in

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (পর্ব ১)

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। রাজধানী হিসেবে এই শহরের রয়েছে ৪০০ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস। শত ঝড়-ঝঞ্ঝা সহ্য করেও, মহীরুহের মতো টিকে আছে এ শহর। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এ শহরের জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লক্ষ।

দেশের মফস্বল শহর কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল, সব জায়গার মানুষেরই লক্ষ্য থাকে সুন্দর জীবন গড়তে ঢাকায় এসে পাড়ি জমানোর। এবং ঢাকাও কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। ঢাকার বাতাসে টাকা ওড়ার খবর গুজব হলে কী হয়েছে, জীবিকা গড়ার তাগিদে শত কষ্ট সহ্য করে, কিংবা খড়কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও, মানুষ আপ্রাণ চেষ্টা করে এ শহরেই ঘাঁটি গাড়ার।

বলাই বাহুল্য, এই লেখা যারা পড়ছেন, তাদের মধ্যে একটা বড় অংশই স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে বাস করেন ঢাকায়। এবং বাকিরাও বিভিন্ন সময়ে, প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে পা রেখেছেন ঢাকায়। এবং ঢাকায় পা রাখার পর একটি অভিজ্ঞতা চেতনে বা অবচেতনে নিশ্চিতভাবেই হয়েছে আপনার। তা হলো: ঢাকার বিভিন্ন স্থানের আজব আজব সব নাম শুনে অবাক হয়েছেন আপনি।

কোটি মানুষের বাস এই ঢাকা শহরে; Image Source; The Daily Star

কত বাহারি নামই না রয়েছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার। বাগই তো আছে কত। শাহবাগ, পরীবাগ, গোপিবাগ, স্বামীবাগ, মালিবাগ ইত্যাদি। আবার নামের সাথে হাতি আছে এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরঝিল কিংবা হাতিরপুলের। পুল আছে ফকিরাপুল, পাগলারপুলের নামেও। এছাড়া ধানমন্ডি, ফার্মগেট, পিলখানা, তোপখানার মতো বিচিত্র সব নামধারী এলাকারও দেখা মেলে এ শহরে।

কখনো কি জানতে ইচ্ছা হয়েছে, কীভাবে এসেছে এসব এলাকার নাম? হয়তো হয়েছে, কিংবা হয়তো হয়নি। তবে আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব নামকরণের মজাদার সেই ইতিহাসই। তাহলে আর দেরি নয়, চলুন শুরু করে দেয়া যাক।

এককালে ঢাকার সবচেয়ে বড় ধানের হাট বসত ধানমণ্ডিতে; Image Source: Wikimedia Commons

ধানমণ্ডি

ধান কী জিনিস, তা তো জানেনই সকলে: যা থেকে চাল হয়। আর ‘মণ্ডি’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ হাটবাজার। ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকায় সবচেয়ে বড় ধানের হাট বসত যে জায়গাটিতে, স্থানীয়রা সেটিকে ডাকত ধানমণ্ডি নামে। আর সেখান থেকেই আজকের ধানমণ্ডি এলাকার নামকরণের উৎপত্তি।

পিলখানা

পিলখানা নামটিও এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। ফারসি ভাষায় ‘পিল’ অর্থ হাতি আর ‘খানা’ অর্থ জায়গা। তাহলে বুঝতেই পারছেন, পিলখানা মানে হাতি রাখার জায়গা। মুঘল শাসকদের খুব পছন্দের একটি খেলা ছিল হাতির লড়াই। তাই সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে হাতি এনে রাখা হতো ধানমণ্ডির এক এলাকায়, যেটি লোকমুখে পরিচিতি পেয়ে যায় পিলখানা হিসেবে।

মাহুতটুলি

মাহুত অর্থ জানেন তো? হস্তিচালক। কিংবা যারা হাতির পোষ মানানো ও দেখাশোনার কাজ করে, তাদেরকেও বলা হয় মাহুত। মোগল শাসনামলে হাতির সাথে সাথে ঢাকায় এসেছিল বিপুল সংখ্যক মাহুতও। তারা নিজেদের বসবাসের জন্য যে এলাকাটি গড়ে তুলেছিল, সেটিই আজ পরিচিত মাহুতটুলি নামে।

ভাবা যায়, একসময় এই ঝিলে গোসল করত হাতি! Image Source: YouTube

হাতিরঝিল

হাতি না হয় আনা হলো, তাদের পোষও মানানো হলো। কিন্তু হাতি পালার যে আরো হাজারটা ঝক্কি আছে। সেসবের মধ্যে একটি হলো তাদের গোসল করানো, এবং তারপর রোদ পোহানোর ব্যবস্থা করে দেয়া। এজন্য হাতিগুলোকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হতো নিকটস্থ ঝিলে। হাতি গোসল করত বলে ঝিলের নাম হয়ে উঠেছিল হাতিরঝিল।

এলিফ্যান্ট রোড

হাতিরঝিল থেকে ভালো করে গোসল-টোসল করিয়ে হাতিদের নিয়ে যাওয়া হতো রমনা পার্কে রোদ পোহাতে। এরপর সন্ধে নামার মুখে রমনা পার্ক থেকে হাতিগুলোকে ফের নিয়ে যাওয়া হতো তাদের ডেরায়, অর্থাৎ পিলখানায়। তো হাতিদের নিয়ে রমনা থেকে পিলখানায় যাওয়ার জন্য যে রাস্তাটি ব্যবহৃত হতো, সেটিই আজ পরিচিত এলিফ্যান্ট রোড নামে।

হাতিরপুল

এলিফ্যান্ট রোডের মাঝে একটি খাল ছিল, যার উপর কাঠের পুল তৈরি করা হয়েছিল। হাতির পারাপারের জন্য নির্মিত হওয়ায় সেটিকে বলা হতো হাতিরপুল। তবে কেউ কেউ আবার বলে থাকেন, হাতিরা নাকি পুলের উপর দিয়ে নয়, বরং পুলের নিচ দিয়ে চলাচল করত। তবে সে যা-ই হোক না কেন, পুলের নাম তো হাতিরপুলই ছিল, এবং তার সুবাদেই আশপাশের পুরো এলাকাটিই আজ পরিচিত হাতিরপুল নামে।

মোগল শাসকদের প্রিয় খেলা ছিল হাতির লড়াই; Image Source: Achenbach Foundation for Graphic Arts

ভূতের গলি

এলিফ্যান্ট রোড ধরে হাতিরপুল আসার পথে একটু বামে সরলেই রয়েছে একটি বিখ্যাত এলাকা। এলাকাটি বিখ্যাত তার নামের কারণে। কারণ নামটি যে ভূতের গলি! তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। গলিটিতে ভূত নেই। এমনকি কোনো ভূতুড়ে বাড়িও নেই। আসল ব্যাপারটি হলো, ইংরেজ আমলে ওখানে বাস করতেন এক ইংরেজ সাহেব। নাম তার মিস্টার বুথ। ওই এলাকায় তিনিই ছিলেন প্রথম কোনো ইংরেজ সাহেব। তাই তার নামানুসারে জায়গাটির নাম হয়েছিল বুথের গলি। কিন্তু কালানুক্রমে বুথ যে শেষমেষ ভূত হয়ে গেল, তা বেশ অদ্ভুতুড়ে কান্ডই বটে।

গেণ্ডারিয়া

বুথের গলির ভূতের গলি হওয়াটা ছিল ইংরেজি শব্দের বিকৃত বাংলা রূপের বহিঃপ্রকাশ। এমন দৃষ্টান্ত কিন্তু আরো আছে। ঢাকা শহরের একসময়কার বিখ্যাত এলাকা ছিল গ্র্যান্ড এরিয়া। তৎকালীন জমিদার ও প্রভাবশালীদের বাস ছিল বলে ইংরেজরা দিয়েছিল এমন নাম। কিন্তু বাঙালদের মুখে কি আর এত কঠিন ইংরেজি আসে! তাই তো তারা গ্র্যান্ড এরিয়াকে নিজেদের মতো করে গেণ্ডারিয়া করে নিয়েছিল। তবে এ তত্ত্বের বিরুদ্ধমতও আছে। অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, এলাকাটিতে নাকি একসময় প্রচুর গেণ্ডারি বা আখ জন্মাত। আর সেখান থেকেই এসেছে গেণ্ডারিয়া নামটি।

রমনা কালী মন্দির; Image Source: Wikimedia Commons

রমনা

শুরুতে বলছিলাম হাতিদের রোদ পোহানোর স্থান রমনা পার্কের কথা। মজার ব্যাপার হলো, এই রমনারও কিন্তু নিজস্ব নামকরণের ইতিহাস রয়েছে। ওই এলাকায় বাস করতেন রম নাথ বাবু নামে এক বিশাল ধনাঢ্য বাবু। তিনি নিজের নামানুসারে তৈরি করেছিলেন রমনা কালী মন্দির। আর সেই মন্দিরের পাশে ছিল ফুলের বাগান ও খেলাধুলার পার্ক। সময়ের স্রোতে গোটা এলাকাটির নামই হয়ে যায় রমনা, আর পার্কটির নাম হয় রমনা পার্ক।

শেষ কথা

ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি এলাকার নামেরই নামকরণের ইতিহাস জানতে পারলেন আজ। তবে এখানেই কিন্তু শেষ নয়। বিশাল ঢাকা শহরে কি আর এলাকার অভাব আছে! এবং সেসব এলাকার নামকরণের ইতিহাসও তো কম মজাদার নয়। তাই সেসব ইতিহাস নিয়ে আমরা আবারো ফিরে আসব পরের পর্বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে রানী বুডিকার প্রতিশোধ

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (পর্ব ২)