in

জাপানি অন্তরীণ ক্যাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় (পর্ব ১)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে ন্যূনতম আগ্রহও যদি আপনার থাকে, তাহলে অবশ্যই এটি আপনার অজানা কোনো বিষয় নয় যে ঠিক কবে, কী কারণে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাদের অংশগ্রহণের নেপথ্যে ছিল জাপান সাম্রাজ্যের নৌবাহিনী কর্তৃক ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর ভোরে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌ-ঘাঁটিতে আক্রমণ। পার্ল হারবার আক্রমণ নামে পরিচিত এই অতর্কিত হামলার জের ধরেই পরের দিন, ৮ ডিসেম্বর, আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগদান করে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু পার্ল হারবার আক্রমণ নয়। পার্ল হারবার আক্রমণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ পর্যন্ত ঘটনাগুলো আমরা সকলেই কমবেশি জানি। যে বিষয়টি আমাদের অধিকাংশেরই নজর এড়িয়ে যায়, কিংবা আমরা কোনোদিন জানার চেষ্টাই করিনি, তা হলো: পার্ল হারবার আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত জাপানিদের কী অবস্থা হয়েছিল? এখন আপনাদের সামনে তুলে ধরব সেই সত্য, যা নিঃসন্দেহে আপনাদেরকে চমকে দেবে।

পার্ল হারবার নৌঘাঁটিতে আক্রমণ করে জাপান; Image Source: Getty Images

পার্ল হারবার আক্রমণের পরের কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রায় ১,১৭,০০০ জাপানি আমেরিকানকে (অর্থাৎ আমেরিকার নাগরিকত্ব ছিল তাদের) আদেশ দেয় তাদের বাসস্থান, চাকরি ও ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্তরীণ ক্যাম্পে স্থানান্তরিত হতে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার যুক্তি দেখায়, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এ ছাড়া আর কিছুই করার নেই তাদের। সম্পূর্ণ বিনা দোষে ও বিনা কারণে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়ে অন্তরীণ ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়ার ঘটনাটি বিবেচিত হয় বিংশ শতকের অন্যতম বৃহত্তম নাগরিক অধিকার হরণের দৃষ্টান্ত হিসেবে।

নির্বাহী আদেশ ৯০৬৬

দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জাপানি অন্তরীণ ক্যাম্পগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের নির্বাহী আদেশ ৯০৬৬-এর মাধ্যমে। পার্ল হারবার আক্রমণের প্রায় আড়াই মাস পরে, ১৯৪২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট নির্বাহী আদেশ ৯০৬৬-এ স্বাক্ষর করেন, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল আমেরিকান উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে গুপ্তচরবৃত্তি নির্মূল করা।

বিপুল পরিমাণ জাপানি আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বাস রয়েছে, এমন রাজ্যগুলো অর্থাৎ ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন এবং ওরেগনে সামরিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি রুজভেল্টের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী জাপানি বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এর মাধ্যমে প্রভাবিত হয় প্রায় ১,১৭,০০০ মানুষের জীবন, যাদের সিংহভাগেরই ছিল আমেরিকান নাগরিকত্ব।

যুক্তরাষ্ট্রের দেখাদেখি কয়েক দিনের মধ্যেই অনুরূপ কাজ করে কানাডাও। তারা তাদের পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চল থেকে ২১,০০০ জাপানি বাসিন্দাকে স্থানান্তরিত করে। বাদ যায়নি মেক্সিকোও। এছাড়া পেরু, ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনা থেকে আরো ২,২৬৪ জন জাপানি বংশোদ্ভূত নাগরিককে যুক্তরাষ্ট্রে এনে অন্তরীণ ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হয়।

নির্বাহী আদেশ ৯০৬৬ ঘোষণার প্রচারপত্র; Image Source: FDR Foundation

জাপান বিরোধী কর্মকাণ্ড

নির্বাহী আদেশেরও কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী জাপানি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের প্রত্যাহার করতে থাকে পোর্ট অভ লস অ্যাঞ্জেলেসের অদূরে টার্মিনাল আইল্যান্ড থেকে।

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর, পার্ল হারবার আক্রমণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই, এফবিআই তল্লাশী চালিয়ে বিনা প্রমাণেই ১,২৯১ জন জাপানি সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করে, এবং তাদের সহায়-সম্পত্তি জব্দ করে নেয়।

জানুয়ারি মাসে গ্রেপ্তারকৃতদের পাঠিয়ে দেয়া হয় মনটানা, নিউ মেক্সিকো এবং নর্থ ডাকোটায়। তাদের অধিকাংশই তাদের পরিবার কিংবা পরিচিত জনদের খবর পর্যন্ত দিতে পারেনি, এবং যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা নিখোঁজ থাকে।

ওই একই সময়ে, এফবিআই যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে হাজারো জাপানি বাসিন্দার ব্যক্তিগত বাসভবনে খানা-তল্লাশি চালাতে থাকে, এবং কোনো সম্পদকে সামান্যতম সন্দেহজনক মনে হলেই তা জব্দ করে নিতে থাকে।

এফবিআই কর্তৃক নানাভাবে হেনস্তা করা হতে থাকে জাপানি বংশোদ্ভূতদের; Image Source: History Link

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যাই ছিল জাপানি বংশোদ্ভূত। ভীতসন্ত্রস্ত আমেরিকান রাজনীতিবিদরা তাদের সরকারের প্রতি আহবান জানাতে থাকে, এই সকল জাপানিকেই যেন একযোগে কারারোধ করা হয়। জাপানি মালিকানাধীন নৌকাগুলোও সব বাজেয়াপ্ত করা হয়।

কিছুসংখ্যক জাপানি বাসিন্দাকে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং ১,৫০০ মানুষ—হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থানরত মোট জাপানি জনগোষ্ঠীর ১ শতাংশকে—যুক্তরাষ্ট্রের মূলভূমির ক্যাম্পগুলোতে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

জন ডিউইট

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জন এল ডিউইট ছিলেন ওয়েস্টার্ন ডিফেন্স কম্যান্ডের নেতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, পার্ল হারবারের মতো ঘটনার ফের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উচিৎ হবে সাধারণ জাপানিদেরকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।

নিজের দাবির পক্ষে যুক্তি প্রদান করতে গিয়ে ডিউইট একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন, যেটি ছিল একগাদা ভুলে পরিপূর্ণ। যেমন ধরা যাক, কোনো একটি স্থানে গবাদি পশুর কারণে বিদ্যুতের লাইনে সমস্যা হয়েছে। অথচ সেগুলোর দায়ও তিনি চাপিয়ে দিয়েছিলেন জাপানিদের ঘাড়ে। অর্থাৎ সকল জাপানিকেই এক একজন গুপ্তচর ও আমেরিকা বিরোধী প্রতিপন্ন করা ছিল তার মূল লক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে জাপান বিরোধী প্রচার চালানোর মূল হোতা ডিউইট; Image Source: USA National Archives

যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ ওয়ার, হেনরি স্টিমসন ও অ্যাটর্নি জেনারেল ফ্রান্সিস বিডলের কাছে ডিউইট প্রস্তাবনা পেশ করেন যেন দেশব্যাপী সামরিক অঞ্চল গড়ে তোলা হয়, এবং সকল জাপানিকে আটক করা হয়।

ডিউইটের প্রতিবেদন ও প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কংগ্রেসের একটি শুনানির আয়োজন করা হয়। সেখানে সাক্ষী হিসেবে ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর কালবার্ট এল অলসন, এবং স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল আর্ল ওয়ারেন। তারা সকলেই ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে জাপানিদের তুলে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।

ফ্রান্সিস বিডল প্রেসিডেন্টের কাছে অনুরোধ জানান যে সকল জাপানিকে কারারুদ্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই, বরং সীমিত পরিসরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু সন্দেহভাজনকে আটক করাই যথেষ্ট। কিন্তু তার এ অনুরোধে কর্ণপাত করেননি রুজভেল্ট। তিনি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে দেন। ফলে বৈধতা পেয়ে যায় সাধারণ জাপানি আমেরিকানদের অন্তরীণ ক্যাম্পে আটক করে রাখার বিষয়টি।

ওয়ার রিলোকেশন অথরিটি

রুজভেল্ট নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে দেয়ার পরও সাংগঠনিক দুর্বলতা ও বিশৃঙ্খলার ফলে সেটি বাস্তবায়িত করতে বিলম্ব হচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়, যখন ১৫,০০০ জাপানি আমেরিকান স্বেচ্ছায় নিষিদ্ধ এলাকা ত্যাগ করতে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজ্যসমূহের বাসিন্দারা মোটেই আগ্রহী ছিল না জাপানি বাসিন্দাদের গ্রহণ করতে। তাই জাপানিরা তাদের কাছ থেকে লাভ করে লজ্জাজনক বর্ণবাদী অভ্যর্থনা।

অ্যারিজোনায় অন্তরীণ কেন্দ্র; Image Source: Arizona Republic

শুধু সাধারণ বাসিন্দাদের কথা বললে ভুল হবে। এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারের আদেশ সত্ত্বেও দশটি রাজ্যের গভর্নর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন, কেননা তারা ভয় পাচ্ছিলেন জাপানিরা বোধহয় আর কোনোদিনই ফিরে যাবে না। তাই ওই গভর্নররা দাবি জানান, রাজ্যগুলোকে যদি বাধ্যই করা হয় জাপানিদের গ্রহণ করতে, তাহলে যেন তাদেরকে ক্ষমতা দেয়া হয় জাপানিদের বন্দি করে রাখারও।

এমতাবস্থায় ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে ওয়ার রিলোকেশন অথরিটি নামক একটি নাগরিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কৃষি বিভাগের মিল্টন এস আইজেনহাওয়ারের নেতৃত্বাধীন এই সংগঠনটির দায়িত্ব ছিল জাপানিদের স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। তবে আইজেনহাওয়ার নিজের পদে বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেননি। তার কাছে মনে হয়েছিল সংগঠনটি জোরপূর্বক নির্দোষ নাগরিকদের বন্দি করার মাধ্যমে তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করছে। তাই জুন মাসেই তিনি তার পদ থেকে ইস্তফা দেন।

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

রেনেসাঁ: ইউরোপে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ

কালো মৃত্যু: মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম মহামারী