in

মায়া সভ্যতার ধর্ম বিশ্বাস ও কিংবদন্তী

মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও আগ্রহোদ্দীপক সভ্যতার নাম মায়া। এ সভ্যতার সূচনা ঘটেছিল সেই খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। পরবর্তী তিন সহস্রাধিক বছর ধরে, ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দে স্প্যানিশদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত, মেসো-আমেরিকায় ছিল তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি।

মায়ানরা সংগঠিত ছিল বিভিন্ন শক্তিশালী নগর-রাষ্ট্রে। মায়া সভ্যতার ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় ছিল বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্র, যেমন: এল মিরাদোর, তিকাল, উক্সমাল, কারাকোল এবং চিচেন ইতজা।

মায়ানদের বাস ছিল কেন্দ্রীয় আমেরিকায়, যেখানে বর্তমানে অবস্থান দক্ষিণ মেক্সিকো, ইয়ুকাতান পেনিনসুলা, গুয়াতেমালা, বেলিজে, এবং উত্তর এল সালভাদরের।

মায়ান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ; Image Source: Science News

ধর্ম ও প্রাকৃতিক দেবতা ছিল মায়ানদের জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ দুইটি অনুষঙ্গ। বিশেষত তাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে দেখা মিলত ধর্মীয় প্রভাবের ছায়া। এই রচনায় আমরা সেই বিষয়গুলো নিয়েই আলোকপাত করব।

মায়ান দেবতা

মায়ানরা বিশ্বাস করত বিপুল সংখ্যক প্রাকৃতিক দেবতায়। কোনো কোনো দেবতা ছিলেন কম গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী। আবার কোনো কোনো দেবতার গুরুত্ব ও শক্তিমত্তা ছিল অসীম।

ইতজামনা – মায়ানদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেবতা ছিলেন ইতজামনা। তিনি ছিলেন অগ্নিদেবতা, যার হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছে এই পৃথিবীর। তিনি ছিলেন একাধারে স্বর্গের শাসনকর্তা, আবার দিন ও রাতের নিয়ন্ত্রক। মায়ানরা বিশ্বাস করত, ইতজামনার আশির্বাদেই তারা পেয়েছে বর্ষপঞ্জি ও লেখার ক্ষমতা। বিশ্বাস করা হতো, ইতজামনার নামের অর্থ “টিকটিকির বাড়ি”।

কুলকুলান – কুলকুলান ছিলেন একজন খুবই শক্তিশালী সর্পদেবতা, যার নামের অর্থ “পালক আবৃত সাপ”। মায়ান সভ্যতার শেষ ভাগে এসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইতজার মানুষের নিকট প্রাথমিক দেবতা। অনেক সময়ই তার ছবি আঁকা হয় অনেকটা ড্রাগনের আদলে।

বোলোন জাকাব – তিনি আরো পরিচিত ছিলেন হুরাকান নামে (যেমন আমরা বলে থাকি হারিকেন)। বোলোন জাকাব ছিলেন ঝড়, বাতাস ও আগুনের দেবতা। মায়ান কিংবদন্তী অনুযায়ী, মায়ানরা যখন দেবতাদের রুষ্ট করেছিল, তখন বোলোন জাকাব এক প্রলয়ংকারী বন্যার জন্ম দিয়েছিলেন। তার নামের অর্থ “এক পা”।

চাক – চাক ছিলেন বৃষ্টি ও বিদ্যুতের দেবতা। কিংবদন্তী অনুসারে, তার ছিল একটি বজ্রকুঠার, যেটি দিয়ে তিনি মেঘে আঘাত হানতেন, আর তার ফলে সৃষ্টি হতো বৃষ্টি ও ঝড়।

মায়ান দেবতারা ছিলেন খুবই রাগী; Image Source: Ancient Origins

ঐশ্বরিক রাজা

মায়া সভ্যতায় রাজাদেরকে বিবেচনা করা হতো সাধারণ মানুষ ও দেবতাদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে। অনেকে তো আবার রাজাদেরকেই স্বয়ং দেবতা বলে গণ্য করত।

পুরোহিত

মায়ান সভ্যতায় পুরোহিতদের ছিল বিশেষ গুরুত্ব। কেননা তারাই বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে দেবতাদের তুষ্ট রাখতেন। তারা ছিলেন খুবই শক্তিশালী, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মায়ান আহাওদের চেয়েও অধিক ক্ষমতার অধিকারী। বিখ্যাত স্প্যানিশ বই দ্য বুক অফ জাগুয়ার প্রিস্ট-এ দেবতাদের উপর অর্পিত দায়িত্বগুলোর ব্যাপারে সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে:

  • দেবতাদের তুষ্ট রাখা;
  • ভবিষ্যৎ অনুমান করা;
  • অলৌকিক কাজ করা;
  • সূর্য ও চন্দ্র গ্রহণের তালিকা প্রস্তুত করা;
  • দুর্ভিক্ষ, খরা, প্লেগ ও ভূমিকম্প রোধ করা;
  • পর্যাপ্ত ও পরিমিত বৃষ্টিপাত নিশ্চিত করা।

হারিয়ে যাওয়া মায়া নগরী; Image Source: National Geographic

পরকাল

মায়ানরা বিশ্বাসী ছিল এক ভয়ংকর মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের; যেখানে অধিকাংশ মানুষকেই ভ্রমণ করতে হবে এক পাতাল নরকের মধ্য দিয়ে, এবং দেবতারা ওঁত পেতে থাকবেন মানুষকে তীব্রভাবে নিপীড়নের উদ্দেশ্যে। মায়ানরা বিশ্বাস করত, পরকালের শুরু থেকেই স্বর্গে ঠাঁই হবে কেবল সেইসব নারীদের, যারা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, কিংবা সেইসব মানুষের, যারা দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে।

বর্ষপঞ্জি

মায়ানদের ধর্মীয় রীতিনীতির একটি বিশাল জায়গা জুড়ে ছিল তারকা ও মায়ান বর্ষপঞ্জি। মায়ান বর্ষপঞ্জিতে কিছু কিছু দিনকে বিবেচনা করা হতো সৌভাগ্যের দিন হিসেবে, আবার কিছু কিছু দিন ছিল দুর্ভাগ্যের দিন। আকাশে বিভিন্ন তারকার অবস্থান এবং বর্ষপঞ্জিতে দিনের স্বরূপ অনুযায়ী মায়ানরা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবের দিনক্ষণ ঠিক করত।

পিরামিড

দেবতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শানার্থে মায়ানরা তৈরি করত বিশাল বিশাল সব পিরামিড। পিরামিডের একদম উপরে থাকত সমতল জায়গা, যেখানে দেবতাদের পূজা করার নিমিত্তে তৈরি হতো মন্দির। পিরামিডের এক ধারে সৃষ্ট সিঁড়ি বেয়ে পুরোহিতরা উঠে যেতেন একদম উপরে, মন্দিরে। সেখানে বসে তারা নরবলি দিতেন এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন।

মায়ান পিরামিড; Image Source: Shutterstock

মায়ান ধর্ম সম্পর্কে আমরা কীভাবে জানি?

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মাধ্যমে আমরা মায়ান ধর্মসমূহ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। আর প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এসব চমকপ্রদ তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন মূলত বিভিন্ন মায়ান বই থেকে, যেখানে বর্ণিত হয়েছে মায়ানদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মীয় উৎসব-অনুষ্ঠান সম্পর্কে। এই বইগুলোকে বলা হয় কোডিস। প্রধানত যে বইগুলো বেঁচে গেছে, তাদের মধ্যে রয়েছে মাদ্রিদ কোডেক্স, প্যারিস কোডেক্স, ড্রেসডেন কোডেক্স, এবং পোপোল ভুহ নামের একটি লিপি।

সৃষ্টি ও ধ্বংস তত্ত্ব

পৃথিবী ও মানুষের সৃষ্টি ও ধ্বংস সম্পর্কে মায়ানদের রয়েছে নিজস্ব তত্ত্ব। তারা বিশ্বাস করত, এই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৩১১৪ অব্দে। এবং সৃষ্টির সেই দিনটি তাদের বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ছিল শূন্য তারিখ। অর্থাৎ তাদের বর্ষপঞ্জিতে একদম শূন্য থেকে শুরু হয়েছে দিন গণনা।

মায়ান কিংবদন্তীর দাবি, মানুষের নাকি সৃষ্টি হয়েছে ভুট্টা থেকে। আরেকটি জনপ্রিয় কাহিনী বলছে, দেবতারা নাকি মেইজ মাউন্টেইন বা ভুট্টার পর্বত উন্মোচন করেছিলেন, যেখানে পাওয়া গিয়েছিল প্রথম ভুট্টার বীজ।

মায়ানরা বিশ্বাস করত ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী; Image Source: India Today

আর মায়ানরা ভবিষ্যদ্বাণী করত, এই পৃথিবীর নাকি বিনাশ ঘটবে ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা যে আর হয়নি, তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। কিন্তু এরপরও মায়া সভ্যতার রহস্যময়তার গ্রহণযোগ্যতা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। কেননা ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বরের আগেই বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দাবি করেছিলেন, আদতে মায়ানরা এমন কোনো ভবিষ্যদ্বাণীই করেনি, বরং তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর মূলবক্তব্য ছিল, জীবন চলতেই থাকবে

এখন পর্যন্ত সত্যিই কিন্তু জীবন চলছে, তাই না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

পাস্তা: বিশ্বব্যাপী সমাদৃত এক ইতালীয় আবেগ

আধুনিক বিশ্বের একনায়কেরা