in

ক্রুসেডের কিছু অজানা ইতিহাস

একাদশ শতকের শেষ দশক থেকে ত্রয়োদশ শতকের শেষ দশক পর্যন্ত প্রায় দুই শতক জুড়ে সংগঠিত হয়েছিল ৮টি ক্রুসেড। এই ক্রুসেড তথা পবিত্র ভূমি দখলের নিমিত্তে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যকার লড়াইয়ের বৃত্তান্ত এর আগে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছি আমরা। কিন্তু চিরাচরিত ইতিহাসের বাইরেও, ক্রুসেড সম্পর্কিত এমন অনেক চমকপ্রদ তথ্যই রয়েছে যা বেশিরভাগ মানুষেরই অজানা। এই লেখায় তুলে ধরা হবে তেমনই কিছু বিস্ময়কর তথ্য

ক্রুসেডে অংশ নিয়েছিল নারীরাও

নারীরা সক্রিয়ভাবে ক্রুসেডে অংশ নিয়েছিল কি না, তা একটি খুবই বিতর্কিত বিষয়। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতদের মাঝে অনেক লাতিন নারীরই যুদ্ধসাজে সজ্জিত লাশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, তবু অনেক ইতিহাসবিদই সন্দেহ প্রকাশ করে এসেছেন যে আদৌ নারীদের জন্য যুদ্ধের মূল্যবান পোশাক ‘অপচয়’ করা হয়েছিল কি না, বিশেষত তারা যখন যুদ্ধের জন্য আলাদা করে কোনো সশস্ত্র প্রশিক্ষণ লাভেরই সুযোগ পেত না।

ক্রুসেডে অংশ নিয়েছিল নারীরাও; Image Source: Weapon and Warfare

তবে এ বিষয়টি এখন প্রমাণিত যে, লড়াইয়ের প্রতি নারীদের আগ্রহ থাক বা না থাক, কখনো কখনো প্রয়োজনে পড়ে তারা ঠিকই নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টায় অবতীর্ণ হতো। বোন মারগারেটকে নিয়ে লেখা থমাস অব বেভারলি রচিত কবিতায় বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নারী তীর্থযাত্রীদের বাঁচার লড়াই নিয়ে বিভিন্ন উল্লেখ রয়েছে। তীর্থযাত্রার অংশ হিসেবে মারগারেট পবিত্র ভূমিতে ভ্রমণ করেছিলেন, এবং ১১৮৭ সালে সালাদিন যখন জেরুজালেম দখল করেন, তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন। থমাসের কবিতা আমাদের জানায়, যুদ্ধ চলাকালে মারগারেট একটি ব্রেস্টপ্লেটের নাগাল পেয়েছিলেন বটে, কিন্তু হেলমেটের অনুপস্থিতিতে কলড্রন দিয়েই কাজ চালিয়েছিলেন তিনি।

এদিকে মুসলিম নারীদের লড়াইয়ের বিবরণ পাওয়া যায় উসামাহর রচনায়। তিনি বিশেষ একটি ঘটনার কথা বলেছিলেন, যেখানে তার পরিবারের মালিকানাধীন একটি প্রাসাদ ইসমাইলিদের আক্রমণের শিকার হয়েছিল, এবং পরবর্তীতে ইসমাইলিরা সেটি দখলও করে নিয়েছিল।

ইসমাইলিদের নেতা উসামাহর চাচাতো ভাই শাহিবকে জানিয়েছিলেন যে, তাকে ছেড়ে দেয়া হবে যদি তিনি প্রাসাদে ফিরে গিয়ে নিজের মালসামান নিয়ে পালিয়ে যান। শাহিব ঠিক সেই কাজই করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু প্রাসাদে ফিরে তিনি দেখতেন পান বর্ম ও হেলমেট পরিহিত কেউ একজন তাদের ঘরে প্রবেশ করছেন। হেলমেট খোলার পর শাহিব যা দেখতে পান তাতে তিনি রীতিমতো চমকে ওঠেন। মানুষটি ছিলেন তাদের বৃদ্ধা চাচি! শাহিবকে তিনি তিরস্কার করেন তার কাপুরুষতা এবং পালিয়ে যেতে উদ্যত হওয়ার মাধ্যমে বংশের সম্মানে চুলকালি লেপে দেয়ার কারণে।

ক্রুসেডের বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায় উসামাহর আত্মকথায়; Image Source: Wikimedia Commons

মজার ব্যাপার হলো, ক্রুসেডে নারীদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্য যে দুইটি উৎস থেকে পাওয়া যায়, দুইটিই কিন্তু লেখা হয়েছিল পুরুষদের দ্বারা। এবং এই পুরুষরাই নিঃসংকোচে যুদ্ধক্ষেত্রে নারীদের নির্ভিকতা ও দুঃসাহসিকতার প্রশংসা করেছিলেন। মধ্যযুগে নারীরা পশ্চিম কিংবা প্রাচ্য, দুই জায়গাতেই যেভাবে বৈষম্যের শিকার হতো, তারপরও পুরুষ কর্তৃক তাদের ব্যাপারে এসব স্তুতিবাক্য বিস্ময়জাগানিয়াই বটে।

ক্রুসেড চলাকালে চিকিৎসা বিষয়ক জ্ঞান ছিল খুবই মূল্যবান

উসামাহ ইবনে মুনকিজ (১০৯৫-১১৮৮) রচিত স্মৃতিকথাটিকে মনে করা হয় ক্রুসেডের প্রথম পর্যায়ে পবিত্র ভূমি জেরুজালেমের জীবনাচরণ সংশ্লিষ্ট জ্ঞানের একটি স্বর্ণখনি হিসেবে। সেখানে তার লেখায় উঠে এসেছে লাতিন ক্রুসেডার এবং পবিত্র ভূমির স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যকার সাংস্কৃতিক সংযোগ ও আদান-প্রদান বিষয়ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

এ কথা বললে মোটেই অত্যুক্তি হয় না যে উসামাহর ‘জন্ম’ ক্রুসেডেই। ১০৯৫ সালের ৪ জুলাই তিনি জন্মগ্রহণ করেন, এবং দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর একটি জীবন তিনি কাটান জেরুজালেমের লাতিন বা ক্রুসেডার সাম্রাজ্যে।

রচনার এক জায়গায় উসামাহ উল্লেখ করেন শায়জার থেকে আসা আবু আল-ফাত নামক এক কারিগরের কথা, যার ছেলে স্রোফুলা (এক ধরনের যক্ষ্মা) রোগে ভুগছিল। আবু আল-ফাত যখন ব্যবসার কাজে এন্টিওক ভ্রমণ করছিলেন, তখন এক ফ্রাঙ্ক ব্যক্তি তার ছেলের ঘাড়ে ঘা দেখতে পান, এবং তাকে একটি প্রতিষেধক ওষুধ দেন। পাশাপাশি সেই ওষুধ তৈরির রেসিপিও জানান তিনি।

তবে মজার ব্যাপার হলো, অজ্ঞাতনামা ওই ফ্রাঙ্ক ব্যক্তি নিজের আবিষ্কারের ব্যাপারে ছিলেন খুবই সংবেদনশীল। তিনি আবু আল-ফাতকে তার ধর্মের নামে শপথ করিয়ে নেন যে তিনি ওই ওষুধ বানিয়ে বিক্রি করে কিংবা ওই ওষুধের ফর্মুলা কারো কাছে বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করবেন না।

ক্রুসেড চলাকালীন চিকিৎসা বিজ্ঞানের আদান-প্রদান ঘটে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে; Image Source: thedailybeast.com

উসামাহর লেখা থেকে ধারণা করা যায়, মুসলিম সম্প্রদায়ের ভিতর ওই ওষুধটি একদমই নতুন ছিল, এবং সেটি সত্যি সত্যিই আবু আল-ফাতের ছেলেকে সারিয়ে দিতে পেরেছিল। পরে আবু আল-ফাতের মাধ্যমে সেটি দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে, এবং উসামাহর হাতেও আসে। উসামাহ নিজেও ওই ওষুধ বেশ কয়েকজন রোগীর উপর প্রয়োগ করে তাদের আরোগ্যলাভে সাহায্য করেছিলেন। আর তার বইয়ে প্রকাশের মাধ্যমে ওষুধটি পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও পৌঁছে যায়।

পরাজিত ও বন্দি অবস্থায় ক্রুসেডারদের শেষ অস্ত্র ছিল আপস আলোচনার দক্ষতা

ক্রুসেডাররা নিজেরাই যুদ্ধ শুরু করলে কী হয়েছে, ধরা পড়ে গিয়ে তাদের জীবন যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেত, তখন কথার মাধ্যমে প্রতিপক্ষের মন গলানোর বিদ্যা বেশ ভালোই আয়ত্ত করেছিল তারা।

এই দক্ষতাটি খুবই কাজে লেগেছিল সপ্তম ক্রুসেডের (১২৪৮-৫২) সময়। এই ক্রুসেডের সূচনা, নেতৃত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা, সবকিছুর সাথেই জড়িয়ে ছিল ফ্রান্সের নবম রাজা লুইয়ের নাম। এতে খ্রিস্টানদের সূচনাটা হয়েছিল দারুণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এবারও তাদের অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

এ ক্রুসেডের সময় নবম লুইয়ের কর্মকান্ডের কথা লিপিবদ্ধ করেছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জিন ডি জয়েনভিল, যিনি নিজেও যুদ্ধ বিষয়ক বেশিরভাগ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

সপ্তম ক্রুসেডের সময় মিশরে বন্দি হয়েছিলেন রাজা নবম লুই; Image Source: Getty Images

মনসুরাহ নগর দখলের উদ্দেশে ক্রুসেডারদের অভিযান যখন নীল নদের কাছে এসে তছনছ হয়ে যায়, তখন তারা দামিয়েত্তায় আশ্রয়ের চেষ্টা চালায়। কিন্তু সে প্রচেষ্টাও তাদেরকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে হয়। জয়েনভিলের দল তখন বুঝতে পারে তাদের সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা নেই, এবং আত্মসমর্পণই একমাত্র উপায়।

দলটির একাংশ তখন এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। কেননা তাদের কাছে আত্মসমর্পণ ছিল কাপুরুষতার পরিচায়ক। এর বদলে তারা যুদ্ধের ময়দানে প্রান বিসর্জনকেই শ্রেয় পন্থা বলে মনে করেছিল। কিন্তু তবু জয়েনভিল আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন।

আত্মসম্পর্পণের পর জয়েনভিলকে যখন আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন হেন ফন্দি ছিল না যা তিনি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য আঁটেননি। প্রথমে তিনি এক মুসলিম পুরুষের সাথে আত্মীয়তা গড়ে তোলার চেষ্টা চালান, তারপর সবার কাছে নিজেকে রাজার চাচাতো ভাই পরিচয় দিতে থাকেন, সম্রাট ফ্রেডরিকের সাথে নিজের মনগড়া সম্পর্কের কাহিনী তৈরি করেন, এবং নিজের প্রয়োজনে সালাদিনের বিভিন্ন উক্তি আউড়াতে থাকেন (“কখনোই সেই মানুষটিকে হত্যা করো না, যার সাথে তুমি নিজের রুটি ও লবণ ভাগ করেছ”)।

রাজা লুইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন জয়েনভিল; Image Source: Wikipedia

তবে শেষ পর্যন্ত জয়েনভিলের চাতুর্যে নয়, রানী মারগুয়েরিটের আপস-দক্ষতা প্রাণে বাঁচিয়েছিল তাদের। স্বামীর প্রাণের বিনিময়ে তিনি মামলুকদের হাতে দামিয়েত্তা তুলে দেয়ার অঙ্গীকার করেন। এছাড়া রাজা লুই তার সৈন্যবাহিনীকে মুক্তির জন্য ৪ লক্ষ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

কেন কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেয়া হয় ভারতের রাজধানী?

চেঙ্গিস খানের অজানা কিছু দিক