in

যেভাবে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে মানুষের সঙ্গী হলো ছাতা

জামাকাপড় পরে ফিটফাট হয়ে, ব্যাগে বইপত্র সব ঢুকিয়ে, জুতোটা পায়ে দিয়ে যেই না বের হতে যাব, শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ এখন। বৃষ্টি তাই নিত্যকার ঘটনা, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু ঘন্টাখানেক বাদেই যে আমার ক্লাস। এখনই বাসা থেকে না বেরোলে ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে কিছুতেই ভার্সিটি পৌঁছাতে পারব না সময়মতো। তাই এখন বেরোতে আমাকে হবেই। সুতরাং আর কিছু না ভেবে চৌকাঠ ডিঙিয়ে বাইরে পা রাখতে যাব, ঠিক তখনই মা ডেকে বলল, “ছাতাটা নিয়ে যা খোকা, মাথায় যেন একটুও পানি না লাগে…”

দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ছাতা; Image Source: Getty Images

উপরের এই দৃশ্যপটের সাথে সকলেই নিশ্চয়ই নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পাচ্ছেন? আর কেনই বা পাবেন না। ছাতা যে পরিণত হয়েছে আমাদের আটপৌরে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে। রোদ কিংবা বৃষ্টি – ছাতা ছাড়া আমাদের অনেকের যেন চলেই না। কারো কারো তো আবার ব্যাগের ভিতর সব সময়ই একটা ছাতা রাখা থাকে। কারণ প্রকৃতির বিরুদ্ধে সারাদিন লড়াই করে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ছাতার যে কোনো বিকল্প নেই!

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কীভাবে মানুষ শুরু করল ছাতার ব্যবহার? কীভাবেই বা এটি বনে গেল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ? সে গল্পই আজ শোনাব আপনাদের।

ছাতার রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস; Image Source: Wikimedia Commons

যেভাবে আবিষ্কৃত হয় ছাতা

ছাতা কিন্তু মোটেই আধুনিক কোনো উদ্ভাবন নয়। প্রাথমিক ছাতার আগমন ঘটে আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর আগে, যার নিদর্শন দেখা যায় প্রাচীন মিশর, অসরীয়া, গ্রিস ও চীনে। তবে মোটের উপর চীনকেই ধরা হয় ছাতার প্রকৃত জন্মস্থান হিসেবে।

তবে মজার ব্যাপার হলো, প্রাচীন এই ছাতা বা প্যারাসল কিন্তু বৃষ্টির আক্রমণ ঠেকানোর উদ্দেশ্যে আবিষ্কৃত হয়নি। এগুলো এমনভাবে নকশা করা হতো যেন সূর্যের তাপের বিপরীতে ব্যবহারকারীকে ছায়া প্রদান করতে পারে। পরবর্তীতে চীনারা প্রথম তাদের ছাতাকে “ওয়াটারপ্রুফ” করে তোলে, যাতে সেগুলো মানুষকে বৃষ্টি থেকেও সুরক্ষিত রাখতে পারে। তারা তাদের কাগজের প্যারাসলগুলোর উপর মোম লাগিয়ে বার্ণিশ করে, যেন সেগুলোকে বৃষ্টির মধ্যে ব্যবহার করা সম্ভব হয়, এবং বৃষ্টির পানিতে কাগজগুলো ছিঁড়ে না যায়।

আমব্রেলা শব্দের উদ্ভব

নিশ্চয়ই জানেন, ছাতার ইংরেজি নাম হলো আমব্রেলা। কখনো কি মনে হয়েছে, কেন এর নাম হলো আমব্রেলা? বলছি শুনুন।

আমব্রেলা শব্দটি এসেছে মূলত লাতিন শব্দ “আমব্রা” থেকে, যার অর্ধ অন্ধকার বা ছায়া। যেহেতু ছাতা মানুষকে রোদ থেকে ছায়া প্রদান করে, সে কারণেই এমন নামকরণ। অর্থাৎ নামকরণের ক্ষেত্রেও কিন্তু বৃষ্টির পানি নয়, সূর্যের প্রখরতা থেকে মানুষকে রক্ষার বিষয়টিই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

ছাতার জন্মস্থান চীন; Image Source: Getty Images

জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি

ষোড়শ শতকের শুরু থেকে পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে উত্তর ইউরোপের যেসব অঞ্চলে বৃষ্টি বেশি হয়, সেখানে ছাতার জনপ্রিয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশ্য শুরুতে এটিকে এমন একটি সহায়ক বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যা কেবল নারীদের হাতেই মানায়। কিন্তু তারপর আগমন ঘটে পারস্যের পর্যটক ও লেখক জোনাস হ্যানওয়ের (১৭১২-৮৬)। তিনি ইংল্যান্ডে গিয়ে টানা ৩০ বছর প্রকাশ্যে ছাতা ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তিনি ইংরেজ পুরুষদের মাঝেও ছাতা ব্যবহারের প্রবণতা ঢুকিয়ে দেন। ইংরেজ ভদ্রলোকেরাও এরপর আস্তে আস্তে ছাতা ব্যবহার করতে শুরু করে, এবং প্রায়সই তারা তাদের ছাতাকে ডাকতে থাকে “হ্যানওয়ে” নামে।

প্রথম ছাতার দোকান

দোকানে আরো অনেক কিছুর সাথে ছাতা পাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু এমন কোনো দোকানও কি হতে পারে, যেখানে কেবল ছাতাই পাওয়া যাবে? শুধু ছাতার দোকানের এ ধারণার উদ্ভব ঘটে ১৮৩০ সালে, যখন খোলা হয় “জেমস স্মিথ অ্যান্ড সন্স” নামের ছাতার দোকানটি। এমনকি এখনো যদি আপনারা লন্ডনের ৫৩ নং নিউ অক্সফোর্ড স্ট্রিটে যান, দেখতে পাবেন প্রায় ১৯০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে টিকে আছে দোকানটি।

আজও টিকে আছে জেমস স্মিথ অ্যান্ড সন্স; Image Source: Getty Images

ছাতার ধরন

শুরুর দিকের ইউরোপীয় ছাতা তৈরি হতো কাঠ কিংবা কাঁচকড়া দিয়ে, এবং সেগুলো ঢাকা থাকত আলপাকা বা তৈলাক্ত ক্যানভাস দিয়ে। কারিগররা শক্ত কাঠ দিয়ে তৈরি করত ছাতার হাতল। এবং ছাতার কারিগরদের তখন সম্মান ও সম্মানী দুই-ই ছিল ঈর্ষণীয়।

১৮৫২ সালে স্যামুয়েল ফক্স আবিষ্কার করেন ইস্পাতের শিকওয়ালা ছাতার নকশা। তিনি “ইংলিশ স্টিলস কোম্পানি”-ও প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তখন পর্যন্ত কিন্তু ছাতাকে সব সময় খোলা অবস্থায়ই রাখতে হতো। বেশ অনেক বছর পর ছাতার কারিগররা আবিষ্কার করেন ছাতাকে বন্ধ করার উপায়। এর ফলে ছাতা শিল্পে আসে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। খেয়াল করে দেখবেন, বর্তমান সময়ও কিন্তু সিংহভাগ ছাতাই “কল্যাপসিবল” বা বন্ধ হতে সক্ষম। এ থেকেই বোঝা যায়, এ ধরনের ছাতা ঠিক কতটা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এ জনপ্রিয়তার পেছনে প্রধান কারণ মূলত এটিই যে ছাতাকে যদি বন্ধ করা যায়, তাহলে সেটির আকার অনেক কমে আসে এবং যেকোনো জায়গায় বহন করা সম্ভব হয়।

আধুনিক সময়ের ছাতা

১৯২৮ সালে হ্যান্স হপ্ট আবিষ্কার করেন পকেট আমব্রেলা। তিনি সে সময় ভিয়েনায় ভাস্কর্য নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। ১৯২৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি একটি “কমপ্যাক্ট ফোল্ডেবল” ছাতার প্রোটোটাইপ তৈরি করে সেটির পেটেন্ট নেন। পরবর্তীতে একটি অস্ট্রিয়ান কোম্পানি থেকে “ফ্লার্ট” নামে নতুন সেই ছাতার মডেলটি তৈরি হতে থাকে। এরপর থেকে ভাঁজ করে রাখার মতো ছাতার আরো নতুন নতুন সব মডেল তৈরি হতে থাকে, এবং সময়ের সাথে সাথে ছাতার আকৃতিও কমতে থাকে, যাতে করে ব্যবহারকারীর পক্ষে প্রয়োজন শেষ হলে সহজেই ছাতাটি নিজের পকেট বা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলা যায়।

সবচেয়ে বেশি ছাতা তৈরি হয় চীনে; Image Source: GBTimes

বর্তমান সময়

বর্তমান সময় ছাতা একটি পৃথক শিল্পে পরিণত হয়েছে, এবং এর রয়েছে একটি স্বকীয় বাজার। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ছাতা তৈরি হয় চীনে। আর চীনের একটি শহর, সোংজিয়া বিবেচিত হয় “ছাতার রাজধানী” হিসেবে। এখানে রয়েছে এক হাজারেরও বেশি ছাতার কারখানা, যেখানে প্রতি বছর প্রায় অর্ধবিলিয়ন ছাতা, অর্থাৎ চীনের মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ ছাতা তৈরি হয়। এখানে একজন ছাতা কারিগরই দিনে তৈরি করেন ৩০০টির বেশি ছাতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

মানবসভ্যতার ইতিহাস বদলে দেয়া ১০ উদ্ভাবন

কার্বন ডাইঅক্সাইড থেকে তৈরি হবে জ্বালানি