in

যেভাবে ভারত-পাকিস্তান হয়ে উঠল পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র

বর্তমানে নয়টি দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম ভারত ও পাকিস্তান। পারমাণবিক শক্তিধর অন্য দেশগুলো হলো চীন, ফ্রান্স, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশিয়ার, তৃতীয় বিশ্বের দুইটি দেশ কীভাবে পারমাণবিক শক্তি অর্জন করেছিল, তা নিয়েই এই আলোচনা।

১৯৯৮ সালে বেশ কিছু পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেদের পারমাণবিক শক্তিমত্তার জানান দেয় দুই প্রতিবেশী ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত-পাকিস্তান। এরপর পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা থেকে নিবৃত্ত থাকলেও, সাধারণভাবে তাদেরকে ডি ফ্যাক্টো পারমাণবিক শক্তি হিসেবেই বিবেচনা করা হয়, এবং এখনো প্রতি বছর তারা দেশের সার্বিক বাজেটের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে চলেছে এর পেছনে।

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধকল্প বা এনপিটি নামে যে চুক্তিটিতে বিশ্বের ১৮৯টি দেশ স্বাক্ষর করেছে, তাদের মধ্যে নেই ভারত-পাকিস্তান। এ চুক্তির উদ্দেশ্য হলো পারমাণবিক অস্ত্র এবং অস্ত্র প্রযুক্তি বিস্তার প্রতিরোধ করা, এবং পারমাণবিক শক্তিগুলির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে সহযোগিতা জোরদার করা।

পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যায় ভারতের চেয়ে এগিয়ে পাকিস্তান; Image Source: Dawn

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অন্য আরো অনেক বিষয়ে বিরোধ থাকলেও, এ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার ব্যাপারে দুই দেশকেই সম্মত হতে দেখা যায়। কেননা তাদের দাবি, এ চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বকে দুইটি ভাগে ভাগ করে ফেলা হচ্ছে, যা অবশ্যম্ভাবী বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে। পারমাণবিক অস্ত্র থাকা ও না থাকার ভিত্তিতে এই যে বৈষম্য, তাতে বিশ্বাসী নয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশ দুইটি। তারা চায় না পারমাণবিক শক্তি সংশ্লিষ্ট যাবতীয় সব ক্ষমতা “বিগ ফাইভ” – চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই চলে যাক, এবং বাকি দেশগুলো বঞ্চিত থাকুক।

যেহেতু পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রতি দেশ দুইটির এমন অবস্থান, সে কারণেই তাদের মধ্যকার পারস্পরিক বিরোধ নিয়ে তটস্থ থাকতে হয় গোটা বিশ্বকেই। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলতে থাকলে, বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোরও তা নিয়ে ভাবিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।

দাবি করা হয়ে থাকে, ভারতের পক্ষে নাকি ২৬০০ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব; Image Source: IANS

পারমাণবিক অস্ত্র শক্তির দিক থেকে ভারত-পাকিস্তান প্রায় সমপর্যায়ে থাকলেও, অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির হাতে এসব অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ার ভয়টা পাকিস্তানেরই বেশি, যেহেতু অতীতেও বেশ কয়েকবার দেশটির সামরিক বাহিনীগুলো তাদের সমরশক্তির মূল কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে।

তবে এরপরও, উত্তর কোরিয়ার মতে ভারত ও পাকিস্তান দুইটি আদর্শ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, কেননা পারমাণবিক অস্ত্র থাকার পরও তারা অবশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি।

সুং-ইয়ুন লি, দ্য ফ্লেচার স্কুলে কোরিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক, মনে করেন দেষ দুইটি এ স্বীকৃতি অর্জন করেছে প্রাথমিক পরীক্ষার পর আর কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা না করার মাধ্যমে।

“তারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছে। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই তাদের ষষ্ঠ পারমাণবিক শক্তি পরীক্ষার পরীক্ষার পরই থেমে গেছে। অথচ এর মাধ্যমে কিন্তু তারা অ-পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত হয়নি।”

পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়ায় ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ নিয়ে তটস্থ থাকতে হয় সবাইকেই; Image Credit: Mukesh Gupta/REUTERS

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত তাদের পারমাণবিক শক্তি অর্জনের কার্যক্রম শুরু করে সেই ১৯৬২ সালে, চীনের সাথে সংক্ষিপ্ত একটি সীমান্ত যুদ্ধের পরপরই। এরপর ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো বলেন, “ভারত যদি বোমা তৈরি করে, তাহলে আমরা ঘাস-পাতা খেয়ে বেঁচে থাকব, দরকার হলে ক্ষুধার্ত থাকব, কিন্তু আমরা নিজেরাও এমন একটি অস্ত্র অবশ্যই বানাব।”

এ থেকেই বোঝা যায়, পারমাণবিক শক্তিমত্তার দিক থেকে ভারতের চেয়ে পিছিয়ে না পড়ার জন্য ঠিক কতটা মরিয়া ছিল পাকিস্তান। কিন্তু তারা তাদের নিজস্ব পারমাণবিক শক্তির উন্নয়নে একটু যেন বিলম্বই করে ফেলে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্মিলিতভাবে গড়ে তোলা যৌথবাহিনীর কাছে হেরে যাওয়ার পর কেবল তারা পারমাণবিক শক্তি অর্জনের লক্ষ্যে গুরুত্ব সহকারে কাজ করতে শুরু করে।

“১৯৭১ সালের যুদ্ধটি পাকিস্তানকে অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, যা বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছিলেন পাকিস্তানের নেতারা। পারমাণবিক অস্ত্রই তখন ছিল সেই অস্তিত্ব সংকটের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ সমাধান,” বলেন টোবি ডালটন, ওয়াশিংটন ডিসির কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের পরমাণু নীতি প্রকল্পের সহ-পরিচালক।

খ্যাতনামা বিজ্ঞানী আব্দুল কাদের খান; Image Source: TNS

১৯৭৫ সালে পাকিস্তানের খ্যাতনামা বিজ্ঞানী আব্দুল কাদের খান ইউরোপ থেকে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে আসেন, এবং তার প্রত্যাবর্তন পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি অর্জনের গতিকে ত্বরান্বিত করে। ইরান, লিবিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তি প্রকল্পগুলোতে যেসব উপাদান ও জ্ঞান ব্যবহৃত হতো, আব্দুল কাদের খানের গবেষণাগারেও ঠিক সেগুলোরই অনুকরণ করা হতে থাকে।

এদিকে এর এক বছর আগেই, ১৯৭৪ সালে ভারত তাদের প্রথম পারমাণবিক বোমা “স্মাইলিং বুদ্ধ”-র পরীক্ষা করে ফেলে। তবে ভারত বা পাকিস্তান কোনো দেশই বহির্বিশ্বের কাছ থেকে সত্যিকারের পারমাণবিক শক্তির খেতাব পায়নি ১৯৯৮ সালের আগ পর্যন্ত। সে বছর মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ছয়টি পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করে ফেলে ভারত। এরপর দেখার বিষয় ছিল, পাকিস্তান কবে পাল্টা জবাব দেয়। সেজন্য খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। সপ্তাহ তিনেক পরই পাকিস্তানও নেমে পড়ে লড়াইয়ে। প্রথম দিনেই তারা পাঁচটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়, এবং ষষ্ঠটি তৃতীয় দিনে।

১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা; Image Source: BBC

নিজেদের মধ্যকার বিরোধের পাশাপাশি, চীনের সাথে পারমাণবিক প্রতিসাম্য ঘোচানোর বিষয়টিও উদ্বুদ্ধ করেছে ভারত ও পাকিস্তানকে। দুই দেশের সাথেই সীমান্ত রয়েছে চীনের। সেই চীন পারমাণবিক অস্ত্রের দিক থেকে মহা শক্তিধর হয়ে পড়ার ফলে ভারত-পাকিস্তানকে সব সময়ই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হতো, যা দূরীকরণের একমাত্র উপায় ছিল নিজেরাও পারমাণবিক শক্তি হয়ে ওঠা।

যদিও ভারতের চিরাচরিত সেনাবাহিনীর (অ-পারমাণবিক) দৈর্ঘ্য পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বড়, যেহেতু আকারের দিক থেকেও পাকিস্তানের চেয়ে তারা চারগুণ বড়, কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যায় পাকিস্তানের চেয়ে কিছুটা পিছিয়েই রয়েছে ভারত।

সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের; Image Source: SIPRI

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০১৯ সালের হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের ১৩০ থেকে ১৪০টি পারমাণবিক অস্ত্রের বিপরীতে, পাকিস্তানের মালিকানায় রয়েছে ১৫০ থেকে ১৬০টি পারমাণবিক অস্ত্র। তবে কাঠামোগত দিক থেকে আবার ভারত এগিয়ে, কেননা তাদের রয়েছে পারমাণবিক ত্রিমুখী শক্তি, অর্থাৎ একই সাথে আকাশ, ভূমি কিংবা সাগর থেকে পারমাণবিক অস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা। অপরদিকে পাকিস্তানের সামুদ্রিক ক্রুইজ মিসাইলগুলো এখনো অপেক্ষাকৃত অনুন্নত। অবশ্য ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা ভারতকে টেক্কা দিতে নতুন ক্রুইজ মিসাইলের পরীক্ষা চালিয়েছে, যা ভবিষ্যতে তাদেরকে সমুদ্র এবং স্থল থেকে হামলা চালাতে সাহায্য করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

চা দিয়েই অনেক কিছু!

লে. সেলিম: মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গনের অকুতোভয় যোদ্ধা