in

মানসা মুসার মহানুভবতায় মিশরের মহাবিপর্যয়

একজন মানুষের পক্ষে কি মাত্র মাস তিনেকের জন্য কোনো ভিনদেশে গিয়ে, নিছকই খেয়ালের বশে সেখানকার অর্থনীতিতে প্রবল বিপর্যয় ডেকে আনা সম্ভব? শুনতেই তো বড্ড অদ্ভূত লাগছে। তাহলে বাস্তবে নিশ্চয় সেটি কখনোই সম্ভব নয়?

হ্যাঁ, আজকের প্রেক্ষাপটে এমন কোনো ঘটনা অসম্ভব ব্যাপারই বটে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ইতিহাসে সত্যি সত্যিই রয়েছে এমন অবিশ্বাস্য এক দৃষ্টান্ত। আর যেই মানুষটির খেয়ালের ফলে এমন ঘটনার জন্ম হয়েছিল, তিনি স্বয়ং মানসা মুসা, যাকে বিবেচনা করা হয় সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে।

ঠিক কতটা ধনী ছিলেন মুসা? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তা আর বলা সম্ভব না। কেউ কেউ বলে বটে যে মানসা মুসার সম্পদের পরিমাণ হয়তো ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আশেপাশে। কিন্তু অন্য অধিকাংশ ইতিহাসবিদেরই দৃঢ় বিশ্বাস, মানসা মুসার প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ আরো অনেক বেশি। এত বেশি যে তা অঙ্কে প্রকাশ করা অসম্ভব।

মানসা মুসা ইতিহাসের সেরা ধনী; Image Source: Atlanta Black Star

আপনাদেরকে আজ শোনাব মানসা মুসা কীভাবে মধ্যযুগে মাত্র তিন মাস মিশরের কায়রোতে কাটিয়েই, নিজের মহানুভবতার বদৌলতে সেখানকার অর্থনীতিতে মহাবিপর্যয় ডেকে এনেছিলেন। তবে তার আগে জানতে হবে, অপরিমেয় সম্পদের মালিক কীভাবে হয়েছিলেন তিনি।

মানসা মুসার জন্মগ্রহণ করেন ১২৮০ সালে, এক শাসক পরিবারে। তার ভাই, মানসা আবু বকর ছিলেন পশ্চিম আফ্রিকার মালি সাম্রাজ্যের শাসক। কিন্তু শাসক হলে হবে কী, আদতে তার ছিল অভিযানের অদম্য নেশা। আটলান্টিক মহাসাগর ও তার ওপাশে কী আছে তা জানার দুর্নিবার কৌতূহল ছিল তার মনে। তাই ১৩১২ সালে রাজ্য শাসনে ইস্তফা দিয়ে, সিংহাসন ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়েন অভিযানে।

জানা যায়, তিনি নাকি দুই হাজারটি জাহাজ এবং আরো হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও দাস-দাসী নিয়ে বেরিয়েছিলেন অভিযানে। তার জাহাজ ছেড়ে গিয়েছিল, কিন্তু আর কখনো ফিরে আসেনি। অনেক ইতিহাসবিদই মনে করেন, দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন আবু বকর ও তার দল। কিন্তু তাদের সেই বিশ্বাসের স্বপক্ষে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বিশাল মালি সাম্রাজ্যের অধিকর্তা হন মানসা মুসা; Image Source: History Collection

তবে সে যাই হোক, ভাইয়ের অবর্তমানে তার রেখে যাওয়া সাম্রাজ্যের অধিকর্তা হন মানসা মুসা। এবং তার শাসনামলে মালি সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটতে শুরু করে। তিনি ২৪টি শহর দখল করেন, যার মধ্যে ছিল টিমবুকটুও। মুসার শাসনামলে এই টিমবুকটু পরিণত হয়েছিল এল ডোরাডোর আফ্রিকান সংস্করণে, যা দেখতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসত পর্যটকেরা। এমনকি উনবিংশ শতক পর্যন্তও টিমবুকটু বিবেচিত হতো এক হারিয়ে যাওয়া সোনার শহর হিসেবে, যেখানে এসে গুপ্তধনের সন্ধান চালাত ইউরোপীয়রা।

মুসার নিয়ন্ত্রণাধীন মালি সাম্রাজ্যের সীমানা ছিল প্রায় ২,০০০ মাইল লম্বা, আটলান্টিক মহাসাগর থেকে শুরু করে একদম আধুনিক নাইজার পর্যন্ত, যার মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছিল বর্তমানের সেনেগাল, মাউরিতানিয়া, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, গাম্বিয়া, গিনি বিসাউ, গিনি এবং আইভরি কোস্ট। এই বিশাল সাম্রাজ্য ছিল পুরাতন বিশ্বের মোট অর্ধেক সোনার আধার। এবং শাসনসূত্রে সেই পুরোটা সোনার মালিকই ছিলেন সাম্রাজ্যের রাজা।

তবে নিজ সাম্রাজ্য যতই ধন-সম্পদে উপচে পড়ুক না কেন, বাইরের পৃথিবীর কাছে মুসা কিংবা তার সাম্রাজ্য, কারোই খুব একটা নামডাক ছিল না। এ নিয়ে মুসার মনে প্রচণ্ড হতাশাও কাজ করত। এই হতাশা কাটাবার একটি উপায় তিনি খুঁজে পান। ধর্মপরায়ণ মুসা সিদ্ধান্ত নেন, হজ্বব্রত পালনের উদ্দেশে মক্কা যাবেন।

মক্কা যাওয়ার পথে মুসা অতিক্রম করেন সাহারা মরুভূমি ও মিশর। এবং এই যাত্রাই তাকে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি এনে দেয়।

মুসা মক্কার উদ্দেশে মালি ত্যাগ করেন ৬০,০০০ মানুষের বিশাল এক কাফেলা নিয়ে। তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন তার সমগ্র রাজসভা ও কর্মকর্তা, সৈন্য, গ্রিয়ট (বিনোদনদাতা), বণিক, উটচালক, এবং ১২,০০০ দাস-দাসী। এছাড়া খাদ্যের যোগান দিতে তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন প্রচুর পরিমাণে ছাগল আর ভেড়াও। মনে হচ্ছিল যেন একটি গোটা শহর এগিয়ে চলেছে মরুভূমির বুকের উপর দিয়ে। এবং সেই শহরের প্রতিটি বাসিন্দা, এমনকি দাস-দাসীদেরও, সর্বাঙ্গ ছিল সোনার বুটিদার জরী ও পারস্যের রেশমী কাপড়ে মোড়ানো। এছাড়া শতাধিক উট ছিল শুধু শত শত পাউন্ডের খাঁটি সোনা বহনের জন্য।

বিশাল কাফেলা নিয়ে মানসা মুসার হজ্বযাত্রা; Image Source: Getty Images

এই প্রবল ঐশ্বর্যশালী কাফেলা নিয়ে মুসা মিশরের কায়রো শহরে পৌঁছান, এবং স্বভাবতই চোখ ধাঁধিয়ে যায় সেখানকার স্থানীয়দের। তাদের উপর মুসা এমন অবিশ্বাস্য রকমের মুগ্ধতার পরশ ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন যে, চতুর্দশ শতকের সিরীয় ইতিহাসবিদ শিবাব আল উমারির যখন ১২ বছর পর ওই শহরে পা রাখেন, তখনো সবার মুখে মুখে ঘুরে ফিরছিল মুসার নামে জয়ধ্বনি।

কেন মুসার জন্য কায়রোর অধিবাসীদের এত ভালোবাসা? কারণ কায়রোতে মুসার স্থায়িত্বকাল মাত্র তিন মাস হলেও, এই তিন মাসেই তিনি চারিদিকে যেভাবে উদারহস্তে সোনা বিলিয়েছিলেন যে, ওই অঞ্চলে পরের ১০ বছর ধরে জলের দরে পাওয়া গিয়েছিল সোনা। ফলে গোটা অঞ্চলের অর্থনীতিও রীতিমতো ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি আর অতশত বোঝে! মুসার দানশীলতাই মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে রেখেছিল তাদের।

ফেরার পথে আবারো মিশর হয়ে গিয়েছিলেন মুসা। অনেকের মতে, তখন তিনি চেষ্টা করেছিলেন দেশটির ভগ্ন অর্থনীতির চাকাকে কিছুটা হলেও সচল করে দেয়ার। এজন্য তিনি সেখানকার মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে সোনা কিনতে শুরু করেছিলেন। তবে অন্যদের অভিমত, উপকার করার কোনো ইচ্ছাই ছিল না মুসার। ইতিমধ্যেই এত বেশি খরচ করে ফেলেছিলেন তিনি যে তার সোনার ভাণ্ডার ফুরিয়ে গিয়েছিল। এজন্যই আবার অর্থের বিনিময়ে তিনি নিজের দানকৃত সোনা ফিরে পেতে চাইছিলেন।

মানসা মুসার মক্কায় প্রবেশ; Image Source: Fine Art America

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি স্মার্ট অ্যাসেট ডট কম হিসেব করে দেখিয়েছে, সোনার দামের অবক্ষয়ের মাধ্যমে, মানসা মুসার মহানুভবতা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি করে দিয়েছিল।

মুসার এমন দানশীলতায় মধ্যপ্রাচ্যেরই শুধু ক্ষতি হয়নি, তার উপর নাখোশ হয়েছিল নিজ সাম্রাজ্যেরও একটি বিশেষ শ্রেণী। তারা হলো মালির গ্রিয়টরা, যারা গানে গানে এক প্রজন্মের ইতিহাস অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দিত। কিন্তু তারা যখন দেখল মুসা নিজ সাম্রাজ্যের সোনা বাইরে গিয়ে অকারণে অপচয় করছে, তখন মুসার প্রতি খুবই মনঃক্ষুণ্ন হয়েছিল তারা, এবং অস্বীকৃতি জানিয়েছিল মুসার নামে আর প্রশস্তি সঙ্গীত গাইতে।

মানসা মুসার কল্যাণে টিমবুকটু পরিণত হয়েছিল শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে; Image Source: Getty Images

এ কথা সত্য যে দানশীলতা ও মহানুভবতার নামে মুসা যেভাবে অপব্যয় করেছেন, তা ধিক্কার পাওয়ার যোগ্য। পাশাপাশি এটিও কিন্তু অস্বীকার করলে চলবে না যে আক্ষরিক অর্থেই মালির অবস্থান বিশ্ব মানচিত্রে তুলে ধরেছিলেন এই মুসাই। তাছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রেও তার ছিল ব্যাপক অবদান। হজ্ব থেকে ফেরার পথে তিনি বেশ কয়েকজন ইসলামী চিন্তাবিদকে নিয়ে এসেছিলেন। নিজ সাম্রাজ্যে একে একে গড়ে তুলেছিলেন প্রচুর মসজিদ, পাঠাগার, বিদ্যালয়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ও। ফলে টিমবুকটু পরিণত হয়েছিল গোটা বিশ্বের শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

আর্মেনিয়ান গণহত্যা: বিংশ শতকের প্রথম হলোকাস্ট