in

লে. সেলিম: মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গনের অকুতোভয় যোদ্ধা

ইতিহাস অনেক সময় মহান বীরদের যোগ্য মর্যাদায় অম্লান করে রাখতে ব্যর্থ হয়। অনেক মহান আত্মত্যাগের কথা নতুন প্রজন্মের অগোচরে থেকে হারিয়ে যায় ইতিহাসের গহ্বরে। এমনই এক মহান নায়কের নাম শহীদ লেফটেন্যান্ট সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান (বীর প্রতীক)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর দিন থেকে আনুষ্ঠানিক বিজয়ের দিন পর্যন্ত তিনি লড়ে গেছেন অসীম সাহসীকতার সাথে। মুক্ত দেশে বিজয়ের সূর্য পরিপূর্ণভাবে উদিত না হওয়ায় পুনরায় যুদ্ধে যেতে হয় তাকে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গনে নিজের শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত ঝড়িয়ে লড়াই করে দেশকে শত্রু মুক্ত করে শহীদ হন এই অকুতোভয় যোদ্ধা।

ডা. এম এ সিকদার ও সালেমা বেগমের জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন লে. সেলিম। ডাকনাম তাঁর স্যালি। প্রগতিশীল পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগে সেলিম রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমানে রুয়েট) অধ্যয়নরত ছিলেন। একজন কৃতি ছাত্র ও আপোষহীন ছাত্রনেতা হওয়ার পাশাপাশি অসাধারণ অ্যাথলেট ও খেলোয়াড় হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববর্তী বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে তাঁর ছিল সরব উপস্থিতি।

ছাত্র আন্দোলনগুলোতে থাকত সেলিমের সরব উপস্থিতি; Image Source: Facebook

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানদারদের অতর্কিত আক্রমণ শুরু হওয়ার পর সেলিম ও তাঁর ছোট ভাই আনিস এক প্লাটুন পুলিশ সদস্য নিয়ে বাবার কর্মস্থল তেজগাঁও সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ও পাকিস্তান সার্ভে অফিস, তেজগাঁও পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, সাতরাস্তার মোড়ে হিংস্র আক্রমণ রুখতে যুদ্ধ শুরু করেন।

২৫ শে মার্চ কালরাত্রিতে গণহত্যার ভয়ংকর রূপ দেখে নিজের দুই ছেলেকে যুদ্ধে পাঠান মা সালেমা বেগম। ৩১ শে মার্চ সেলিম ও তাঁর ভাই আনিস যোগ দেন দ্বিতীয় ইস্ট বেংগল রেজিমেন্টে।

৩ এপ্রিল সরাইল ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া যুদ্ধে শরিক হন। লালপুরে ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানের সাথে সম্মুখসমরে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে অংশগ্রহণ করেন সেলিম ও আনিস। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডেল্টা কোম্পানির কমান্ডারের সহযোগী হিসেবে সিলেটের হরষপুর ও নোয়াখালীর বিলোনিয়া-পরশুরাম মুক্তকরণ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন সেলিম।

আখাউড়া যুদ্ধে ৪ ডিসেম্বর লে. বদি শহীদ হওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণ করে লে. সেলিম। দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্রাভো কোম্পানির দায়িত্বে থেকে আখাউডা যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। শাহবাজপুর, শমসেরনগর, নাসিরনগর, তেলিয়াপাড়াসহ অসংখ্য যুদ্ধে অসীম সাহসিকতায় লড়াই করে বীরত্বের পরিচয় দেন লে. সেলিম।

বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির প্রথম গার্ড কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছিলেন সেলিম; Image Source: Facebook

১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় লাভ করলে ৯ মাসের অপরিসীম আত্মত্যাগ ও কষ্টের ফল দেখতে পান। নিজের প্রিয়জনদের কাছে ফিরে আসেন সেলিম। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির প্রথম গার্ড কমান্ডার নিযুক্ত হন তিনি।

যুদ্ধে বিজয় লাভের এক মাস পরও মিরপুর ১২ নম্বর সেক্টরের ৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পাকিস্তানি দোসরদের ঘাঁটি হিসেবে অবরুদ্ধ ছিল। রাজাকার, আলবদর, বিহারী ও কিছু পাকিস্তানি সেনাদের সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ঘাঁটি গেড়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে অবস্থান করছিলো শত্রুপক্ষ।

যুদ্ধ চুক্তি ভেঙ্গে বাংলাদেশিদের উপর নির্বিচারে খুন, লুণ্ঠন, অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছিল পরাজিত দোসর দল। বিজয়ের ৪৫ দিন পর ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে অবরুদ্ধ মিরপুর মুক্তকরণ অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। লে. সেলিম, ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ, ডিএসপি লোদীসহ ৩০০ জন পুলিশ এবং ১৪০ জন সৈনিক ৩০ জানুয়ারি সকালে মিরপুর প্রবেশ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর; Image Source: The Asian Age

সেদিন সকাল ১১ টায় লে. সেলিম যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর পরপরই গুলি শুরু হয়। গোলাগুলির এক পর্যায়ে লে. সেলিমের বুকে একটি গুলি লাগে। সহকর্মীরা তাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেলে জ্ঞান ফিরে পেয়ে নিজের শার্ট খুলে বুকে বেঁধে নেন নিজেই। দিশেহারা সহকর্মীদের সাহস দিয়ে তিনি বলেন “আমি বেঁচে থাকতে তোমাদের ছেড়ে যাচ্ছি না।”

গুলিবিদ্ধ দেহ নিয়েই লে. সেলিম সিংহের মতো লড়াই করে যান যুদ্ধের ময়দানে। যুদ্ধ করতে করতে তার পাশেই শহীদ হন অসংখ্য সহযোদ্ধা। তবু মনোবল হারাননি তিনি। সারাদিন গোলাগুলির পর বিকেলের দিকে জীবিত যোদ্ধাদের নিয়ে কালাপানির ঢলের কাছে এসে দাঁড়ান।

অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ আর পরিশ্রমে ফ্যাকাসে ও ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর দেহ। বুকের ক্ষত নিয়ে নিজে পানিতে না নামলেও সহযোগীদের উৎসাহ দিয়ে বিল পার করান। গাছের আড়ালে থেকে শত্রুসেনাদের বিপক্ষে কভার ফায়ার করে সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন তিনি।

সামরিক বাহিনী থেকে কোনো রকম সম্মানিত করা হয়নি সেলিমকে; Image Source: Facebook

এরপর হয়ত সহকর্মীদের সাহায্যের আশায় বুক বেঁধেছিলেন লে. সেলিম। জীবনের শেষ সম্ভাবনাটুকু বাঁচিয়ে রাখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন শীর্ণ প্রাণ নিয়ে। মেঘে ঢাকা সেই জ্যোৎস্না রাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার সময়ও কোনো সাহায্য পান নি আত্মত্যাগী এই যোদ্ধা। ৩১ জানুয়ারি শত্রুর কবল থেকে মিরপুর মুক্ত ঘোষিত হওয়ার পরও লে. সেলিমের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি কোথাও।

১৯৯৯ সালে মিরপুর মুসলিমবাজার বদ্ধভূমি আবিষ্কারের পর কিছু দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া গেলেও সেখানে লে. সেলিমের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রত্নগর্ভা মা সালেমা বেগম জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর বড় ছেলে সেলিমের অস্থিপঞ্জির একবার স্পর্শ করার প্রতিক্ষায় ছিলেন।

যুদ্ধে যাওয়ার সময় সেলিমের মা বলেছিলেন, “যদি গুলি খাও, বুকে খাবে, পিঠে গুলি খাবে না, কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাবে না। আমি কোনো কাপুরুষের মা হতে চাই না।” জীবনের শেষমুহুর্ত পর্যন্ত মায়ের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে শহীদ হয়েছিলেন তিনি।

লে. সেলিমের মা শহীদ জননী সালেমা বেগম; Image Source: Daily Ittefaq

নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করার পর স্বাধীন দেশেই আবার শত্রুসেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রাণ দিতে হয়েছিলো লে. সেলিমকে। এদেশের অস্তিত্ব রক্ষায় একজন অতুলনীয় যোদ্ধা হিসেবে তিনি অন্যতম।

তবু নির্মম ইতিহাসের পাতায় যথাযোগ্য মর্যাদা না পাওয়ায় লে. সেলিমের অবদান নতুন প্রজন্মের জ্ঞানের আড়ালেই থেকে গেছে। আর ছেলের প্রতীক্ষায় থেকে থেকে, ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি ৯৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লে. সেলিমের মা, শহীদ জননী সালেমা বেগম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

যেভাবে ভারত-পাকিস্তান হয়ে উঠল পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র

ইতিহাসের মর্মান্তিক চার জাহাজডুবি