in

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ৮টি অনুপ্রেরণাদায়ী উক্তি

বর্তমান সময়ে মোটিভেশনাল স্পিকার বা অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তা শব্দযুগল ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে আমাদের দেশে। কিন্তু আদতে এ ধরনের অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তার কদর সব সময়ই ছিল। কেননা জীবনে চলার পথে মানুষকে অসংখ্যবার হোঁচট খেতে হয়, এবং সেইসব চ্যালেঞ্জিং সময়ে নিজের উপর বিশ্বাস ফিরে পেতে তাদের অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হয়। তাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার কাজটিই করেন অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তারা।

তবে সব অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তাই যে ফেসবুকে লাইভে এসে অনুপ্রেরণা যোগান, তা কিন্তু নয়। যুগে যুগে এমন অনেক অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তার জন্ম হয়েছে, যাদের কেউ হয়তো মঞ্চে দাঁড়িয়ে লাখো মানুষকে সাক্ষী রেখে, কিংবা বইয়ের পাতায় লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে রেখে গেছেন তাদের অনুপ্রেরণাদায়ী কথামালা।

আজকের এই লেখায় আমরা আপনার সামনে তুলে ধরব সেরকমই ঐতিহাসিক কয়েকজন ব্যক্তিত্বের অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তব্য, যা নিশ্চিতভাবেই আপনাকে অনুপ্রাণিত করবে নতুনভাবে জীবনটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে, পাশাপাশি বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনাও দেবে আপনাকে।

আলবার্ট আইনস্টাইন

আলবার্ট আইনস্টাইন; Image Source: WallsDesk.com

“সংগ্রাম করুন সফল হবার জন্য নয়, মূল্যবান হয়ে ওঠার জন্য।”

আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত পদার্থবিদদের একজন। ১৯১৫ সালে সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশের মাধ্যমে তিনি চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন পদার্থবিদ্যার গতিপথ। ১৯২১ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারও লাভ করেন।

এই বাণী চিরন্তনীতে তিনি “সফলতা”-কে একটি বিমূর্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, এবং বলেছেন এটি মূলত সেই মানুষটির উপর নির্ভর করে, যে এটিকে তার লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করছে। অপরদিকে “মূল্যবান” হয়ে ওঠা বলতে তিনি বুঝিয়েছেন অন্যদের কাছে গুরুত্বের অধিকারী হওয়া, যেহেতু কোনো একটি কাজে আপনার নিজস্ব অবদান রয়েছে।

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন; Image Source: ThinkStock Photos

“জ্ঞানের উপর বিনিয়োগ থেকেই সর্বোৎকৃষ্ট মুনাফা লাভ করা যায়।”

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন একাধারে ছিলেন একজন লেখক, চিত্রশিল্পী, রাজনীতিবিদ, রাজনীতিক, বিজ্ঞানী, সঙ্গীতজ্ঞ, উদ্ভাবক, রাষ্ট্রপ্রধান, কৌতুকবিদ, গণআন্দোলনকারী এবং কূটনীতিক। পাশাপাশি তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন জনকদেরও একজন। নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদে আসীন ছিলেন। পাশাপাশি তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসেও।

এই বাণীতে তিনি জ্ঞানার্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে বলেছেন, এ কাজের মাধ্যমেই আপনি সবচেয়ে বেশি “ব্যক্তিগত পরিপূর্ণতা” লাভ করবেন, পাশাপাশি এ থেকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভেরও সুযোগ থাকে।

চার্লস ডারউইন

চার্লস ডারউইন; Image Source: History

“ইতিহাসে তারাই জয়লাভ করেছে, যারা সহযোগিতা করতে এবং কার্যকরীভাবে নিজেদের পরিবর্তন করতে শিখেছে।”

চার্লস ডারউইন ছিলেন একজন ইংরেজি জীববিজ্ঞানী, যিনি বিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রেখেছেন তার “অন দ্য অরিজিন অভ স্পেসিস” বইটির মাধ্যমে। এ বইয়ে তিনি বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন, যা পরবর্তীতে জীববিজ্ঞানের একটি বিশাল শাখা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই বাণীতে তিনি বলতে চেয়েছেন, জীবনে সবচেয়ে সফল যারা – তা সে মানুষই হোক বা অন্য কোনো জীব – তারা দ্রুত সফলতা লাভ করে একত্রে কাজ করার মাধ্যমেই।

ডি এইচ লরেন্স

ডি এইচ লরেন্স; Image Source: The Guardian

“জীবন হলো জ্ঞানের প্রান্ত অভিমুখে ভ্রমণ, এবং তারপর একটি লাফ দেয়া।”

ডি এইচ লরেন্স একজন ইংরেজ লেখক, যিনি বিশেষভাবে পরিচিত তার “সন্স অ্যান্ড লাভার্স” এবং “লেডি চ্যাটারলি’স লাভার” উপন্যাসগুলোর জন্য। এছাড়াও তিনি প্রায় ৮০০ কবিতাও রচনা করেছিলেন।

এই বাণীতে তিনি যে ধারণাটি দিতে চেয়েছেন তা হলো: জ্ঞান আপনাকে কেবল একটি বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে। অর্জিত জ্ঞান ও বিদ্যা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য আরো বেশি প্রয়োজন হলো সেই জ্ঞান ও বিদ্যার সহযোগে সঠিক সময়ে ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারার মতো মানসিকতা।

টমাস এডিসন

টমাস এডিসন; Image Source: CNN

“জীবনে ব্যর্থ হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই এমন, যারা এমন একটি সময়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে, যখন তারা জানতও না যে সাফল্যের কতটা কাছাকাছি তারা চলে এসেছে।”

টমাস এডিসন একজন স্বনামধন্য আমেরিকান উদ্ভাবক, যিনি বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করে অসাধারণ সব ডিভাইস আবিষ্কার করেছেন। তবে সম্ভবত শ্রেষ্ঠ সাফল্য হলো বৈদ্যুতিক বাতি উদ্ভাবক, যা মানবসভ্যতাকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়।

এই বাণীতে এডিসন বলতে চেয়েছেন যে অধিকাংশ মানুষই খুব কঠিন পরিস্থিতিতে হাল ছেড়ে দেয়; অথচ তারা যদি চেষ্টা চালিয়ে যেত, তবে সাফল্য ধরা দিতে বোধহয় আর খুব বেশি সময় লাগত না।

অ্যানা ফ্রাঙ্ক

অ্যানা ফ্রাঙ্ক; Image Source: Wikimedia Commons

“এই বিষয়টি কী চমৎকার যে কারোই এক মুহূর্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন পড়ে না পৃথিবীকে উন্নত করে তোলার কাজ শুরু করার আগে।”

অ্যানা ফ্রাঙ্ক ছিলেন একজন জার্মানিতে জন্মগ্রহণকারী ডাচ-ইহুদি দিনলিপিকার। হলোকাস্টের সময়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন তিনি। তবে এর আগে হলোকাস্টের দুঃসহ সময়গুলোর কথা নিজের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন তিনি। সেই ডায়েরি প্রকাশ হবার পর তিনি পরিণত হয়েছেন হলোকাস্টে মারা যাওয়া সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিদের একজনে।

নিজেকে পৃথিবীর নির্মমতম দৃষ্টান্তের সম্মুখীন হতে হলেও, এই বাণীতে তিনি পৃথিবীকে নিয়ে নিজের আশাবাদই ব্যক্ত করেছিলেন। এখানে তিনি বলেছিলেন, যে কেউই চাইলে একটি ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি তার কাজটি আপাতদৃষ্টিতে অতি নগণ্য মনে হলেও।

হেরোডোটাস

হেরোডোটাস; Image Source: iStock

“মহৎ কর্মগুলো সাধারণত সাধিত হয় বৃহৎ ঝুঁকির মাধ্যমে।”

হেরোডোটাস ছিলেন একজন প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ, যাকে অনেকেই অভিহিত করে “ইতিহাসের জনক” হিসেবে। গ্রেকো-পারস্য যুদ্ধ নিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন “দ্য হিস্টোরিস”। ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সেগুলোকে লিপিবদ্ধ করার প্রথম নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয় এটি।

এই বাণীতে হেরোডোটাস আলোকপাত করতে চেয়েছেন ইতিহাসের বৃহৎ কিছু সাফল্যের ব্যাপারে। তার মতে, সাফল্যগুলো অর্জিত হয়েছে কারণ নেতারা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সব রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন। তারা যদি তা না করতেন, তাহলে ফলাফল ভিন্ন কিছুও হতে পারত।

মার্টিন লুথার কিং

মার্টিন লুথার কিং; Image Source: Vox

“আমাদের জীবনের শেষের শুরু হয়ে যায় সেই দিনেই, যেদিন আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ব্যাপারে চুপ হয়ে যাই।”

মার্টিন লুথার কিং ছিলেন একজন আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট মন্ত্রী, এবং ১৯৬০-এর দশকে নাগরিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের একজন বড় নেতা। অহিংস উপায়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কারণে ১৯৬৪ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয় করেন।

এই বাণীতে মার্টিন লুথার কিং বলতে চেয়েছেন যে, আপনি যে চেতনা ও আদর্শে বিশ্বাসী, সেটি নিয়ে যদি আপনি কথা না বলেন, তাহলে আপনার জীবনই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

সুয়েজ সংকট: যেভাবে ব্যর্থ হয়েছিল ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন

মায়া সভ্যতার ধর্ম বিশ্বাস ও কিংবদন্তী