in

আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ধ্বংস হচ্ছে পৃথিবী; যেভাবে প্রযুক্তি করবে সাহায্য

লাইফস্টাইল চ্যানেল অন করতে কিংবা ম্যাগাজিন মেলে ধরতেই নিত্যনতুন সব খাবারের রেসিপি চোখে পড়ে আমাদের। রেস্টুরেন্টগুলোতেও হরেক রকম নব আবিষ্কৃত লোভনীয় খাবারের বিজ্ঞাপনে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম।

সব মিলিয়ে খাদ্য রসিকদের জন্য এ এক দারুণ আনন্দের সময়। তবে যারা কেবল খাদ্যগ্রহণ করে নিজেদের পেট ঠান্ডা করাকেই যথেষ্ট বলে মনে করেন না, বরং ভাবেন গোটা মানবজাতির কথা, তাদের জন্য বিষয়টি যথেষ্ট সংবেদনশীল, এবং একই সাথে চিন্তারও।

না, যাদের সামর্থ্য আছে, তাদেরকে না খেয়ে থাকতে বলছি না। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমাদের মেন্যুতে বৈচিত্র্যময় খাদ্যের সমাহারের সংযোজন ঘটাতে গিয়ে, জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না? কিংবা পৃথিবী নামক এই গ্রহটির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ছে কি না?

ধ্বংসের মুখে পৃথিবী; Image Source: Business Insider

সম্প্রতি এই বিষয়টিকে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন মেটাবলিকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ইভা গ্লাদেক। দ্য নেক্সট ওয়েবের এক সম্মেলনে বক্তৃতাকালে তিনি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন বর্তমান বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থা কীভাবে পৃথিবীকে ক্রমশ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সে চিত্র। পাশাপাশি তিনি আরো বলেছেন, খাদ্য ব্যবস্থার লাগামছাড়া পরিণতির নেপথ্যে রয়েছে আমাদেরই ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস।

২৫ থেকে ৩০ শতাংশ গ্রিনহাউজ গ্যাসের সাথেই সংযোগ রয়েছে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার। পৃথিবীপৃষ্ঠ, যা উদ্ভিদ জীবনকে সাহায্য করে, তার ৫০ শতাংশই বর্তমানে জড়িত রয়েছে খাদ্য উৎপাদনের কাজে। এছাড়া সমুদ্রের ৯০ শতাংশ মাছকেও এখন আমরা নিজেদের সুবিধামতো শাসন করে চলেছি।

ইভা গ্লাদেক, প্রধান নির্বাহী, মেটাবলিক

শুধু এটুকুই যাদের মনে ভয় ধরাতে যথেষ্ট নয়, তাদের উদ্দেশ্যে আরো কিছু সতর্কবার্তা ছিল গ্লাদেকের। তিনি বিশ্বাস করেন, এই মুহূর্তে বিশ্বের জনসংখ্যা যে হারে বেড়ে চলেছে, মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে, এবং মানুষ আগের চেয়ে অনেক সম্পদশালীও হয়ে উঠছে, তাতে করে ২০৫০ সালের মধ্যে খাদ্যের চাহিদা হয়তো বর্তমানের দ্বিগুণ হয়ে উঠবে।

বক্তব্য রাখছেন ইভা গ্লাদেক; Image Source: The Next Web

তবে অবস্থা যতই ভয়াবহ ও আশঙ্কাজনক হোক না কেন, গ্লাদেক প্রচন্ড রকমের আশাবাদী যে আমাদের হাতে এখনো যথেষ্ট সময় আছে ভুলগুলো শুধরে নিয়ে ইতিবাচক কিছু করার। তিনি বলেন,

যদিও আমাদের হাতে সময় খুব কম, তবু আমাদের পক্ষে এখনো খুবই সম্ভব ঘটনাপ্রবাহের গতিপথে পরিবর্তন আনা। আর এক্ষেত্রে প্রযুক্তি হলো এমন একটি পথ, যা আমাদেরকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতে পারে।

ইভা গ্লাদেক, প্রধান নির্বাহী, মেটাবলিক

বাস্তবিকই কি প্রযুক্তির পক্ষে পৃথিবীকে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসজনিত কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব? এক্ষেত্রে তিনটি বিশেষ ধরনের প্রযুক্তির কথা নিজের বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন গ্লাদেক। চলুন জেনে নিই সেই প্রযুক্তি তিনটির সম্পর্কে।

নির্ভুল কৃষিব্যবস্থা

টেকসই খাদ্য ভবিষ্যৎ আনয়নে উপকার করবে এমন যে তিনটি প্রযুক্তির কথা গ্লাদেক বলেছেন, তাদের মধ্যে প্রথমটি হলো নির্ভুল কৃষিব্যবস্থা। এর অর্থ হলো, কৃষিকাজের করণীয় ও প্রয়োজনীয়ের একটি নিখুঁত ও স্পষ্ট পরিমাণ বের করা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্স ব্যবহার করে আমরা খুব সহজেই জানতে পারব একটি উদ্ভিদ জন্মানোর জন্য আমাদেরকে ফসলি জমিতে ঠিক কী পরিমাণ রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। এর এক ফোঁটাও যদি আমরা কম বা বেশি প্রয়োগ না করি, তাহলে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পরিমাণ ফলন যেমন হবে, তেমনই জমির পুষ্টি গুণাগুণও অক্ষত থাকবে।

কৃষিজমিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ড্রোন; Image Source: The Next Web

আবার স্যাটেলাইট ও অন্যান্য সেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এটিও জানা যাবে যে, কবে এবং কোথায় আমাদেরকে চারা রোপণ করতে হবে। যেমনটি গ্লাদেক ব্যাখ্যা করেছেন, “কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবহাওয়ার ধরনের কারণে, একটি ফসলের চারা মাত্র সাতদিন আগে রোপণের মাধ্যমেও অন্তত ৫০ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব।”

ভার্টিকাল ফার্মিং

ভবিষ্যৎ খাদ্যব্যবস্থার অন্য আরেকটি যে খাতে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, তা হলো ভার্টিকাল ফার্মিং। এর মাধ্যমে কেবল প্রতি একক জমিতে বেশি খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে অনেক বেশি মানুষের পেট ভরানোই সম্ভব হবে না, পাশাপাশি এর মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে মূল্যবান পানিও বাঁচানো যাবে।

সিঙ্গাপুর ভিত্তিক ভার্টিকাল ফার্মিং কোম্পানি স্কাই গ্রিন্স; Image Source: Sky Greens

তবে গ্লাদেক এ কথাও অবিলম্বে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, সকল ধরনের ভার্টিকাল ফার্মই পরিবেশের জন্য ভালো নয়। কেননা অনেক ভার্টিকাল ফার্মে প্রচুর পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়। অবশ্য যেমনটি দেখা গেছে বিশ্বের প্রথম লো কার্বন হাইড্রোলিক কমার্শিয়াল ফার্মিং ব্যবস্থা ‘সিঙ্গাপুর স্কাই গ্রিন্স’-এ, তাতে গ্লাদেক মোটামুটি নিশ্চিত যে স্বদিচ্ছা থাকলে এই প্রযুক্তির সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহারের মাধ্যমে সেরা ফলটাই বের করে আনা সম্ভব হবে।

টেকসই ভোজন ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন

এ কথা সত্য যে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা চাট্টিখানি কথা নয়। একজন মানুষ জীবনভর যে ধরনের খাবার খেয়ে এলো, হুট করে সে সেটি ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো খাবার খাওয়া শুরু করব, এমন চাওয়াটা রীতিমতো বাড়াবাড়িই বটে। তবে বাস্তবিকই, মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনার মতো বেশ কিছু প্রযুক্তির আগমন ঘটছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে ইম্পসিবল বার্গারের কথা। প্রাকৃতিক মাংসের বিকল্প হিসেবে এতে ব্যবহার করা হয়েছে ল্যাবে উৎপাদিত কৃত্রিম মাংস, যা খেতে আসল মাংসের মতোই। তফাৎ কেবল এখানেই যে, এ ধরনের মাংসের দাম কম, আর উৎপাদনের সময় প্রকৃতিরও অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতি করা হচ্ছে। গ্লাদেকের বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে নিজেদের শারীরিক স্বাস্থ্য এবং মানিব্যাগের স্বাস্থ্য, দুই-ই রক্ষার স্বার্থে আরো অনেক মানুষই এমন বিকল্প খাদ্যগ্রহণের দিকে ঝুঁকবে।

কৃত্রিম মাংস দিয়ে তৈরি বার্গার; Image Source: Twitter

এ ব্যাপারে মোটামুটি নিঃসন্দেহই থাকা যায় যে খাদ্য ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে যে গন্ডগোলটি আমরা পাকিয়েছি, প্রযুক্তিই তার কার্যকর সমাধান নিয়ে আসবে। তবে গ্লাদেকের এ কথাটিও ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তই আমাদের ভবিষ্যতকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে। আমরা আমাদের ক্ষণিকের আনন্দ ও তৃপ্তির জন্য দীর্ঘ পরিসরে পৃথিবীকে হুমকির মুখে ঠেলে দেব, নাকি এখন থেকেই সচেতন হব, সে সিদ্ধান্ত আমাদের নিজেদেরকেই নিতে হবে।

তা না হলে, আমরা এমন একটি গ্রহের মালিক আর থাকব না, যেটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাথে ভাগ করে নিতে পারব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

শিল্প বিপ্লব: আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি

ভারতে জন্ম যেসব খেলার