in

আধুনিক বিশ্বের একনায়কেরা

একনায়ক হলেন এমন একজন রাজনৈতিক নেতা যিনি কোনো একটি দেশকে পরম, পরিপূর্ণ ও অসীম ক্ষমতার জোরে শাসন করেন। একনায়ক শাসিত দেশগুলোকে বলা হয় একনায়কতন্ত্র।

একনায়ক পরিভাষাটির প্রথম প্রয়োগ ঘটেছিল প্রাচীন রোমান প্রজাতন্ত্রের আধিকরণিকদের (ম্যাজিস্ট্রেট) ক্ষেত্রে, জরুরি অবস্থায় যাদেরকে অসাধারণ ক্ষমতা মঞ্জুর করা হতো।

এরপর থেকে যুগে যুগে বহু একনায়কের দেখা মিলেছে, এমনকি আধুনিক বিশ্বেও তাদের উপস্থিতি বরাবরের মতোই উজ্জ্বল। গত শতাব্দীতে ছিলেন অ্যাডলফ হিটলার, জোসেফ স্ট্যালিন, ইদি আমিনদের মতো একনায়কেরা, আবার চলতি শতকেও আমরা দেখা পাচ্ছি কিম জং উনদের।

আধুনিক বিশ্বেও দেখা মিলছে একনায়কদের; Image Source: History Today

আধুনিক বিশ্বের একনায়কেরা সাধারণত সেনা অভ্যুত্থান কিংবা রাজনৈতিক শঠতার জের ধরে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, এবং ধারাক্রমে তারা মৌলিক নাগরিক স্বাধীনতাগুলোর হ্রাস ঘটাতে ঘটাতে এক পর্যায়ে সেগুলোকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে বসেন।

চলুন পাঠক, আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই আধুনিক বিশ্বের প্রধান কয়েকজন একনায়কের সাথে।

অ্যাডলফ হিটলার

অ্যাডলফ হিটলার; Image Source: Wikimedia Commons

নাজি পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা, অ্যাডলফ হিটলার ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর, এবং ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নাজি জার্মানির ফুহরার ছিলেন। নাজি জার্মানির সাম্রাজ্যবাদী একনায়ক হিসেবে, হিটলারই প্রধানত দায়ী ছিলেন ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার পেছনে। এছাড়া হলোকাস্ট নামক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যার নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনিই, যার ফলে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রায় ৬০ লক্ষ ইউরোপীয় ইহুদির মৃত্যু ঘটে।

বেনিতো মুসোলিনি

বেনিতো মুসোলিনি; Image Source: The Spectator

দ্বিতীয় বিশযুদ্ধে অ্যাডলফ হিটলারের মিত্র, বেনিতো মুসোলিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতালি শাসন করেন ১৯২২ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত। ১৯২৫ সালে তিনি ইতালির সংবিধান থেকে সব ধরনের গণতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন করে দেন, নিজেকে “ইল ডিউস” হিসেবে ঘোষণা করেন, এবং দাবি করেন তিনিই নাকি ইতালির বৈধ ফ্যাসিবাদী একনায়ক। ওই একই বছর তিনি একটি আইনও পাশ করান, যেখানে তার পূর্বের পদবি “প্রেসিডেন্ট অফ দ্য কাউন্সিল অফ মিনিস্টার্স” বদলে “হেড অফ দ্য গভর্নমেন্ট” করে দেয়া হয়। ফলে তার ক্ষমতার সকল সীমাবদ্ধতা বিলুপ্ত হয়, এবং তিনি পরিণত হন ইতালির ডি-ফ্যাক্টো একনায়কে

জোসেফ স্ট্যালিন

জোসেফ স্ট্যালিন; Image Source: Wikimedia Commons

জোসেফ স্ট্যালিন ১৯২২ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রধান। নামে সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ হলেও, আদতে স্ট্যালিন ছিলেন একজন একনায়ক, এবং ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরিণত করেন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে। বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বাধিক রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার (কিংবা অপব্যবহার) করা ব্যক্তিটি হলেন স্ট্যালিন।

অগাস্টো পিনোশে

অগাস্টো পিনোশে; Image Source: History

১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট চিলিয়ান জেনারেল অগাস্টো পিনোশে, একটি সেনা অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন, যার মাধ্যমে পতন ঘটে প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের সমাজতান্ত্রিক সরকারের। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন পিনোশে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি চিলির সামরিক সরকারের নেতৃত্ব দেন। এই একনায়ক তার শাসনামলে তিন হাজারেরও বেশি বিরোধীকে হত্যা করেন। নির্মম অত্যাচার চালানো হয় আরো হাজার হাজার মানুষের উপর।

ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো

ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো; Image Source: The Conversation

১৯৩৯ থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সালে মৃত্যু অবধি স্পেন শাসন করেন জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত চলা স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে জয়লাভের পর ফ্রাঙ্কো একটি ফ্যাসিবাদী সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, এবং নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন। বাধ্যতামূলক শ্রম এবং হাজার হাজার মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে ফ্রাঙ্কো নিষ্ঠুরভাবে অবদমিত রাখেন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের।

ফুলগেনসিও বাতিস্তা

ফুলগেনসিও বাতিস্তা (সামনে/বামে); Image Source: Wikimedia Commons

ফুলগেনসিও বাতিস্তা কিউবা শাসন করেন দুবার; একবার ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত একজন প্রভাবশালী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে, এবং দ্বিতীয়বার ১৯৫২ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত অত্যাচারী একনায়ক হিসেবে। কংগ্রেস, গণমাধ্যম এবং বিশ্ববিদ্যালয় পদ্ধতিকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসার পর, বাতিস্তা জেলবন্দি করতে থাকেন তার হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে। তাদের মধ্যে অনেককে তিনি মেরেও ফেলেন। যদিও কিউবাতে ১৯৫৪ ও ১৯৫৮ সালে দুইবার “স্বাধীন” প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, কিন্তু পরিহাসের বিষয় সেসব নির্বাচনে একমাত্র প্রার্থী ছিলেন বাতিস্তাই। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে, ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন কিউবান বিপ্লবের ফলে ক্ষমতাচ্যুত হন বাতিস্তা।

ইদি আমিন

ইদি আমিন; Image Source: The Telegraph

ইদি “বিগ ড্যাডি” আমিন ছিলেন উগান্ডার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট, যিনি ১৯৭১ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার শাসনামল কালিমালিপ্ত হয়ে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উপর নির্মম নিপীড়ন ও গণহত্যার কারণে। অভিন্ন পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদেরও। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো হিসেব করে বের করেছে, ইদি আমিনের শাসনামলে খুন হয়েছে পাঁচ লক্ষ মানুষ, যা তাকে এনে দিয়েছে “উগান্ডার কসাই” খেতাব।

সাদ্দাম হোসেন

সাদ্দাম হোসেন; Image Source: Newsweek

“বাগদাদের কসাই” নামে পরিচিত সাদ্দাম হোসেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। প্রতিপক্ষকে অবদমন এবং তাদের উপর নির্মম অত্যাচার চালানোয় বিশ্বব্যাপী ধিকৃত ছিলেন সাদ্দাম। তার নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিভিন্ন শুদ্ধিকরণ ও গণহত্যায় খুন হয়েছে আড়াই লক্ষের মতো ইরাকি। ২০০৩ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আক্রমণে ক্ষমতাচ্যুত হন সাদ্দাম। এক আন্তর্জাতিক আদালতের সামনে তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়, এবং সেখানে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইরাকি সময় সকাল ৬.০৬ মিনিটে তার ফাঁসি কার্যকর হয়।

কিম জং উন

কিম জং উন; Image Source: New York Post

২০১১ সালে উত্তর কোরিয়ার অনির্বাচিত সর্বোচ্চ নেতায় পরিণত হন কিম জং উন। এ ক্ষমতা তিনি লাভ করেন তার সমধিক একনায়ক বাবা কিম জং ইলের কাছ থেকে। যদিও কিম জং উনের শাসনামলে উত্তর কোরিয়ায় কিছু অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে, কিন্তু সেসব ছাপিয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে তার মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রতিপক্ষকে অবদমের হীন প্রচেষ্টা। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কিম তার ফুফা জাং সং থায়েককে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল, এবং কিম তার তরফ থেকে একটি সম্ভাব্য সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা করছিলেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও কিম উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকল্পকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে সকল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, এবং তিনি ক্রমাগত পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দিয়ে আসছেন তার প্রতিবেশী দেশটিকে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

মায়া সভ্যতার ধর্ম বিশ্বাস ও কিংবদন্তী

রেনেসাঁ: ইউরোপে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ