in

যে হত্যাকাণ্ড উসকে দিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধ

সোফিকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন অস্ট্রিয়ার যুবরাজ, আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ। তাই তার চাচা, অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের আপত্তি সত্ত্বেও, ১৯০০ সালে তিনি বিয়ে করে বসেন সোফিকে। তাদের বিয়েতে উপস্থিত পর্যন্ত ছিলেন না জোসেফ।

সোফিকে না মানার কারণ ছিল এই যে, সোফি মোটামুটি এক অভিজাত পরিবারের মেয়ে হলেও, ইউরোপে না তাদের ওই সময় কোনো সাম্রাজ্য ছিল, না পূর্বে কোনোদিন। ফলে সোফি আর ফার্দিনান্দের সন্তানদের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই বলেও ঘোষণা করেন জোসেফ।

এছাড়া সোফিকে আরো বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, যেকোনো ইম্পেরিয়াল বাঙ্কেট চলাকালীন প্রতিটি ঘরে তাকে সবার শেষে প্রবেশ করতে হতো, তা-ও কোনো এসকর্ট ছাড়াই। ডিনার টেবিলেও তাকে স্বামীর থেকে অনেক দূরের কোনো চেয়ারে বসতে হতো।

আর্চডিউক ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী সোফি; Image Source: AP Photo/Keystone

এদিকে তার বিয়ে নিয়ে আপত্তি থাকলে কী হয়েছে, ফার্দিনান্দ কিন্তু ঠিকই ফ্রাঞ্জ সিংহাসনের উত্তরসূরী ছিলেন, এবং একই সাথে ছিলেন সেনাবাহিনীর ইনস্পেক্টর জেনারেলও। এ পদের অংশ হিসেবেই, ১৯১৪ সালের জুন মাসে তিনি বসনিয়া-হারজেগোভিনায় বেশ কিছু পরিদর্শনে যেতে সম্মত হন।

অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি তখন সদ্যই এই অঞ্চল দখল করেছে কয়েক বছর পূর্বে, তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র সার্বিয়ার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। ফার্দিনান্দ সার্বদের “শূকর”, “চোর”, “খুনি”, “বদমাশ’ ইত্যাদি মনে করতেন বটে, তারপরও তিনি এই দখলের বিরোধিতা করেছিলেন। কারণ তার কাছে মনে হয়েছিল, এর ফলে এ অঞ্চলের ইতিমধ্যেই অস্থির রাজনৈতিক অবস্থারও আরো অবনতি ঘটবে।

পূর্বে অটোমান সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণাধীন বসনিয়া-হারজেগোভিনার জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল সার্ব। এছাড়া ৩০ শতাংশ মুসলিম, ২০ শতাংশ ক্রোয়াট, এবং অবশিষ্ট ১০ শতাংশ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সংমিশ্রণ।

ফার্দিনান্দের আগমনের কথা শুনে, “ইয়ং বসনিয়ানস” নামক কৃষিজীবী-শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা একটি গোপন বিপ্লবী বাহিনী তাকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকে।

ফার্দিনান্দ ছিলেন সেনাবাহিনীর ইন্সপেক্টর জেনারেলও; Image Source: freetour.com

মে মাসে, গাভরিলো প্রিন্সিপ, ত্রিফকো গ্রাবেজ এবং নাদেলিকো কাব্রিনোভিচ নামের তিন বিপ্লবী সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে চলে আসে। বেলগ্রেডে তারা ছয়টি হাতবোমা, চারটি সেমি অটোমেটিক পিস্তল, এবং সায়ানাইড সুইসাইড ক্যাপসুল পায় তথাকথিত “ব্ল্যাক হ্যান্ড” নামের একটি জঙ্গী বাহিনীর কাছ থেকে, যাদের গভীর যোগাযোগ ছিল সার্বিয়ান সেনাবাহিনীর সাথে।

বেলগ্রেড পার্কে কিছু সময় তাদের পিস্তল নিয়ে অনুশীলনের পর, তিন বিপ্লবী আবার ফিরে যায় বসনিয়া-হারজেগোভিনায়। সীমান্ত থেকে অস্ত্রশস্ত্র সমেত পার হওয়ার ক্ষেত্রেও তারা সাহায্য লাভ করে ব্ল্যাক হ্যান্ডের। তবে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে তাদের এ অভিযানে সার্বিয়ান সরকারের কোনো হাত ছিল কি না।

এদিকে ফার্দিনান্দ ও সোফি তাদের সাম্রাজ্য ছেড়ে বসনিয়া-হারজেগোভিনার উদ্দেশে রওনা দেন ২৩ জুন। এ যাত্রা শুরুর আগেই আর্চডিউক বিভিন্ন মহল থেকে সতর্কবার্তা পেয়ে আসছিলেন। অনেকে তাকে যাত্রা বাতিল করারও উপদেশ দিয়েছিল। তাই তিনি বেশ ভালোভাবেই জানতেন, যাত্রাটি ঠিক কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে চলেছে তার জন্য।

ফার্দিনান্দ ছিলেন একজন দুর্ধর্ষ শিকারী; Image Source: Wikimedia Commons

বসনিয়া-হারজেগোভিনায় পৌঁছে ফার্দিনান্দ ও সোফি রাজধানী সারায়েভো থেকে কয়েক মাইল দূরে একটি স্পা টাউনে ওঠেন। প্রথম দুইদিন ফার্দিনান্দ তার সামরিক দায়িত্ব পালন করেন, আর সোফি স্থানীয় বিভিন্ন স্কুল ও এতিমখানা পরিদর্শন করেন।

এরপর একদিন খানিকক্ষণ অবসর সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে এ দম্পতি গাড়ি চালিয়ে সারায়েভোর বাজার ঘুরে দেখতে যান। সেখানে তাদের দেখে বিশাল ভিড় জমে যায়, এবং সেই ভিড়ের মধ্যে ছিল প্রিন্সিপও। তবে সেদিন তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে বেশ উষ্ণ ও মার্জিত অভ্যর্থনাই পেয়েছিলেন।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের সাথে একটি বাঙ্কেটের পর, ফার্দিনান্দ ও সোফির সামনে আর একটি দিনই বাকি ছিল বাড়ি ফেরার আগে। দিনটি ছিল ২৮ জুন। সেদিন সকালে আর্চডিউক তার বড় ছেলেকে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন তার সাম্প্রতিক পরিক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে।

এরপর তিনি ও সোফি একটি ট্রেনে চড়ে বসেন সারায়েভোয় একটি সংক্ষিপ্ত সফরের লক্ষ্যে। বারবার তাদের এরকম একসাথে বেরিয়ে পড়ার কারণ হলো, বিদেশের মাটিতে এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক ভ্রমণগুলোতেই কেবল আর্চডিউক আর সোফি একসাথে হাঁটার বিরল সুযোগ পেতেন।

তবে চমকপ্রদ বিষয় হলো, সেদিনের পরবর্তী ভাগে আর্চডিউকের আরেকটি সংক্ষিপ্ত সেনা পরিদর্শনের দায়িত্ব ছিল, এবং তা শেষ করার পরও সোফি আবার তার পাশাপাশি হাঁটার অনুমতি পান। এরপর তারা একটি ওপেন-টপড গাড়িতে ওঠেন সিটি হলে মটরকেড রাইডের উদ্দেশ্যে।

ওয়াশিংটন টাইমসে আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ এবং তার স্ত্রীর নিহত হওয়ার খবর; Source: tes.com

তাদের সামনের গাড়িটিতে ছয়জন উচ্চ-প্রশিক্ষিত ও সশস্ত্র প্রহরী থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ছিল মাত্র একজন, আর তার সাথে তিনজন স্থানীয় পুলিশ। শুধু এ দিনই নয়, পুরো সফর জুড়েই অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান অফিশিয়ালরা ফার্দিনান্দের নিরাপত্তা বিধানের চেয়ে ডিনার মেন্যুতে কী থাকবে সে বিষয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আসছিল।

এদিকে, সাতজন ইয়ং বসনিয়ান অপেক্ষা করছিল অ্যাপেল কোয়েতে; যেটি মিলজাকা নদীর সমান্তরালে এগিয়ে চলা সারায়েভোর একটি মেইন এভিনিউ। মটরকেডটি ঠিক কোন রুট ধরে যাবে, তা আগে থেকেই প্রকাশিত ছিল। সে অনুযায়ী সামনে গাড়ি বহর আসতে, কাব্রিনোভিচ তার হাতে থাকা বোমা ছুঁড়ে মারে একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে। কিন্তু ভুল গাড়িতে আক্রমণ করেছিল সে। ফলে দুইজন আর্মি অফিসার এবং আরো সাতজন বাই-স্ট্যান্ডার আহত হলেও, সে যাত্রায় বেঁচে যান ফার্দিনান্দ ও সোফি।

ওই অবস্থায় ফার্দিনান্দের উচিৎ ছিল তৎক্ষণাৎ সারায়েভো ত্যাগ করে নিজ দেশের উদ্দেশে রওনা দেয়া। কিন্তু তা না করে তিনি পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সিটি হলে সব আনুষ্ঠানিকতা পালনের সিদ্ধান্ত নেন। সেটি শেষ করে তিনি বাকি সকলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেন হাসপাতালে গিয়ে আহত অফিসারদের দেখে আসবেন। শেষ পর্যন্ত সবাই তা-ই মেনে নেয়।

আবার যেন কোনো বোমা হামলাকারীর পাল্লায় না পড়তে হয়, তা নিশ্চিত করতে গাড়ি বহর এবার তুমুল বেগে অ্যাপেল কোয়ে দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু ভুলক্রমে, গাড়ি বহরের প্রথম তিনটি গাড়ি মূল রাস্তা ছেড়ে পাশের একটি রাস্তায় ঢুকে পড়ে, যেটি তাদের পরিকল্পনায় ছিল না। এবং ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ওই রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে ছিল প্রিন্সিপ।

এই গাড়িতে করেই যাচ্ছিলেন আর্চডিউক ও তার স্ত্রী; Image Source: The Independent

গাড়িগুলো যখন গতি কমিয়ে অ্যাপেল কোয়েতে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে দুইটি গুলি ছুঁড়ে দেয় প্রিন্সিপ। একটি গুলি লাগে ফার্দিনান্দের ঘাড়ে, অপরটি সোফির তলপেটে। ফার্দিনান্দ তখন চিৎকার করে প্রিয়তমা স্ত্রীকে বলতে থাকেন, “সোফি, সোফি, মরে যেয়ো না তুমি, বেঁচে থেকো আমাদের সন্তানদের জন্য!”

কিন্তু না, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভবলীলা সাঙ্গ হয় ফার্দিনান্দ ও সোফি দুজনেরই।

পরবর্তীতে ঠিকই আটক করা হয় তাদের ১৯ বছর বয়সী হত্যাকারী প্রিন্সিপকে — একজন সার্বিয়ান আর্মি থেকে প্রত্যাখাত, হালকা-পাতলা গড়নের তরুণ, যে ভিড়েছিল ইয়ং বসনিয়ানসের সাথে। প্রিন্সিপ অবশ্য দাবি করেছিল, সোফিকে মারার কোনো পরিকল্পনাই তার ছিল না, সে চেয়েছিল শুধু ফার্দিনান্দকে হত্যা করতে।

তখনকার প্রচলিত আইন অনুযায়ী, সর্বনিম্ন যে বয়স হলে কোনো আসামীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া যায়, তার চেয়েও তিন সপ্তাহ কম ছিল প্রিন্সিপের বয়স। তাই তাকে দেয়া হয়েছিল ২০ বছরের কারাদন্ড। কিন্তু ১৯১৮ সালের এপ্রিলে, মাত্র ২৩ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে জেলে বসেই মৃত্যু হয় তার।

আর প্রিন্সিপের কৃতকর্মের ফলে, বিশ্বব্যাপী শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা গ্রেট ওয়ার। অনেক দিন ধরেই ইউরোপের পরাশক্তিদের মাঝে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। সেটি চূড়ান্ত রূপ নেয় আর্চডিউকের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে, এবং ছারখার করে দেয় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও সেখানকার অধিবাসীদের। সব মিলিয়ে এ যুদ্ধে মারা গিয়েছিল ৯০ লক্ষ সৈন্য, এবং প্রায় সমান সংখ্যক সাধারণ মানুষ। ১৯১৮ সালে সমাপ্তি ঘটে ভয়াবহ এ যুদ্ধের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

ইতিহাসের মর্মান্তিক চার জাহাজডুবি

কলম্বাস সম্পর্কিত কিছু অস্বস্তিকর সত্য