in

যেভাবে শত্রুমুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী গৌরবগাঁথা আমাদের সবার মনে চিরস্থায়ী স্মৃতি হিসেবে রয়েছে। দেশের বীর সন্তানদের অপরিমেয় আত্মত্যাগের ফলে পাকিস্তানি হানাদারদের পরাজয়ে বিজয়ের নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল। তবে এ সূর্য তখনও আলোকিত করতে পারেনি দেশের সকল স্থানকে। তখনো শত্রুর কালো থাবার অন্ধকারে, অত্যাচারে পিষ্ট হচ্ছিল দেশের অনেক মানুষ।

নয় মাস মুক্তিসংগ্রামের পরও দেশের কিছু জায়গা তখনো শত্রু মুক্ত করতে পারেনি মুক্তিসেনারা। দেশকে পুরোপুরি মুক্ত করতে ১৬ ডিসেম্বরের পরও সেসব জায়গায় খন্ড খন্ড যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। এসব যুদ্ধ পরিচালনায় নিহত হয়েছেন আরো অনেক বীরসন্তান। ইতিহাসের পাতায় তাদের আখ্যান এখনো অনেকটাই উপেক্ষিত। ফলে এ খন্ড যুদ্ধগুলোর বিবরণ বেশীরভাগ মানুষেরই জ্ঞানের অগোচরে রয়ে গেছে। মিরপুর মুক্তকরণ যুদ্ধ এর মধ্যে অন্যতম। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি শত্রু মুক্ত হওয়া মিরপুর ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণক্ষেত্র

মিরপুর ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণক্ষেত্র; Image Source: The Asian Age

মুক্তিযুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিজয় লাভ করার ৪৫ দিন পরও মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনের ৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ছিল পাকিস্তানি দোসরদের দ্বারা অবরুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন বিহারি জনগোষ্ঠী ও রাজাকারদের সমন্বয়ে পাকিস্তানিরা গড়ে তুলেছিল “ইস্ট পাকিস্তান সিভিলিং বাহিনী”।

১৬ ডিসেম্বরের পরও প্রায় এক বিগ্রেড পাকিস্তানি সেনা নিয়ে এদেশের মাঝখানে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে ঘাঁটি গেড়ে ছিল তারা। যুদ্ধ চুক্তি না মেনে দেশের মানুষদের উপর অত্যাচার-লুণ্ঠন, খুন-হত্যা চালিয়েই যাচ্ছিলো। তাদের কাছে ছিল ব্যাপক অস্ত্রের মজুদ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন কারণে ঢাকার মুক্তিযোদ্ধারা বা ভারতীয় মিত্রবাহিনী এদের উপর আক্রমণ করতে পারেনি। যুদ্ধে আত্মসমর্পণের পরও পাকিস্তানিরা এদেশের উপর কর্তৃত্ব বজায় রাখার অশুভ পরিকল্পনা ও অভিলাষ পোষণ করছিল। মিরপুরে চলছিলো তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। রাজাকার, আলবদর, বিহারিদের জন্য সেটি ছিল অভয়ারণ্য, অবাধে বাঙালি নির্যাতন আর হত্যার জন্য সমগ্র মিরপুর জল্লাদখানায় পরিণত হয়েছিল। মিরপুরের মানুষজন স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও জিম্মি হয়ে ছিল পাকিস্তানি দোসরদের কাছে।

মিরপুরে অবস্থিত জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ; Image Source: The Daily Star

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পর ঠিক হয় ৩০ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র জমা দেবে। এজন্য সেদিনই মিরপুর মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ৩ প্লাটুন সেনা সদস্যের সাহায্যে অপারেশনে অংশ নেয় পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। মিরপুর মুক্তকরণ যুদ্ধে গেরিলা দল মামা বাহিনী অংশগ্রহণ করে শহীদুল হক মামার নেতৃত্বে। অভিযানের শুরু থেকেই মিরপুর এলাকায় শত্রুদের অস্ত্র জমা দেয়ার আহ্বান করে মাইকিং করতে থাকে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা। তাদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে উল্টো হামলা শুরু করে শত্রুবাহিনী। তাদের সমরশক্তি সম্বন্ধে ঠিক তথ্য না থাকায় প্রথম আক্রমণেই নিহত হয় অনেক বাঙালি সেনা ও পুলিশ সদস্য। শুরু হয় প্রচন্ড যুদ্ধ

মিরপুর মুক্তকরণ যুদ্ধে পাকিস্তানি দোসররা শুরু থেকেই ছিল অত্যন্ত তৈরি ও সংঘটিত। তাদের ছিল প্রচুর অস্ত্রের মজুদ। প্রতিটি ঘরে জানালা ফাঁক দিয়ে ও ছাদের উপর মেশিনগান, রাইফেল ও আধুনিক অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে পরিকল্পিত হামলা শুরু করে শত্রুপক্ষ। অতর্কিত বিপুল আক্রমণে প্রথম প্রায় ১০ মিনিটেই শহীদ হয়ে যান ৪২ জনের মতো যোদ্ধা। অবশেষে এস ফোর্স ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সহায়তায় আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসরদের।

ভাই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হন জহির রায়হান; Image Source: Bangla Insider

এই অভিযানে গিয়ে নিখোঁজ হন মুক্তিযোদ্ধা ও খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হান। বিজয়ের উষালগ্নে নিখোঁজ হওয়া ভাই বিশিষ্ট সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সারারের খোঁজে গিয়েছিলেন জহির রায়হান। এরপর অনেক বছর পর্যন্ত তাঁর মৃতদেহও খুঁজে পাওয়া যায়নি। যুদ্ধে শহীদ হন সেনাবাহিনীর লে. সেলিম, পুলিশের এএসপি জিয়াউল হক খান লোদীসহ বাঙালি সেনা, পুলিশ, মুক্তিযোদ্ধার ১২২ জন সদস্য। মিরপুর যুদ্ধে লেফটেন্যান্ট সেলিমের কৃতিত্ব ছিল অবিস্মরণীয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বুকে বুকে গুলি লাগলেও নিজের জীবন উপেক্ষা করে রক্তের শেষ বিন্দু থাকা পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন তিনি।

মিরপুর মুক্তিদাতা শহীদ লে. সেলিম; Image Source: Facebook

মিরপুর মুক্ত হওয়ার পর একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে পাকিস্তানি দোসরদের পৈশাচিকতার সাক্ষী বদ্ধভূমিগুলো। যেখানে নিয়ে বিভৎস অত্যাচার করে হত্যাকান্ড চালানো হতো নিরীহ বাঙালিদের উপর। বদ্ধভূমি থেকে বস্তা ভর্তি মানুষের চোখ ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উদ্ধার করা হয়। ৩১ জানুয়ারি শত্রু বিতাড়িত হওয়ার পর অনেক মানুষ তাদের স্বজনদের খোঁজে পরিত্যক্ত ঘাঁটিতে গিয়ে বিভৎস লাশের সন্ধান পায়। তবে বেশীরভাগ নিখোঁজ মানুষের সঠিক খোঁজ পাওয়া যায়নি। নৃশংসতার বিবরণ দেখে হতবাক হয়ে যায় দেশবাসী। এ পর্যন্ত ১০টি বদ্ধভূমি শনাক্ত করা হয়েছে মিরপুরে। ১৯৯৯ সালে মিরপুর মুসলিমবাজার বদ্ধভূমি আবিষ্কারের পর জহির রায়হানসহ মিরপুর যুদ্ধে নিখোঁজ অনেক ব্যক্তিদের হত্যারহস্যের উদঘাটন হয় তখন।

মিরপুরের বদ্ধভূমি; Image Source: Dhaka Courier

২০০১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ৩১ জানুয়ারি মিরপুর মুক্ত দিবস পালন করা হয়। এ উপলক্ষে কবিতা,গান,নাটক প্রভৃতি সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। বক্তৃতা, আলোচনা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা করা হয়। মিরপুর মুক্তকরণ যুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের নিকট পরিচিত করতে র‌্যাবিট কমিউনিকেশনের ব্যানারে “মিরপুর দ্য লাস্ট ফ্রন্টিয়ার” নামে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করা হয়েছে।

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও মিরপুর যুদ্ধে শহীদ হওয়ার বীর যোদ্ধারা তাদের যথাযোগ্য প্রাপ্য মর্যাদা পাননি। দেশের স্কুল কলেজের পাঠ্য সিলেবাসেও তাদের অবদান সম্পর্কে কোনো উল্লেখ না থাকা সত্যিই দুঃখজনক। যোগ্য জনবল গড়ে তুলতে হলে দেশের নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই জাতীয় বীরদের সঠিক ও পূর্ণ ইতিহাসের সাথে পরিচিত করাতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

বিশ্বখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রদের ঐতিহাসিক ভিত্তি (দ্বিতীয় পর্ব)

বিশ্বখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রদের ঐতিহাসিক ভিত্তি (প্রথম পর্ব)