in

ইবনে বতুতা: সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পর্যটক

“ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটক” খেতাবটি সাধারণত ভেনিসিয় পর্যটক ও বণিক মার্কো পোলোর ভাগ্যেই জোটে, যিনি ত্রয়োদশ শতকে সিল্ক রোড পাড়ি দিয়ে চীন দেশে আসা প্রথম পশ্চিমাদের মধ্যে একজন। তবে অসামান্য দূরত্ব পাড়ি দেয়ায় পোলোর চেয়ে যোজন যোজন ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন চতুর্দশ শতকের মরক্কোর ইসলামিক পণ্ডিত ইবনে বতুতা, যে কারণেই তাকেই অনেকে মনে করেন ইতিহাসের সর্বশেষ্ঠ পর্যটক।

প্রায় ত্রিশ বছরের ভবঘুরে জীবনে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৭৫,০০০ মাইল ভ্রমণ করেছিলেন ইবনে বতুতা। যদিও মুসলিম বিশ্বের বাইরে তার খ্যাতি খুব একটা নেই, তবু ২১ বছর বয়সে পথে নামার পর ৪০টিরও বেশি আধুনিক রাষ্ট্র পরিভ্রমণের মাধ্যমে যে অবিশ্বাস্য কীর্তি ইবনে বতুতা গড়েছিলেন, ইতিহাসের পাতায় তা অক্ষয় হয়ে থাকবে।

৪০টিরও বেশি আধুনিক রাষ্ট্র পরিভ্রমণ করেছিলেন ইবনে বতুতা; Image Source: History

পর্যটক, চিন্তাবিদ, বিচারক এবং সুন্নি ইসলামের মালিকি মাজহাবে বিশ্বাসী একজন ধর্মতাত্বিক ইবনে বতুতার পূর্ণ নাম হলো আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা। ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি মরোক্কোর তাঞ্জিয়ারে এক ইসলামিক বিচারক বা কাজি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে নিজ জন্মভূমি ছাড়েন। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের পবিত্র নগরী মক্কায় গিয়ে হজ্ব পালন করা। এছাড়া যাত্রাপথে ইসলামিক আইন সম্পর্কে জ্ঞানলাভের ব্যাপারেও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল।

প্রথমে একাকীই যাত্রা শুরু করেছিলেন ইবনে বতুতা, একটি গাধার পিঠে চেপে। কিছুকাল পরেই তিনি উত্তর আফ্রিকায় একটি কাফেলার সাথে যোগ দেন। সমুদ্র তীর ঘেঁষা ওই পথ ছিল আরব বেদুইন ও ডাকাতে পরিপূর্ণ। তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন কাফেলার সাথে থাকাকেই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হয়েছিল তার কাছে।

কিন্তু যাত্রার শুরুর দিকেই অন্য এক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন ইবনে বতুতা। প্রচণ্ড জ্বরের মুখে পড়েন, যে কারণে এমনকি পতন এড়াতে নিজেকে গাধার জিনের সাথে বেঁধে রাখতেও বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তবে এরপরও, যাত্রাপথে এক কমবয়সী নারীকে বিয়ের সময় তিনি ঠিকই পেয়ে যান। সেটিই ছিল তার দশটির বেশি বিয়ে ও বিচ্ছেদের মধ্যে প্রথমটি।

দশটির বেশি বিয়ে করেছিলেন ইবনে বতুতা; Image Source: Mental Floss

মিশরে পৌঁছে ইবনে বতুতা ইসলামি আইন বিষয়ে অধ্যায়ন শুর করেন, এবং আলেক্সান্দ্রিয়া ও কায়রো নগরীও ঘুরে আসেন। কায়রো তাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, একে তিনি আখ্যায়িত করেন “সৌন্দর্য ও জাঁকজমকে অদ্বিতীয়” হিসেবে।

এরপর ইবনে বতুতা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মক্কায় পৌঁছান, এবং ধর্মীয় নিয়ম মেনে হজ্বও সম্পন্ন করেন। এখানেই তার ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটতে পারত। কিন্তু হজ্ব পালনের পর তিনি মনস্থির করেন, এখানেই থাকবেন না, ঘুরে দেখবেন মুসলিম বিশ্ব তথা দার আল-ইসলামকে।

ইবনে বতুতার দাবি অনুযায়ী, তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন একটি বিশালাকার পাখি তাকে ডানায় করে উড়িয়ে নিয়ে গেছে প্রাচ্যের দিকে, এবং সেখানেই ছেড়ে এসেছে। এক দরবেশ এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বলেন, তাকে গোটা পৃথিবী পরিভ্রমণ করতে হবে। দরবেশের কথা অনুযায়ী ইবনে বতুতাও নেমে পড়েন বিশ্বভ্রমণের অভিযানে।

এর পরের কয়েক বছর ইবনে বতুতা একটানা ঘুরে চলেছেন পৃথিবীর পথে পথে। প্রথমে তিনি একটি কাফেলার সাথে যুক্ত হয়ে পারস্য ও ইরাক ভ্রমণ করেন। এরপর তিনি আরো উত্তরে যান, যেটি এখন আজারবাইজান হিসেবে পরিচিত। পুনরায় মক্কা ফিরে এসে অস্থায়ী নিবাস গড়ে তোলার পর, তিনি পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন ইয়েমেন। সেখান থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চলে যান হর্ন অব আফ্রিকায়। সোমালি নগরী মোগাদিশু ঘুরে দেখার পর যান কেনিয়া ও তানজানিয়ার সমুদ্র উপকূলে।

আফ্রিকা ত্যাগ করার পর, ইবনে বতুতা সিদ্ধান্ত নেন এবার যাবেন ভারতে। তিনি আশা করেছিলেন, ভারতে গিয়ে তিনি একজন সম্মানজনক ‘কাজির পদ দখল করতে পারবেন। ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে প্রথমে তিনি মিশর ও সিরিয়া পার করে তুরস্কে এসে পৌঁছান। যেমনটি তিনি অন্য সকল মুসলিম অধ্যুষিত ও নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে করে এসেছেন, তেমনই এখানেও নিজেকে একজন ইসলামিক পণ্ডিত পরিচয় দিয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে সেবা-যত্ন ও অফুরন্ত সম্মান লাভ করেন। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তিনি কাপড়-চোপড়, ঘোড়া থেকে শুরু করে পুরস্কার হিসেবে এমনকি উপপত্নী ও দাস-দাসীও পেয়েছেন।

মুসলিম দেশগুলোতে প্রচুর সম্মান পেতেন ইবনে বতুতা; Image Source: Wikimedia Commons

তুরস্ক থেকে ইবনে বতুতা কৃষ্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে উজবেগে হাজির হন। উজবেগের দরবারে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনাই জানানো হয়। তারপর সেখান থেকে গোল্ডেন হোর্ডে খানের একজন স্ত্রীকে সাথে নিয়ে চলে যান কনস্টান্টিনোপলে। বাইজেন্টাইনে এক মাস কাটানোর পর তিনি হাজিয়া সোফিয়া দর্শনে যান। সেখানে এমনকি সম্রাটের সাথে সংক্ষিপ্ত একটি সাক্ষাৎকারের সুযোগও হয় তার। আগে কখনো এত বড় কোনো অমুসলিম নগরীতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা না থাকা ইবনে বতুতা এখানকার দেয়ালের মাঝে অগণিত খ্রিস্টান চার্চের উপস্থিতি দেখে হতভম্ব হয়ে যান।

তার পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইউরেশিয়ান স্তেপ। সেখান থেকে আফগানিস্তান ও হিন্দু কুশ হয়ে অবশেষে ভারতে প্রবেশ করেন তিনি। ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে দিল্লী নগরীতে আগমনের পর তিনি শক্তিশালী ইসলামিক সুলতান মুহাম্মদ তুঘলকের দরবারে কাজি হিসেবে চাকরি পেয়ে যান। এখানে বেশ কয়েক বছর আরাম আয়েসেই কাটান তিনি। এমনকি বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চার জন্মও দেন। কিন্তু এক পর্যায়ে তিনি সুলতানের ব্যাপারে ভীত হয়ে পড়েন। কেননা সুলতান ছিলেন খুবই নৃশংস। নিজের শত্রুদের অকথ্য অত্যাচারের মাধ্যমে হত্যা করায় তার ছিল জুড়ি মেলা ভার।

অবশেষে ১৩৪১ খ্রিস্টাব্দে একটি সুযোগ পেতেই যেন পালিয়ে বাঁচেন তিনি। সুলতান তাকে চীনের মঙ্গল দরবারে দূত হিসেবে প্রেরণের জন্য মনোনীত করেন। এখনও সমান রকম ভ্রমণপিপাসু ইবনে বতুতা নতুন এক রোমাঞ্চের লোভে অসংখ্য পুরস্কার ও দাস-দাসী সমেত এক কাফেলা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তার পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে।

কিন্তু তখনও ইবনে বতুতা জানতেন না, নতুন এই প্রাচ্য ভ্রমণই তাকে দিতে চলেছে তার জীবনের ভয়াবহতম অভিজ্ঞতা। ভারতীয় সমুদ্র উপকূল ধরে এগিয়ে চলার পথে তার দল মারাত্মক হেনস্তার শিকার হয় বিশৃঙ্খল হিন্দুদের দ্বারা। এরপর তিনি অপহৃতও হন, এবং লজ্জাস্থান ঢাকার এক চিলতে কাপড় ছাড়া আর সবকিছুই ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তার কাছ থেকে। কোনো রকমে কালিকট বন্দর পর্যন্ত আসতে সমর্থ হন তিনি। কিন্তু এখানেও যেন দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ে না তার। সমুদ্রযাত্রা শুরু করলে ঝড়ের কবলে পড়লে ডুবে যায় তার জাহাজ, এমনকি মৃত্যু ঘটে তার দলের অনেকের।

ভারত থেকে চীন ভ্রমণ ছিল ইবনে বতুতার জীবনের কঠিনতম যাত্রা; Image Source: Wikimedia Commons

এভাবে একের পর এক বিপর্যয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন ইবনে বতুতা। পিছু হঠাই ছিল তার জন্য সম্ভাব্য সেরা উপায়। কিন্তু আবারো দিল্লী ফিরে গিয়ে ভয়ঙ্কর সেই সুলতানের সম্মুখীন হতে একদমই রাজি ছিলেন না তিনি। তাই ঠিক করলেন, সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে মালদ্বীপে যাবেন। সেখানে গিয়ে কয়েক বছর কাটালেন তিনি, বেশ কিছু স্ত্রীও গ্রহণ করলেন, এবং জীবিকা নির্বাহ করতে লাগলেন একজন কাজি হিসেবে।

ইবনে বতুতা হয়তো আরো অনেকদিনই মালদ্বীপে কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু সেখানকার শাসকদের সাথে বনিবনা না হওয়ায়, তিনি পুনরায় চীন অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। মাঝপথে একবার শ্রীলঙ্কায় থামেন তিনি। এবং অবশেষে ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে, প্রথমবার ভারত ত্যাগের চার বছর পর, চীনা বন্দর কুয়ানজুতে তিনি নোঙর করেন।

মঙ্গল চীনকে ইবনে বতুতা আখ্যায়িত করেন “পর্যটকদের জন্য সেরা এবং সবচেয়ে নিরাপদ দেশ” হিসেবে। এছাড়া এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও হৃদয় কেড়েছিল তার। কিন্তু চীনাদের ভিন্নধর্মী জীবনাচার ও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে অবসাদ্গ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। ভ্রমণের নেশাও ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে তার। ফলে চীনেই ঘটে তার ভ্রমণ-সমাপ্তির সূচনা। পরিচিত পৃথিবীর একদম কিনারায় পৌঁছে যাওয়ার পর, ইবনে বতুতা সিদ্ধান্ত নেন মরক্কোয় ফিরে যাওয়ার।

১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে তানজিয়ারে ফিরে আসেন ইবনে বতুতা। ততদিনে তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। তাই সেখানে অল্প কয়েকদিন কাটানোর পর তিনি স্পেনে রওনা হন প্রমোদ ভ্রমণের উদ্দেশে। কয়েক বছর সাহারা থেকে মালি সাম্রাজ্য পর্যন্ত কর্মহীন আনন্দময় জীবন উপভোগ করেন তিনি। ঘুরে আসেন টিম্বাকতুও।

ভ্রমণকালে কখনোই ডায়েরি বা জার্নাল জাতীয় কিছু লিখতেন না ইবনে বতুতা। কিন্তু ১৩৫৪ সালে তিনি যখন চিরতরে ফিরে এলেন মরক্কোয়, দেশটির সুলতান তাকে নির্দেশ দিলেন একটি ভ্রমণকাহিনী রচনার। সেজন্য পরের বছরটি তিনি ব্যয় করেন ইবনে জুজাই নামক এক লেখকের কাছে নিজের সমস্ত ভ্রমণকাহিনী খুলে বলার কাজে। এভাবেই রচিত হয় তার বিখ্যাত বই “রিহলা” (মুসলিম সম্রাজ্য, এর শৌর্য, শহর এবং এর গৌরবান্বিত পথের প্রতি উৎসাহিদের জন্য একটি দান)।

“রিহলা” অমর করে রেখেছে ইবনে বতুতাকে; Image Source: History

প্রাথমিক প্রকাশের পর ইবনে বতুতার এ বইটি হয়তো তেমন একটা সাড়া জাগাতে পারেনি, কিন্তু সময়ের সাথে লড়াই করে ঠিকই টিকে গেছে বইটি। আজকের দিনে চতুর্দশ শতকের ইসলামিক বিশ্বকে জানবার এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় “রিহলা”।

“রিহলা” প্রকাশের পর ইতিহাসের পাতা থেকে অনেকটা যেন নিশ্চিহ্নই হয়ে যান ইবনে বতুতা। ধারণা করা হয়, জীবনের শেষ দিনগুলো মরক্কোতে একজন কাজি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর, ১৩৬৮ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে কোনো এক সময় মৃত্যু হয় তার। কিন্তু এর বাইরে তার ব্যাপারে আর কিছুই জানা যায়নি। হয়তো সারাটা জীবন রোমাঞ্চ ও জ্ঞানের অন্বেষণে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরে বেড়াবার পর, জীবনের শেষাংশটুকু এক জায়গায়, নীরবে-নিভৃতে কাটিয়ে দেওয়াকেই শ্রেয় বলে মনে করেছিলেন ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম এই পর্যটক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

জাপানি অন্তরীণ ক্যাম্প: যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায় (পর্ব ২)

মানসা মুসার মহানুভবতায় মিশরের মহাবিপর্যয়