in

যেভাবে এল বাবা দিবস

বর্তমানে চারিদিকে দিবসের ছড়াছড়ি। অধিকাংশ দিবসই অপ্রয়োজনীয়, এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অর্থহীনও বটে। তবে এমন কিছু দিবসও আবার রয়েছে, যেগুলোর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিমেয়। তেমনই একটি দিবস হলো বাবা দিবস। গত ১৬ জুন বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১১১টিরও বেশি দেশে পালিত হয়েছে দিবসটি।

বাবা দিবসের রীতি-রেওয়াজের সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত আছি। এদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাবা নিয়ে কিংবা বাবাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যেমন অজস্র পোস্ট দেখা যায়, তেমনই বাস্তব জীবনেও বাবার সাথে কিছুটা বেশি সময় কাটানো কিংবা বাবাকে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দিয়ে খুশি করার দৃষ্টান্ত দেখা যায়।

বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বাবা দিবস; Image Source: iStock

কিন্তু একটি বিষয়ে হয়তো অনেকেই জানেন না যে, বাবা দিবসের পথচলার সূচনাটা কিন্তু খুব একটা মসৃণ ছিল না। বরং এ দিবসের রয়েছে বেশ লম্বা ও বিতর্কিত একটি ইতিহাস। আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব বাবা দিবসের সেই ইতিহাসেরই বৃত্তান্ত।

প্রথমেই একটি কথা জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, বাবা দিবসের আগেই কিন্তু মা দিবসের উদ্ভব ঘটেছে। এবং মা দিবস থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই যে বাবা দিবসের আগমন ঘটেছে, এমন কথায়ও একদমই অত্যুক্তি হয় না।

সেই ১৮৬০’র দশক থেকেই পালিত হয়ে আসছে মা দিবস, এবং ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এটিকে একটি জাতীয় ছুটির দিন হিসেবেও ঘোষণা দেয়া হয়।

সে তুলনায় বাবা দিবসের বয়সকাল নেহাতই কম বলা যায়। ১৯০৮ সালে প্রথম বাবাদের উদ্দেশ্যে এমন কোনো দিবস পালন করা হয়েছিল। আর সেটির আয়োজন করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার একটি চার্চ। আগের বছর একটি কয়লা খনিতে বিস্ফোরণে মৃতদের প্রতি সম্মান জানিয়ে স্মরণসভার আয়োজন করেছিল তারা। আর সেখানে ওইসব মৃতের সন্তানেরা তাদের বাবার স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেছিল। তবে এ স্মরণসভার আয়োজকদের এমন কোনো পরিকল্পনাই কিন্তু ছিল না যে তারা এ দিবসটিকে প্রতি বছরই পালন করবে, এবং বাস্তবিকও তারা তা করেনি।

কিন্ত মজার ব্যাপার হলো, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার চার্চে অনুষ্ঠিত স্মরণসভাটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই পরের বছর সোনোরা লুইস স্মার্ট ডড নামে এক নারী শুরু করেন বাবা দিবসকে একটি জাতীয় দিবসে পরিণত করার লড়াই। তিনি এ লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন মূলত সন্তান মানুষ করতে গিয়ে তার নিজের বাবার জীবন সংগ্রাম দেখে।

বাবা দিবসের পেছনে রয়েছে ডডের অবদান; Image Source: The Economic Times

ডডরা ছিলেন মোট ছয় ভাইবোন, এবং এই ছয়টি সন্তানকেই তার বিপত্নীক বাবা নিজ হাতে মানুষ করেছিলেন। তাই ডডের মনে হয়েছিল, কেবল মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্যই আলাদা দিবস থাকবে কেন, এমন একটি দিবস তো বাবাদেরও পাওনা। বাবাদের সেই পাওনা মেটানোর জন্যই পুরো এক বছর নিজের স্থানীয় সম্প্রদায় ও সরকারের কাছে আবেদন করতে থাকেন তিনি।

এবং শেষ পর্যন্ত ডডের প্রচেষ্টা কিন্তু সফলও হয়েছিল। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯১০ সালের ১৯ জুন তার নিজের রাজ্য ওয়াশিংটনে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হয় বাবা দিবস। এরপর থেকে দিবসটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য রাজ্যেও ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

১৯১৬ সালে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট উইলসন ওয়াশিংটন ডিসি থেকে একটি বাটনে প্রেস করে, টেলিগ্রাফ সিগনালের মাধ্যমে স্পোকানে একটি পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বাবাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। এছাড়া ১৯২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কলেজ দেশের প্রতিটি রাজ্যের সরকারের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান বাবা দিবস পালনের জন্য।

কিন্তু এত কিছুর পরও, বাবা দিবসকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ছুটির দিনে পরিণত করা কিন্তু মোটেই সহজ কাজ ছিল না। অনেক মানুষ এ দিবসটিকে জাতীয় ছুটির দিনে রূপান্তরের জন্য আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন, এবং তাদেরকে লম্বা একটি সময় অপেক্ষা করতে হয়। বাবা দিবসকে জাতীয় ছুটির দিনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি বড় অবদান ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের।

স্ত্রী-সন্তানকে দেশে ফেলে যুদ্ধে যেতে হতো সেনাদের; Image Source: Wikimedia Commons

বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন সৈন্যরা তাদের পরিবার থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকতে বাধ্য হন। দেশকে সেবার করার জন্য সৈন্যদের পরিবার থেকে দূরে থাকার বিভিন্ন হৃদয়বিদারক কাহিনী ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সৈন্যরা তাদের সন্তানকে বিদায় জানাচ্ছেন, এমন অনেক ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে।

ফলে সৈন্যদের প্রতি দেশের অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি মাধ্যম খুঁজতে থাকে। আর তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য বাবা দিবসের চেয়ে ভালো উপলক্ষ্য আর কী-ই বা হতে পারে! তাই বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই, পুরো যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বাবা দিবস পালনের প্রচলন শুরু হয়ে যায়, এবং এটি সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতাও পেয়ে যায়।

কিন্তু যদি ভেবে থাকেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে না হতেই বাবা দিবসকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, তাহলে ভুল করবেন। কেননা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন আন্দোলনকারীদের রাস্তায় আন্দোলন চালিয়ে যেতে হয়। পত্রপত্রিকায়ও এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হতে থাকে।

অবশেষে ১৯৭২ সালে, অর্থাৎ প্রথম বাবা দিবস পালনের ছয় দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বাবা দিবসকে জাতীয় ছুটির দিনে রূপান্তরের একটি আইনে স্বাক্ষর করেন।

বাবা দিবসকে জাতীয় ছুটির দিনে রূপান্তরিত করেন প্রেসিডেন্ট নিক্সন; Image Source: Time Magazine

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাও জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে বাবা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। সে অনুযায়ী এ বছর বাবা দিবস পড়েছে ১৬ জুন তারিখে।

এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আলাদা আলাদা তারিখেও বাবা দিবস পালনের রেওয়াজ আছে। বিশেষত ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে সেইন্ট জোসেফ’স ডে-তেও (১৯ মার্চ) বাবাদের উদ্দেশ্যে সম্মান প্রদর্শন করা হয়ে থাকে। ওইসব দেশে এ দিনটি একটি ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক ছুটির দিনও বটে।

তো এই ছিল বাবা দিবস পালনের ইতিহাস। এখন অনেকেই হয়তো ভাবছেন, শুরুতে যে বিভিন্ন বিতর্কের কথা বলেছিলাম, সেটি কি তবে ভাঁওতাবাজি ছিল? না পাঠক, প্রকৃতপক্ষেই বাবা দিবস পালন নিয়ে এক সময় অনেক বিতর্ক হয়েছে।

১৯২০ ও ১৯৩০’র দশকে যুক্তরাষ্ট্রে একটি আন্দোলন শুরু হয়, যার মূল কথা ছিল: আলাদা করে যেন মা বা বাবা দিবস কোনোটিই পালন করা না হয়, বরং একটি “প্যারেন্টস ডে”-র ব্যবস্থা করা হোক, যেদিন মা বা বাবা কারো প্রতিই বৈষম্য না দেখিয়ে, একই সাথে দুইজনের প্রতিই সম্মান প্রদর্শন করা হবে।

বাবা দিবস এখন বিলিয়ন ডলার অর্থনীতি; Image Source: Shotwell Candy Co

এছাড়া আরেকটি শ্রেণী ছিল, যারা বাবা দিবস পালনকে সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার উপর আঘাত হিসেবেও মনে করেছিল। তাদের মতে, বাবাদের জন্য কোনো দিবসের প্রয়োজন নেই। এ দিবসটি নাকি নিছকই একটি “হলমার্ক গিমিক”, যার উদ্ভব ঘটেছে অর্থনৈতিক কারণে।

বাবা দিবসের প্রচলন অর্থনৈতিক কারণেই ঘটেছে কি না, এ নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, সত্যি সত্যিই কিন্তু বাবা দিবসকে ঘিরে বর্তমানে একটি বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি সৃষ্টি হয়ে গেছে। এক পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে শুধু বাবা দিবসে বাবাকে উপহার দেয়ার পিছনেই আমেরিকার নাগরিকরা এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

কলম্বাস সম্পর্কিত কিছু অস্বস্তিকর সত্য

চীনের মহাপ্রাচীর: মানুষের এক অসামান্য সৃষ্টি