in

লন্ডন: দুই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল শিখা

একজন মানুষ যখন লন্ডনে ক্লান্ত হয়, তখন সে আসলে জীবন থেকেই ক্লান্ত।

১৭৭৭ সালে বন্ধু বসওয়েলের সাথে এক আড্ডায় জন্মস্থল লন্ডন সম্পর্কে এই উক্তি করেন ড. স্যামুয়েল জনসন। বিখ্যাত এই ইংরেজ লেখকের বাণীটি যে অত্যুক্তি নয় তা লন্ডনের বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। দুই হাজার বছরের ইতিহাসমৃদ্ধ এই নগরী ইংল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের রাজধানী। প্রায় ৬২০ বর্গমাইল আয়তনের ঐতিহ্যবাহী নগরের বৈচিত্র্যময় ইতিহাসের পাতাতেই ঘুরে আসব আজ।

প্রাচীন রোমান যুগ

৪৩ খ্রিস্টাব্দে রোমানরা ব্রিটেন দখল করে লন্ডনে বন্দর স্থাপন ও বাণিজ্যব্যবস্থার গোড়াপত্তন করে। রোমানরা এ অঞ্চলের নাম দেয় লন্ডিনিয়াম। কয়েকবছর পর ব্যবসা ও সৈন্য আন্দোলনের সুবিধার্থে টেমস নদীর উপর কাঠের সেতু স্থাপন করা হয়। অবশ্য গবেষকদের অনুসন্ধানে রোমান আগমনের পূর্বে ব্রোঞ্জ যুগের সেতু ও লৌহ যুগের দুর্গের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে যাযাবর শিকারি গোষ্ঠীর দ্বারাই এ অঞ্চলের গোড়াপত্তন হয়েছিলো বলে জানা যায়।

রোমান যুগে টেমস নদীর উপর স্থাপিত কাঠের সেতু; Image Source: Museum of London

৬০ খ্রিস্টাব্দে কেল্টিক রাণী বুডিকার নেতৃত্বে সৈন্যদল লন্ডন অঞ্চল আক্রমণ করে, কিন্তু অভিজ্ঞ রোমান রণকৌশলেলের কাছে পরাজিত হয় বিপুল সৈন্যগোষ্ঠী। সে সময় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ধ্বংস নগরী শীঘ্রই পুনর্নির্মিত হয়েছিল। ১২৫ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় অগ্নিকান্ড ঘটে। পরবর্তীতে পুনসংস্কারের কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই নগরের জনসংখ্যা প্রায়  ৪০ হাজারের মতো হয়ে যায়।

৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।  বহুবার ভাইকিংস এবং অন্যান্য হানাদারদের আক্রমণে লন্ডন অনেকাংশে পরিত্যক্ত নগরী হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশ রাজত্বের গোড়াপত্তন

১০৬৫ খ্রিস্টাব্দে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর লন্ডন নগরীর ভাগ্য পরিবর্তন হতে শুরু করে। ১০৬৬ সালে হেস্টিংসের যুদ্ধে জয় লাভ করে ইংল্যান্ডে ব্রিটিশ রাজত্বের গোড়াপত্তন করেন নরম্যান্ডি বংশের রাজা উইলিয়াম দ্য কনকোয়েরার। লন্ডনকে ইংল্যান্ডের রাজধানী করা হয়। তার রাজত্বকালে টাওয়ার অফ লন্ডন স্থাপিত হয়। ১১৭৬ সালে পূর্বের কাঠের সেতু সরিয়ে পাথরের লন্ডন সেতু স্থাপন করা হয় টেমস নদীর উপর।

রাজা উইলিয়াম দ্য কনকোয়েরার; Image Source: History

টিউডর এবং স্টুয়ার্ট রাজবংশের সমৃদ্ধির সাথেসাথে লন্ডন আয়তন ও গুরুত্বেও বিস্তৃত হচ্ছিলো। রাজা অষ্টম হেনরির সময় ১ লাখের মতো অধিবাসী ছিল লন্ডনে।

রাজা অষ্টম হেনরির কন্যা প্রথম এলিজাবেথের রাজত্বকালে লন্ডনে প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিলো। ১৬০৫ সালে রবার্ট ক্যাটসবির নেতৃত্বে ক্যাথলিক সহযোগী  গাই ফোকস গানপাউডারের সাহায্যে ব্রিটিশ হাউজ অফ পার্লামেন্ট উড়িয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেন। গাই ফোকস ধরা পড়ে যাওয়ায় এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। ইতিহাসে এই ঘটনা গানপাউডার প্লট নামে খ্যাত।

মহামারী রোগ ও মহাগ্নিকান্ড

১৬৬৫ সালে লন্ডন শহরে প্লেগ রোগ মহামারী আকার ধারণ করে; Image Source: Youtube

পনের শতকের ষাটের দশক লন্ডনের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ দুযোর্গের সময়। ১৬৬৫ সালে লন্ডন শহরে প্লেগ রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ১ লাখের মতো মানুষ মৃত্যু বরণ করে।

সে সময় শহরের জনসংখ্যা ছিলো ৫ লাখের মতো। শহরের অধিকাংশ অবকাঠামো ছিলো কাঠের তৈরি। এক বছর পর ১৬৬৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর লন্ডনের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটে। এ মহাবিপর্যয়ে রোমান সিটি ওয়ালের ভেতরকার লন্ডন শহর পুড়ে গিয়েছিল। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিলো পুরো লন্ডন শহর। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে লন্ডনের প্রধান অসংখ্য স্থাপনার সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হয় বাকিংহাম প্যালেস ও সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল।

লন্ডনের মহাগ্নিকান্ড; Image Source: Historic UK

১৬৯৪ সালে জন হাবলন ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইংল্যান্ডকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির শক্তিভান্ডারে রূপান্তরিত করতে সাহায্য করেন।

পনের শতকের ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রায় দুই শতাব্দী পর লন্ডনে আবার কলেরা ও অন্যান্য রোগের মহামারী দেখা দেয়। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে এই মহামারীর সময় লন্ডনের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লক্ষ। ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় বাস করা অধিকাংশ অধিবাসীর জন্য ছিলো না পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা।

রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকাল

উনিশ শতকে রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে ব্রিটিশ রাজত্বে লন্ডন গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ নগরে পরিণত হয়েছিলো। এ সময় ভারতবর্ষ ব্রিটিশ রাজত্বাধীন হয়। ১৮৫৯ সালে লন্ডনে বিগ বেন টাওয়ার ঘড়ি নির্মিত হয়। ১৮৬৩ সালে পৃথিবীর প্রথম ভূগর্ভস্থ রেলওয়ে হিসেবে লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড উন্মুক্ত করা হয়। ১৮৮৮ সালে নগরীতে ‘জ্যাক দ্য রিপার‘ নামে এক খুনির আতংক ছড়িয়ে পড়েছিলো, যে অন্তত ৫ জন নারীকে ভয়াবহ ভাবে খুন করে।

বিগ বেন; Image Source: History.com

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লন্ডন

পৃথিবীর বহু দেশের মতো দুই বিশ্বযুদ্ধের প্রকোপ থেকে রক্ষা পায়নি লন্ডনও। যুদ্ধ এসে পুড়িয়ে দিয়েছে স্বপ্নের শহরের অনেক মানুষের স্বপ্ন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিমান আক্রমণের ফলে লন্ডনে প্রায় ২৩০০ মানুষ নিহত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুনরায় আক্রান্ত হয় লন্ডন। সে সময় জার্মান বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণে নিহত হয় অত্যন্ত ৩০ হাজার লন্ডনবাসী। ভয়াবহ এ যুদ্ধ শেষে প্রতিবারের ন্যায় বিপর্যয় কাটিয়ে উত্তরিত হয়েছে জাদুর নগরী।

দ্য গ্রেট স্মগ

১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল লন্ডন। বায়ু দূষণের ভয়াবহতায় এক বছরের মধ্যে মারা গিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। ইতিহাসে একে ‘দ্য গ্রেট স্মগ‘ নামে আখ্যায়িত করা হয়। ব্রিটেনে শিল্পবিপ্লবের ফলে অসংখ্য কলকারখানা স্থাপিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত এসবের বর্জ্য থেকে দূষিত হচ্ছিল পরিবেশ। তখন সবচেয়ে সহজলভ্য ও বেশী ব্যবহৃত জ্বালানী ছিল কয়লা। প্রতিটি বাড়ির ফায়ারপ্লেসেও কয়লা ব্যবহৃত হতো। কয়লার কালো ধোয়ায় ভয়ংকরভাবে বায়ু দূষিত হতো এ দূষণের ফলে লন্ডনের বাতাসে ভয়ংকর ঘন কুয়াশা দেখা দেয়। যার ফলে মানুষ শ্বাসকষ্ট, হার্ট এটাক, ব্রংকাইটিসে ভুগে মৃত্যু বরণ করছিল দ্রুত। ১৯৫৬ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ পাশ করে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করে।

দ্য গ্রেট স্মগ; Image Source: Seeker

একবিংশ শতকে লন্ডন

২০০৫ সালে লন্ডনের ট্রানজিট সিস্টেমে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় মৃত্যু বরণ করে ৫৬ জন মানুষ। ভয়ংকর এই হামলাতেও দমে থাকেনি শহরটির অগ্রগতি। ২০১২ সালে অলিম্পিক আয়োজন করা হয় লন্ডনে।

নিজস্ব ঐতহ্য, সংস্কৃতিতে অনন্য বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ শহর লন্ডন তার সমৃদ্ধির পথে পাড়ি দিয়েছে সহস্র বছর। বিশ্বের সকল উন্নত রাষ্ট্রের কাছে অনুসরণীয় এর অগ্রযাত্রার ইতিহাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব ও নববর্ষের সূচনা

রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে রানী বুডিকার প্রতিশোধ