in

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দুই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মৃত্যু: কাকতাল না অন্য কিছু?

একজন মানুষের পৃথিবীতে আগমন একবারই ঘটে, তেমনই তার চিরবিদায়ও ঘটে স্রেফ একবারই। তাই তো যে কোনো মানুষের মৃত্যুই খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। কিন্তু সেই মৃত্যুটি যদি কোনো বিশেষ ব্যক্তির হয়, তবে তার তাৎপর্য বেড়ে যায় এক লাফে কয়েকগুণ। আর মৃত্যুটি যদি ঘটে কোনো বিশেষ দিনে, তবে তো তাৎপর্যের কোনো সীমা-পরিসীমাই যেন থাকে না।

এবার ভেবে দেখুন, বিশেষ কোনো মাইলফলকে যদি কেবল একজনের নয়, একই সাথে মৃত্যু ঘটে দুজন এমন ব্যক্তির, যারা কোনো এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটির সর্বোচ্চ পদে আসীন ছিলেন, তাহলে কেমন হবে ব্যাপারটি? গোটা বিষয়টি চিন্তা করতেই বড় অদ্ভূত লাগছে না? বাজি ধরে বলতে পারি, অনেকে হয়তো এখনো ঠিকমতো হিসাবই মিলাতে পারছেন না যে, আসলে কী বলতে চাইছি আমি!

কিন্তু শুনতে যতই অবাস্তব কিংবা গোলমেলে লাগুক না কেন, বাস্তবিকই ঘটেছে এমন একটি ঘটনা। ১৮২৬ সালের ৪ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্র যখন পালন করছে তাদের ৫০তম স্বাধীনতা দিবস, ঠিক সেদিনই কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মৃত্যু ঘটে দেশটির দুই সাবেক প্রেসিডেন্ট, টমাস জেফারসন ও জন অ্যাডামসের। 

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, জন অ্যাডামস এবং টমাস জেফারসন (দাঁড়িয়ে); Image Source: History

মৃত্যুকালে জেফারসনের বয়স হয়েছিল ৮৩। আর অ্যাডামস ৯০ বছর পূর্ণ করেছিলেন আগের বছরই। এ কথা সত্য যে দুজনেরই বেশ অনেক বয়স হয়েছিল, এবং শারীরিকভাবেও তারা প্রচণ্ড অসুস্থ ছিলেন। সুতরাং তাদের মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবেই নেয়ার কথা সকলের। কিন্তু তাদের মৃত্যুও অনেকের মনেই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে এ কারণে যে, ঠিক একই দিনে, দেশের ৫০তম স্বাধীনতা দিবসেই কীভাবে মৃত্যু হলো তাদের। এটি কাকতালীয় ঘটনা হিসেবেও একটু বেশিই কাকতালীয় নয় কি? 

এর পরের সপ্তাহগুলোতে অনেক অতি উৎসাহী আমেরিকানই উঠে পড়ে লাগে একই স্বাধীনতা দিবসে দুজন সাবেক প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে। কেউ কেউ এটিকে কাকতালীয় ঘটনা হিসেবেই মেনে নিলেও, অনেকের কাছেই এটি ছিল একটি ঐশ্বরিক ঘটনা।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় এর পরের মাসে ড্যানিয়েল ওয়েবস্টার প্রকাশিত ইউলোজিটির কথা, যেখানে তিনি এ ঘটনাকে একটি “বিস্ময়কর ও অনন্য সাধারণ কাকতাল” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তার মতে, এই দুজন ব্যক্তিই ছিলেন সরাসরি ইন্দ্রলোক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি উপহারস্বরূপ। তাই তো ঈশ্বর একটি শুভদিনেই তার দুই প্রেরিত পুরুষের জীবনের “মধুর সমাপ্তি” ঘটান।

প্রতি বছর ৪ জুলাই পালিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস; Image Source: History

কিন্তু এটি যদি কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ না হয়ে থাকে, তবে এর পেছনে আর কী কী ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যেতে পারে? এমনকি আধুনিক সময়ের পণ্ডিতেরাও দিনের পর দিন এ ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে গেছেন। কেননা পরিসংখ্যানগত দিক থেকেও ঘটনাটি খুবই অস্বাভাবিক। বছরের কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে কারো মৃত্যুর সম্ভাবনা ৩৬৫ ভাগের ১ ভাগ। এবং সেটি যদি কোনো ঐতিহাসিক জয়ন্তী হয়ে থাকে, এবং একই পদে থাকা দুইজন সাবেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে সেটির সম্ভাবনা হয়ে বসে অপরিমাপযোগ্য। 

২০০৫ সালে তার বুলেটিন অব দ্য হিস্টোরিক সোসাইটির প্রতিবেদনে মারগারেট পি ব্যাটিন লেখেন, “যখন কোনো ঘটনাকে কাকতালীয় হিসেবে বিবেচনার গ্রহণযোগ্যতা কমে আসে, তখন আমাদেরকে অবশ্যই অন্য কোনো স্বাভাবিক ঘটনা বা কারণের খোঁজ করতে হবে, যার ফলে ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।”

একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে এই যে, জেফারসন ও অ্যাডামস হয়তো স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পর্যন্ত বেঁচে থাকার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করেছিলেন, এবং সেজন্যই এ দিনটি পর্যন্ত তারা “দম ধরে ছিলেন”। 

হ্যাঁ, এ বিষয়টি চিকিৎসা বিজ্ঞানেও স্বীকৃত। অনেক সময়ই আমরা এমনটি দেখি যে, কোনো ব্যক্তি হয়তো তার কোনো প্রিয়জনের অপেক্ষায় খুব অসুস্থ শরীর নিয়েও টিকে ছিলেন। প্রিয়জনের দেখা পাওয়া মাত্রই তার মৃত্যু হয়েছে। এর কারণ হলো, ওই প্রিয়জনকে দেখার ব্যাপারে তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। প্রিয়জনকে দেখার মাধ্যমে তার মনস্কামনা পূরণ হয়ে গিয়েছে, জীবন থেকে তার আর কিছু চাওয়ার নেই, সে কারণেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।

টমাস জেফারসন; Image Source: The Onion

অনুরূপভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই সাবেক প্রেসিডেন্টও হয়তো অপেক্ষা করে ছিলেন দেশের সুবর্ণ জয়ন্তী দেখেই যাবেন। এ আশাই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল। এবং আশা পূরণ হওয়ার পর পরই তারা মারা গেছেন। কারণ এরপর আর জীবনের কাছে তাদের চাওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট ছিল না।

এমনকি তৎকালীন অনেক সমসাময়িক পর্যবেক্ষকের মতেও এটি ছিল তাদের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। যেমন ওই বছরের মধ্য জুলাইয়ে নিউ ইয়র্কে জেফারসনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ইউলোজিতে ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ চার্চিল ক্যাম্বারলেং বলেছিলেন, “তার শরীর অনেক আগেই মরে গিয়েছিল, কিন্তু তার দুর্দান্ত মানসিক শক্তি তাকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকিয়ে রেখেছিল। স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীর সূর্য দেখার পরই কেবল সে (জেফারসনের মস্তিষ্ক) বিদায় জানাতে সম্মত হয়। এবং এটিই ছিল পৃথিবীর উদ্দেশ্যে জেফারসনের শেষ ঘোষণা।”

কিছু কিছু প্রতিবেদন থেকে এ-ও জানা যায় যে, মৃত্যুর আগের রাতে নাকি জেফারসন তার প্রতিদিনতার লডেনাম ওষুধ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এর ফলেও তার শরীর প্রচণ্ড ব্যথা সহ্য করতে না পেরে হার মেনে নিয়ে থাকতে পারে। এছাড়া জন টাইলারের দাবি অনুযায়ী, জেফারসন নিজে নাকি প্রায়ই ইচ্ছা পোষণ করতেন যেন ৪ জুলাই-ই তার মৃত্যু হয়। সুতরাং এরপর আর নিশ্চয়ই কারো কাছে মনে হবে না এ দিনটিতে তার মৃত্যু ছিল নেহাতই একটি “অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা”।

জন অ্যাডামস; Image Source: The Bully Pulpit

মানুষ সব সময়ই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পছন্দ করে। আর তাই এ প্রসঙ্গেও রয়েছে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। সমসাময়িক অনেকে তো বটেই, এমনকি বর্তমান সময়েরও অনেকের ধারণা, এই দুই মৃত্যুর পেছনেও ষড়যন্ত্র ছিল। যেমন ব্যাটিন বলেছিলেন, “তাদের রোগীরা যাতে ৪ জুলাই-ই মারা যান, সে ব্যাপারে চিকিৎসক, নার্স থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যদেরও হয়তো সহায়তা ছিল।”

এছাড়া অ্যাডামসের এক নাতনি দাবি করেছিলেন, তার দাদাকে নাকি চিকিৎসক এমন একটি পরীক্ষণমূলক ওষুধ দিয়েছিলেন, যার ফলে হয় তার দাদার জীবনীশক্তি দীর্ঘায়িত হবে, নয়ত ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই তিনি মারা যাবেন। এবং বাস্তবিক ঘটেছিল দ্বিতীয়টি।

রোয়ানোকের জন র‍্যানডোলফ তার এক চিঠিতে অ্যাডামসের মৃত্যুকে আখ্যায়িত করেছিলেন “ইউথেনেশিয়া” বা ইচ্ছামৃত্যু হিসেবে। তিনি লিখেছিলেন, “এমনকি তারা মি. জেফারসনকেও হত্যা করেছে, একই দিনে, যদিও আমি এটি বিশ্বাস করি না।”

সব মিলিয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যার কোনো অভাব নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, কোনো ব্যাখ্যাকেই নিশ্চিত ধরে নেয়ার সুযোগ নেই, যেহেতু এ সম্পর্কিত দালিলিক প্রমাণ রয়েছে খুবই সামান্য, যা থেকে শতভাগ নিখুঁত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার। 

জেমস মনরো; Image Source: Phyllis Schlafly Eagles

চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, ৪ জুলাই তথা স্বাধীনতা দিবসে মৃত্যুবরণ কিন্তু কেবল জেফারসন ও অ্যাডামসই করেননি। এর পাঁচ বছর পর একই দিনে ইহলোক ত্যাগ করেন দেশটির পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোও। কিছুদিন বাদে বস্টন ট্র্যাভেলারসহ বেশ কিছু সংবাদপত্র লেখে, “আরো একবার আমাদের একটি জাতীয় জয়ন্তীতে এমন কোনো ঘটনা ঘটল, সম্ভাবনার বিচারে যাকে যুক্তিগ্রাহ্য করা অসম্ভব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস: জনমনে ভীতি সঞ্চারের নেপথ্যে

আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনের যে দিকটি আজো রহস্যাবৃত