in

লালন: এক অচ্ছুতের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার গল্প

বাড়ির কাছে আরশি নগর

সেথা পড়শী বসত করে

আমি একদিনও না দেখিলাম তারে

কিংবা,

“মিলন হবে কতোদিনে

আমার মনের মানুষেরও সনে”

আরশি নগরের পড়শি বা মনের মানুষের দেখা পাওয়ার অসীম ব্যাকুলতার সুর শুধু তার গানে নয়, ফুটে উঠেছে তার প্রচারিত দর্শনেও। শত বছর ধরে মানুষের বিস্ময় আর রহস্যের উপলক্ষ হয়ে নিজের সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে ছড়িয়ে যাচ্ছেন আধ্যাত্মিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা আর মানবতার বাণী। বহুকাল আগে  দেহত্যাগ করেও মানবতার জয়গানে অমর হয়ে আছেন মহাত্মা লালন ফকির।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও নিজের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে নিজেই হয়ে উঠেছেন এক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। বাউলসম্রাট হিসেবে পরিচিত এই সাধকের জীবন  নিয়ে যুগ যুগান্তর ধরে চলছে নানা বিতর্ক। জীবনের নানা চড়াই উৎরাই এর মাঝে লালন খুঁজে গেছেন নিজের অন্তরআত্মা রূপী মনের মানুষকে। নিজের গানের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর মনেও জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন আত্ম অনুসন্ধানের প্রশ্ন।

অসাম্প্রদায়িক জীবনচেতনার কবি লালন; Image Source: Prodiner Sangbad

লালন জীবনবৃত্তান্ত

লালন ফকিরের বংশ পরিচয় ও জীবন যাপন নিয়ে প্রচলিত আছে নানা জনশ্রুতি।  এসব তথ্য কালে কালে বহু লোকে বহুভাবে গ্রহণ করেছেন।

প্রথম লালন জীবিনীকার বসন্তকুমার পাল- রচিত মহাত্মা লালন ফকির  (১৩৬২/১৯৫৫)  বইয়ের সংক্ষিপ্ত লালনজীবনী এখন পর্যন্ত অধিকাংশ লালন-গবেষক ও সুধীজনের কাছে সর্বাধিক স্বীকৃত।

বসন্ত কুমার পালের বর্ণনা অনুযায়ী,  লালনের জন্ম সাবেক নদীয়া জেলায় কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত কুমারখালি থানার চাপড়া-ভাঁড়ারা গ্রামে হিন্দু কায়স্থকুলে। পিতা মাধবচন্দ্র কর ও মাতা পদ্মাবতী। শৈশবে পিতৃহীন হন লালন। তরুণ বয়সে বিয়ের কিছুদিন পর প্রতিবেশী বাউল দাসের সাথে নৌকায় মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে যান গঙ্গাস্নানে। ফেরার পথে বসন্তরোগে আক্রান্ত হলে অচেতন অবস্থায় মৃত ভেবে তাকে গঙ্গায় ভাসিয়ে ফিরে যায় অন্যান্য সঙ্গীরা। গ্রামে লালনের মৃত্যুর খবর প্রচারিত হয়।

গঙ্গার স্রোতে লালনের দেহ ভাসতে ভাসতে ভেড়ে এক ঘাটে। সেখানে এক মুসলিম মহিলা তাকে দেখতে পেয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। 

মহিলার সেবাযত্নে আরোগ্য লাভ করেন লালন। সে বাড়িতেই তার দেখা হয় যশোর জেলার সিরাজ সাই নামে এক সাধকের সাথে। সিরাজ সাইয়ের মরমি উপদেশ ও দর্শন লালনকে প্রভাবিত করে। 

কিছুদিন পর লালন গ্রামে ফিরে গেলে তার জননী ও স্ত্রী আনন্দে আত্মহারা হলেও সগোত্র ও সমাজ তাকে মেনে নিতে পারেনা। মৃত ভেবে শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া এবং মুসলমানের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহনের অপরাধে হিন্দু আচারমতে লালনকে প্রায়শ্চিত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায়শ্চিত্যের বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা মানার মতো আর্থিক অবস্থা ছিল না লালন-জননীর। সমাজের চাপে বিক্ষুব্ধ হয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান লালন।

বড় পর্দায় লালনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি; Image Source: Dhoom Media

বাড়ি থেকে বের হয়ে সিরাজসাইয়ের কাছে গিয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সাধক জীবন শুরু করেন। গুরু সিরাজসাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি ছেউড়িয়ায় এসে আখড়া স্থাপন করে সেখানেই বসবাস করেন আমৃত্যু।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরপরিবারে লালন

জোড়াসাকো ঠাকুর পরিবারে লালনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলে অনেক গবেষকের মত রয়েছে। ঠাকুরপরিবারের জমিদারির অন্তর্গত ছিল শিলাইদহ অঞ্চল। শিলাইদহের বিরাহিমপুর পরগনার ছেউড়িয়ায় লালনের আখড়া হওয়ায় তার সম্পর্কে কৌতূহলী ছিলেন ঠাকুরপরিবারের জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, সরলা দেবী, ইন্দিরা দেবী প্রমুখ।

লালন সাঁইয়ের মৃত্যুর ১ বছর ৫ মাস আগে শিলাইদহ বোটের উপর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা লালনের ছবিটি লালনের জীবিত অবস্থার একমাত্র প্রতিকৃতি। ছবিতে বৃদ্ধ লালন একটা চেয়ারে সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আছেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা লালনের ছবি; Image Source: Wikimedia Commons

লালনের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেখা হওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি। তবে লালনের গান কবিগুরুকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। প্রবাসী পত্রিকার হারামণি বিভাগে লালনের ২০ টি গান প্রকাশ করেছিলেন রবি ঠাকুর। অক্সফোর্ড বিশেবিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেয়ার সময় খাঁচার ভিতর অচিনপাখি গানের ইরেজি অনুবাদ করে শোনান বিদেশি শ্রোতাদের। ১৯২৫ সালের ভারতীয় দর্শন মহাসভায় ইংরেজি বক্তৃতায়ও এই গানের উদ্ধৃতি দেন রবীন্দ্রনাথ। তার এক লেখায় বলেছেন ‘লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

লালনের সাথে দেখা না হলেও তার শিষ্যদের সাথে কবিগুরুর নিয়মিত দেখা ও আলোচনা হত বলে জানা যায় তার চিঠি থেকে।

নজরুলের লালন

বাংলা ভাষা সংস্কৃতির বৈপ্লবিক রূপকার কাজী নজরুল ইসলামের রচনায়, বিশেষত বেশ কয়েকটি গানে লালনগীতির প্রভাব রয়েছে সরাসরি। নজরুল ছিলেন লালনগীতির এক সমঝদার ভক্ত ও অনুরাগী শ্রোতা।

তিনি কলকাতার কল্লোল আসরে লালনগীতি গেয়েছেন। লালন ভক্ত –অনুসারীদের সান্নিধ্য পেয়েছেন আর তাদের কাছ থেকে গান শোনাসহ পত্রপত্রিকা ও গ্রন্থে প্রকাশিত সামান্য কিছু লালনগীতির সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথের মতো তিনি লালনগীতির কোনো আদি খাতা সংগ্রহ করার সুযোগ,পরিসর পেয়েছেন বলে প্রামাণ্য তথ্য এ যাবত মেলেনি।

নজরুলের গানেও ছিল লালনের প্রভাব; Image Source: sahos24.com

নজরুল রচনায় লালন ভাবাদর্শের যে ঘনিষ্টতা ও সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় তাতে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। নজরুল গবেষক ও আলোচকদের মতে নজরুল রচনার সাথে লালনভাবনার সাদৃশ্য মূলত কয়েকটি বৈশিষ্ট্যে বিন্যস্ত, যেমন- পরমসত্য অণ্বেষণ, স্রষ্টার প্রতি দৈন্যতা প্রকাশ ও স্মরণ, চৈতন্য ও বৈষ্ণব-ভাব, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কার ও মিথ, প্রবাদ প্রবচন ও সুভাষণ, লৌকিক বিশ্বাস ও জনশ্রুতি।

লালনবিরোধী আন্দোলনের প্রথম মুদ্রিত ফতোয়া

বাউলসম্রাট লালনের গান ভক্ত অনুরাগী ও শিষ্যদের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরে পৌঁছেছিল। যুক্তিগ্রাহ্য প্রশ্ন আর প্রতিবাদমুখর ভাষায় লেখা গান গুলো সহজে গ্রহণ করতে পারেননি সমাজের অনেক উচুশ্রেণীর লোক। ফলে যুগে যুগে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে লালন পন্থীদের।

বারবার ব্যঙ্গবিদ্রূপ ও লাঞ্চনার পাশাপাশি তির্যক ভাষ্যে সমালোচিত হতে হয়েছে সাময়িকী, বই-পুস্তকে।

কাঙাল হরিনাথ মজুমদার পরিচালিত সাপ্তাহিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় (আগস্ট, ১৮৭২) ‘জাতি’ শিরোনামে যে উপ-সম্পাদকীয়তে লালনের নাম ছাপা অক্ষরে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তাতেও তাকে তাচ্ছিল্য আর অবজ্ঞা করা হয়।

লালনের জীবনকালেই জালালাতল ফোকরা নামক এক গ্রন্থে লালনকে ফতোয়া দেওয়া হয়েছে, পিরবাদের ভন্ড বাউল ফকিরদের বিপথগামী গুরু।

এছাড়াও আরো নানা গ্রন্থপুস্তিকায় লালন ভাবাদর্শ প্রতিহত করার চেষ্টার প্রমাণ মুদ্রিত হয়েছে

লালন শিষ্য-অনুসারীদের প্রতি নির্যাতন

লালন চেতনা বিমুখ কট্টরপন্থী নেতাদের দ্বারা সরাসরি আক্রমণের শিকারও হতে হয়েছে লালন সাই ও তার শিষ্যদের। লালন সম্পর্কে সংগৃহিত কবি জসীমউদ্দিনের পরিবেশিত তথ্য থেকে জানা যায় উগ্রবাদীদের লালনের উপর আক্রমণ চেষ্টার ঘটনা। শেষজীবনে লালন প্রায়ই নিজ আখড়া ছেড়ে শিষ্যদের বাড়িতে বা অন্য আখড়ায় অবস্থান করতেন নিরাপত্তার খাতিরে।

১৯৪২ সালে ছেউড়িয়ার লালন আখড়ায় দোল পূর্ণিমার সময়ে অনুষ্ঠিত সাধু্সঙ্গ অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লালন ভক্ত অনুরগীদের মাঝে আক্রমন চালায় এলাকার স্থানীয়প্রভাবশালী নেতারা। বেশ কয়েকজন লালন শিষ্যকে মারধর, শারিরীক নির্যাতন করে মাথার চুল বাবরি কেটে দিয়েছিল তারা। নির্যাতনে আহত শিষ্য আহাদ আলী ফকিরকে চিকিৎসার জন্য কলকাতা নেয়া হলে তিনি সেখানেই মারা যান। এই ঘটনার পর প্রভাবশালী উগ্রপন্থী সমাজনেতাদের শাসানিতে পরবর্তী ৬/৭ বছর সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠিত হয়নি।

কুষ্টিয়ায় লালনের আখড়া; Image Source: Jago News 24

অসাম্প্রদায়িকতা, জীবনচেতনা ও কালিকভাবনার কবি লালন

লালনের জন্মকাল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে,মৃত্যু ১৮৯০ সালে। তিনি ছিলেন মূলত বাউল সাধক, তার রচিত গানে ফুটে উঠেছে তার সাধনার মর্মবাণী। লালনগীতির কথা ও সুর যেমন অত্যন্ত সহজে আকৃষ্ট করে মানুষকে, তেমনি সূক্ষ্ণ অনুভূতিতেও নাড়া দেয়। সাধনতত্ত্বের কথা বলতে গিয়ে অসাম্প্রদায়িকতা, জীবনবোধ ও কালিকভাবনা শিল্পিত আঙ্গিকে তার গানে প্রকাশ পেয়েছে।

জাতভেদ অস্বীকার করে মনুষত্বের একাত্ব শক্তিতে লালনের বিশ্বাস তার রচনাকে মহিমান্বিত করেছে। সমাজের বিভিন্ন অসামঞ্জস্য, অনাচার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লালনের বাণীতে প্রকাশ পেয়েছে স্পষ্ট প্রতিবাদ।

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেমন গুরুত্বপূর্ণ লালনের গুরুত্বও কম নয়; Image Source: Wikimedia Commons

তৎকালীন সমাজের বিজ্ঞান সভ্যতার অগ্রগতিও লালন চেতনায় ধরা পড়েছে যার প্রমাণ পাওয়া যায় তার রচিত গান থেকেই। পরিবেশ পরিমন্ডল থেকে চয়ন করে বেশ কিছু প্রবাদ-প্রবচন, লোকবিশ্বাস নিজস্ব রীতিতে উপস্থাপন করেছেন লালন তার গানের মাধ্যমে

সর্বোপরি লালন ছিলেন মানবতাবাদী জীবনশিল্পী। অসামান্য সাধক জীবনে তিনি অনুধাবন করেছেন সংসার সমাজের চালচিত্র। সেইসাথে মহান দৃষ্টিকোণ থেকে সেসব প্রতিফলিত করেছেন তার রচনার মাধ্যমে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

প্রাচীন মিশরের অজানা কিছু দিক

বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব ও নববর্ষের সূচনা