in

জাপানি অন্তরীণ ক্যাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় (পর্ব ২)

(প্রথম পর্বের পর)

অ্যাসেম্বলি সেন্টারে স্থানান্তর

সেনা পরিচালিত উচ্ছেদ প্রকল্প শুরু হয়ে গিয়েছিল ২৪ মার্চ থেকেই। জাপানি আমেরিকানদের সামনে মাত্র ছয়দিন সময় বেঁধে দেয়া হয়। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাদেরকে নিজেদের প্রয়োজনীয় সব সম্পদ সরিয়ে ফেলতে হবে, কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থা করতে হবে।

কেউ অন্তত এক-ষোড়শাংশ জাপানি হলেও তাকে উচ্ছেদের শিকার হতে হয়, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল ১৭,০০০ অনূর্ধ্ব ১০ বছর বয়সী শিশুও। এছাড়াও আরো ছিল বেশ কয়েক হাজার বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধী।

জাপানি আমেরিকানরা তাদের বাসস্থানের নিকটস্থ কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে প্রতিবেদন করে। সেখান থেকে তাদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হয় কোনো একটি স্থানান্তর কেন্দ্রে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। স্থানান্তর কেন্দ্রে মাসখানেক থাকার পর আবার তাদেরকে পাঠিয়ে দেয়া হয় কোনো একটি স্থায়ী যুদ্ধকালীন বাসস্থানে।

অ্যাসেম্বলি সেন্টারে স্থানান্তরিত একটি পরিবার; Image Source: Getty Images

এই কেন্দ্রগুলোর অবস্থান ছিল একদমই দুর্গম অঞ্চলে। এমন সব জায়গায়, যেগুলো সাধারণত ব্যবহৃত হয় মেলার মাঠ বা রেসট্র্যাক হিসেবে। এসব জায়গায় যেসব দালানকোঠা ছিল, সেগুলোও মানুষের থাকার উপযোগী করে বানানো হয়নি। সেগুলো মূলত ছিল গরু বা ঘোড়ার আস্তাবল। অথচ নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যময় বাসস্থান ছেড়ে সবচেয়ে সম্পদশালী জাপানি মানুষটিকেও বাধ্য করা হয় এখানে থাকতে। পোর্টল্যান্ড, ওরেগনে ৩,০০০ মানুষ বাস করে প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল লিভস্টক এক্সপোজিশন ফ্যাসিলিটিজের গবাদি পশুর প্যাভিলিয়নে।

লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে মাত্র কয়েক মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত স্যান্টা আনিটা অ্যাসেম্বলি সেন্টার পরিণত হয় একটি ডি-ফ্যাক্টো নগরীতে, যেখানে আটক রাখা হয় ১৮,০০০ জাপানিকে। এদের মধ্যে ৮,৫০০ জনের ঠাঁই হয়েছিল আস্তাবলে। খাদ্যঘাটতি ও অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন পদ্ধতির মাঝে চরম দুরাবস্থায় দিন গুজরান করতে থাকে এখানে আটককৃত জাপানিরা।

অ্যাসেম্বলি সেন্টারের জীবন

অ্যাসেম্বলি সেন্টারগুলোতে আটককৃতদের কাজের সুযোগ ছিল। তবে তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল, একজন আর্মি প্রাইভেটের চেয়ে বেশি মজুরি তাদেরকে দেয়া হবে না। অনেক ধরনের চাকরির ব্যবস্থাই সেখানে ছিল। চিকিৎসক, শিক্ষক থেকে শুরু করে শ্রমিক কিংবা মেকানিক, সব পেশার মানুষরাই কাজ করতে পারত। কয়েকটি অ্যাসেম্বলি সেন্টার ছিল ছদ্মবেশী নেট কারখানা। সেখানেও কাজের সুযোগ মিলত।

অ্যাসেম্বলি সেন্টারের মানুষদের বাস্তুহারা জীবন; Image Source: Getty Images

সুযোগ ছিল শ্রমিক ঘাটতির সময়ে কৃষিকাজ করারও। মৌসুমি কৃষিকাজের জন্য সহস্রাধিক বন্দিকে অন্য রাজ্যে পাঠানোর নজিরও ছিল। এছাড়া চার সহস্রাধিক বন্দিকে দেয়া হয়েছিল কলেজে যাওয়ার অনুমতি।

স্থানান্তর কেন্দ্র

সব মিলিয়ে দশটি স্থায়ী হাউজিং ক্যাম্প পরিচিত ছিল রিলোকেশন সেন্টার বা স্থানান্তর কেন্দ্র নামে। এখানের কাঠামো ছিল অনেকটা ব্যারাকের মতো। কয়েকটি পরিবার মিলে একটি ঘরে বাস করত, সবাই এক জায়গায় বসে খাওয়া-দাওয়া করত। কেউ যদি বিদ্রোহ করত, তবে তাদেরকে শাস্তিস্বরূপ পাঠিয়ে দেয়া হতো ক্যালিফোর্নিয়ার টিউল লেকের বিশেষ ক্যাম্পে

অ্যারিজোনিয়ায় দুইটি স্থানান্তর কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল ভারতীয় রিজার্ভেশনে। ট্রাইবাল কাউন্সিল কর্তৃক এর বিরোধিতা করা হয়েছিল বটে, কিন্তু তা বাতিল করে দেয়া হয় ব্যুরো অভ ইন্ডিয়ান অ্যাফেয়ার্সের মাধ্যমে।

এই শিশুদের কেটেছে একটি দুর্বিষহ শৈশব; Image Source: Getty Images

প্রতিটি স্থানান্তর কেন্দ্রেরই ছিল তার নিজস্ব শহর, যেখানে ছিল স্কুল, পোস্ট অফিস, এবং অন্যানে কাজের সুবিধা। এছাড়া ছিল খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষিভূমি, এবং গবাদি পশুপালনের জন্য খামারও। কিন্তু এই সবকিছু সত্ত্বেও স্বাধীনতা ছিল না। কেননা গোটা শহরটিই ছিল তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। আর কে কী করছে না করছে, সেদিকে নজর রাখার জন্য ছিল বিশাল বিশাল সব ওয়াচ টাওয়ার।

কয়েকটি স্থানান্তর কেন্দ্রেও কাজের সুযোগ করে দিয়েছিল নেট কারখানাগুলো। একটি নেট কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল নৌবাহিনীর শিপ মডেল কারখানায়। এছাড়া অন্যান্য কিছু কারখানাও ছিল। এক কেন্দ্রের কারখানায় উৎপাদিত জামাকাপড়, ম্যাট্রেস, কেবিনেট প্রভৃতি নিয়ে বিক্রি করা হতো অন্যান্য কেন্দ্রে। কয়েকটি কেন্দ্রে এমনকি কৃষিজ প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রও ছিল।

স্থানান্তর কেন্দ্রের সহিংসতা

সহিংসতা ছিল স্থানান্তর কেন্দ্রগুলোর নিত্যকার বিষয়। প্রায়ই তুচ্ছ সব কারণে সহিংসতা জন্ম নিত।

নিউ মেক্সিকোর লর্ডসবার্গে ট্রেনে করে নিয়ে আসা হতো বন্দিদের। এরপর রাতের অন্ধকারে দুই মাইল হাঁটিয়ে তাদেরকে নিয়ে আসা হতো ক্যাম্পে। এই নিয়ে আসার পথে একবার এক বৃদ্ধ লোক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই নিয়ে হুড়োহুড়িতে যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন আরো দুইজন ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করে, এবং তাদেরকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।

১৯৪২ সালের ৪ আগস্ট স্যান্টা আনিটায় এক বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়। বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল রেশনের অভাব এবং ধারণক্ষমতার অধিক জনসংখ্যা। এছাড়া মানজানার, ক্যালিফোর্নিয়ায় একবার চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, যখন মুখোশধারী ছয়জন মিলে মারধোর করেছিল একজন জাপানিজ আমেরিকান সিটিজেনস লিগ সদস্যকে। রায়টের ভয়ে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতার উপর টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। তখন একজনের মৃত্যু হয়।

কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দি জীবন; Image Source: Getty Images

টোপাজ স্থানান্তর কেন্দ্রে একজন মানুষকে গুলি করে হত্যা করেছিল সামরিক পুলিশ। মানুষটির অপরাধ ছিল, সে পেরিমিটারের খুব কাছে চলে গিয়েছিল। এর দুইমাস পর আরেক দম্পতিও ঠিক একই কারণে খুন হয়।

১৯৪৩ সালে আবারো দাঙ্গা বাধে টিউল লেকে। এবারকার কারণ ছিল এক ব্যক্তির দুর্ঘটনায় মৃত্যু। আবারো পুলিশ এসে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে, এবং বিবদমান পক্ষগুলো একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সেখানে সামরিক আইন জারি করে রাখা হয়।

মিতসুয়ে এন্দো

১৯৪৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অন্তরীণ কেন্দ্রগুলোর অবসান ঘটে। এর পেছনে প্রধান কৃতিত্ব ছিল মিতসুয়ে এন্দো নামক এক জাপানি অভিবাসী নারীর, যিনি বিষয়টিকে আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন।

এন্দো বনাম যুক্তরাষ্ট্র মামলায় আদালত কর্তৃক রায় দেয়া হয় যে, ওয়ার রিলোকেশন অথরিটির “কোনো ক্ষমতা নেই সেইসব নাগরিকের উপর জোর খাটানোর, যারা নিজেরাই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের আনুগত্য প্রদর্শন করেছে।”

মিতসুয়ে এন্দো; Image Source: Utah State Historical Society

আদালতে একটি হিবিয়াস করপাস পিটিশন ফাইল করার পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার এন্দোকে সুযোগ দিয়েছিল নিজে মুক্তিলাভের। কিন্তু তাতে রাজি হননি সেক্রেমেন্টো, ক্যালিফোর্নিয়ার এই নারী। তিনি চেয়েছিলেন তার কেসের মাধ্যমে যেন গোটা জাপানি অন্তরীণ ইস্যুটিরই একটি সুরাহা করা হয়।

এর দুই বছর বাদে সুপ্রিম কোর্ট তার সিদ্ধান্ত জানান। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক রায় ঘোষণার একদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন অন্তরীণ ক্যাম্পগুলো বন্ধ করে দেয়ার।

সর্বশেষ জাপানি অন্তরীণ ক্যাম্পটি বন্ধ হয় ১৯৪৬ সালের মার্চে।

শেষ কথা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জাপানি আমেরিকানদের অন্তরীণ ক্যাম্পে বন্দি রাখার বিষয়টি। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, এই ইতিহাস আমাদের অনেকেরই অজানা। শুধু আমরাই বা কেন, স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের শিশু-কিশোররাও আজ এই ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। কেননা যুক্তরাষ্ট্র সরকার চায় না তাদের লজ্জাজনক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে আসুক। তাই তো তারা শিশু-কিশোরদের পাঠ্যপুস্তক থেকে সযত্নে সরিয়ে রেখেছে এই ঘটনাটি।

অন্তরীণ কেন্দ্রের এই শিশুদের ইতিহাস জানে না যুক্তরাষ্ট্রের আজকের প্রজন্ম; Image Source: National Geographic

ঠিক এভাবেই নতুন প্রজন্মের কাছে অজানাই থেকে যায় তাদের দেশের অতীতের লজ্জাজনক ইতিহাসগুলো। তারা কেবল জানতে পারে নিজ দেশের গৌরবময় ঘটনাগুলোর বৃত্তান্ত। ফলস্বরূপ তাদের মনে জন্মায় উগ্র জাতীয়তাবাদ ও অন্ধ দেশপ্রেম। নিজেদের অতীত না জেনেই তারা নিজেদেরকে দাবি করতে থাকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে।

তবে আশার কথা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম বর্তমানে সোচ্চার হয়েছে নতুন প্রজন্মকে তাদের নিজ দেশের গৌরবময় ইতিহাসের পাশাপাশি বিব্রতকর সত্যগুলো জানাবার ব্যাপারেও। তাই তো ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত এক রচনায় তালিকাভুক্ত করা হয়েছে সেইসব ঐতিহাসিক ঘটনার, যেগুলো সম্পর্কে স্কুলে পড়ানো না হলেও বাবা-মায়ের উচিৎ বাচ্চাদের জানানোর। সেই তালিকায় সবার আগে স্থান পেয়েছে জাপানি আমেরিকানদের অন্তরীণ ক্যাম্পে বন্দি রাখার ঘটনাটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

কালো মৃত্যু: মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম মহামারী

ইবনে বতুতা: সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পর্যটক