঁদের বুকে অবতরণ করাতে হবে, নয়ত গোটা অভিযানটিরই ইস্তফা ঘোষণা করতে হবে। তবে ভাগ্যক্রমে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নির্ধারিত সময়সীমার কয়েক সেকেন্ড আগে আর্মস্ট্রং সফলভাবে অবতরণ করতে সক্ষম হন।

লুনার অরবিটে ঈগল (লুনার মডিউল); Image Source: Wikimedia Commons

মডিউলটি কতক্ষণ চাঁদের বুকে ছিল?

সর্বমোট ২১ ঘণ্টা এবং ৩৬ মিনিট। আর্মস্ট্রং প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ২১ জুলাই ভোর ২টা ৫৬ মিনিটে (ইউটিসি) চাঁদের বুকে পা রাখেন, এবং এর ১৯ মিনিট পর তাকে অনুসরণ করেন অলড্রিন। যতক্ষণ মডিউলটি সেখানে ছিল, তার মাত্র ঘণ্টা দুয়েক আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন মডিউলের বাইরে থেকে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন, উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন, এবং ছবি তুলেছিলেন। এছাড়া তারা চাঁদের বুকে আমেরিকান পতাকাও স্থাপন করেছিলেন। তবে এ কাজটি শুনতে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে করে দেখানো ছিল ঠিক ততটাই কঠিন। কেননা চাঁদের শক্ত জমিনে কিছুতেই পতাকার পোলগুলোকে গাঁথতে পারছিলেন না। সব মিলিয়ে ছয়টি পতাকা স্থাপন করা হয়েছিল অ্যাপোলো মিশনগুলোতে, যার মধ্যে তিনটি এখনো অবশিষ্ট রয়েছে বলে জানা গেছে। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিনের চন্দ্রভ্রমণের সময়টুকু মাইকেল কলিন্স মডিউলের অরবিটের ভিতরই অবস্থান করছিলেন, এবং কমান্ড মডিউলটি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন।

কীভাবে নভোচারীরা পৃথিবীতে ফেরেন?

১৯৬৯ সালের ২৪ জুলাই স্যাটার্ন ৫ প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। ইউএসএস হরনেট নামের একটি এয়ার ক্র্যাফট ক্যারিয়ারের মাধ্যমে নভোযান ও নভোচারীদের উদ্ধার করা হয়। নভোচারীদের শারীরিক অবস্থার যেন হঠাৎ অবনতি না ঘটে তা নিশ্চিত করতে ২১ দিন তাদেরকে আলাদা করে গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হয়। পরবর্তী দুইটি মিশনেও এ কাজটি করা হয়, যদিও এরপর থেকে এটি অপ্রয়োজনীয় হিসেবে গণ্য হয়।

দেশে ফেরার পর গণসংবর্ধণা দেয়া হয় চন্দ্রজয়ীদের; Image Source: Getty Images

এখন পর্যন্ত মোট কতজন মানুষ চাঁদের বুকে পা রেখেছেন?

ছয়টি নাসা মিশনের মাধ্যমে মোট ১২ জন মানুষ এখন অবধি চাঁদের বুকে পা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। মোট তিন বছর সময়কালের মধ্যে এ মিশনগুলো পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালের পর আর কোনো মানবসম্বলিত মিশন চাঁদে অবতরণ করেনি। এর একটি প্রধান কারণ হলো খরচ বাঁচানো। পুরো অ্যাপোলো প্রোগ্রামটির পেছনে খরচ হয়েছিল ২৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চীন, ভারত, জাপান, রাশিয়া এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি, সকলেই চাঁদের বুকে প্রোব কিংবা নভোযান অবতরণ করিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রেই এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ, যারা চাঁদে মানুষও প্রেরণ করেছে।

চাঁদের বুকে মানুষের পায়ের ছাপ; Image Source: Wikimedia Commons

চন্দ্রজয় নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের শুরু কীভাবে?

চাঁদ নিয়ে একটি খুবই জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব রয়েছে যে আদতে নাকি মানুষ চন্দ্রজয় করেনি, এগুলো নিছকই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাজানো নাটক। এ ষড়যন্ত্রটির জনক বিল কেসিং, যিনি ১৯৭৯ সালে নিজেই একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন “We Never Went to the Moon: America’s 30 Billion Dollar Swindle,” যেখানে তিনি এমন অভিযোগ আনেন।

শীঘ্রই তার এ অভিযোগটি ডালপালা মেলতে আরম্ভ করে, এবং এখন বিশ্বব্যাপী প্রচুর মানুষ এটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে যেহেতু একটি বোতামের টিপেই যে কোনো তথ্য ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব, তাই চন্দ্রজয় বিষয়ক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ক্রমশই আরো বেশি মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা লাভ করছে। ২০১২ সালে যেমন ইউগভের করা এক সমীক্ষায় উঠে এসেছিল, ব্রিটেনের প্রতি ৬ জন ব্যক্তির মধ্যে ১ জনই নাকি বিশ্বাস করে চন্দ্রজয়ের কাহিনীগুলো মিথ্যা বা সাজানো নাটক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

উত্তাল ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন

বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব ও নববর্ষের সূচনা