in

ইতিহাসের মর্মান্তিক চার জাহাজডুবি

সড়কপথ, নৌপথ, রেলপথ কিংবা আকাশপথ – দুর্ঘটনা ঘটতে পারে সবখানেই। এবং সকল দুর্ঘটনাই সমান দুঃখজনক। তারপরও নৌপথের দুর্ঘটনা, বিশেষত জাহাজডুবিকে, ভয়াবহতার মাত্রায় অন্য আর সব যানবাহন সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনার চেয়ে এগিয়ে রাখতেই হবে।

কেন? কারণটি খুবই সহজ। একটি যাত্রীবাহী জাহাজের ধারণক্ষমতা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই উড়োজাহাজ, রেলগাড়ি কিংবা সড়কপথে চলা যেকোনো যানের চেয়ে বেশি হয়। তাই একটি জাহাজ যখন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বা ডুবে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রাণহানির সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর প্রাণহানি যে দুর্ঘটনায় বেশি হয়, মর্মান্তিকও কি সেটিই বেশি হয় না?

যুগে যুগে ঘটেছে অসংখ্য জাহাজডুবির ঘটনা; Image Source: Passenger Ship Technology

যা-ই হোক, অন্য কোনো দুর্ঘটনাকে খাটো করছি না। তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে, যুগে যুগে অসংখ্য ভয়াবহ জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো ইতিহাসের কালো অধ্যায় হয়ে রয়েছে। চলুন, ফিরে দেখা যাক, ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক জাহাজডুবির ঘটনা ছিল কোনগুলো।

আরএমএস টাইটানিক

আরএমএস টাইটানিক; Image Source: Wikimedia Commons

১৯১২ সালে আরএমএস টাইটানিকের সলিল সমাধি হওয়া এখন পর্যন্ত সবচেয়ে মর্মান্তিক, সেই সাথে সবচেয়ে আলোচিত জাহাজডুবির ঘটনা। টাইটানিক যখন ডুবেছিল, তখন সেটিই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী জাহাজ। ২,২০৮ জন যাত্রীর মধ্যে মৃত্যু ঘটেছিল দেড় হাজারেরও বেশি যাত্রীর।

টাইটানিক তার প্রথম যাত্রায় সাউদাম্পটন থেকে ছেড়ে গিয়ে গন্তব্য নিউ ইয়র্কের দিকে এগোচ্ছিল। যখন সে তার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গতি ২৩ নটে ধেয়ে যাচ্ছিল, তখনই রাতের আঁধারে একটি তুষারখণ্ডের সাথে ধাক্কা লাগে, ফলে জাহাজের তলদেশ ফেটে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ডুবে যায় জাহাজটি। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে বেশির ভাগ মানুষেরই মৃত্যুর কারণ ছিল হাইপোথারমিয়া বা শরীরের আভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা হ্রাস। বরফ শীতল পানিতে জমে গিয়ে এ অবস্থা হয়েছিল দুর্ভাগা মানুষগুলোর।

টাইটানিক ছিল হোয়াইট স্টার লেন পরিচালিত তিনটি অলিম্পিক ক্লাস ওশান লাইনারের মধ্যে দ্বিতীয়টি। বেলফাস্টের হারল্যান্ড অ্যান্ড ওলফ শিপইয়ার্ডে তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছিল নৌ-প্রকৌশলী থমাস অ্যান্ড্রুসের নকশা করা জাহাজটি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশালাকার এই জাহাজটিতে ১,১৭৮ জন যাত্রীর জন্য মাত্র ২০টি লাইফবোটের ব্যবস্থা ছিল। কেননা নির্মাতাদের প্রবল বিশ্বাস ছিল, জাহাজটি কখনোই ডুববে না।

আরএমএস লুসিতানিয়া

আরএমএস লুসিতানিয়া ; Image Source: BBC

জার্মান সামরিক সাবমেরিন ইউ-২০ এর সাথে ধাক্কা লেগে ১৯১৫ সালের মে মাসে নিমজ্জিত হয়েছিল আরএমএস লুসিয়ানিয়া। এতে নিউ ইয়র্ক থেকে লিভারপুলগামী জাহাজটির ১,২০১ জন যাত্রী মারা গিয়েছিল। ১৯০৬ সালে যখন জাহাজটি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে, তখন সেটিই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড়, দ্রুতগতি সম্পন্ন এবং সবচেয়ে বিলাসবহুল জাহাজ।

লুসিতানিয়া জাহাজডুবির ঘটনায় প্রচুর আমেরিকানের মৃত্যু ঘটেছিল, এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা গ্রেট ওয়ারে যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের পেছনে এটিও একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। জার্মান সাবমেরিনটি ইচ্ছাকৃতভাবে এ জাহাজটিকে আক্রমণ করেছিল, কেননা এ জাহাজটি ব্রিটিশদের যুদ্ধের অস্ত্র বহন করছিল।

লুসিতানিয়া নির্মাণ করেছিল স্কটল্যান্ডের জন ব্রাউন অ্যান্ড কো। ১৯০৭ সালের সেপ্টেম্বরে এটি তার প্রথম যাত্রা সম্পন্ন করে। বাষ্পচালিত জাহাজটির মালিক ও পরিচালক ছিল কিউনার্ড কোম্পানি, যারা পরিচিত টাইটানিকের মালিক হোয়াইট স্টার লাইনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও।

এমএমএস এমপ্রেস অব আয়ারল্যান্ড

এমএমএস এমপ্রেস অব আয়ারল্যান্ড; Image Source: Irish Central

মর্মান্তিক পরিণতি থেকে রেহাই পায়নি আয়ারল্যান্ডের সম্রাজ্ঞীও। ১৯১৪ সালের মে মাসে সেইন্ট লরেন্স নদীতে নিমজ্জিত হয় এই জাহাজটি, যার ফলে ১,৪৭৭ জন যাত্রীর মধ্যে ১,০১২ জনেরই মৃত্যু হয়। টাইটানিকের পর এটিই ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম যাত্রীবাহী জাহাজ বিপর্যয়। এই ওশান লাইনারটি উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর রুটে কুইবেক থেকে ইংল্যান্ডের লিভারপুল পর্যন্ত যাতায়াত করত।

বাষ্পচালিত জাহাজটির সংঘর্ষ হয়ে ৬,০০০ টনের একটি নরওয়েজিয়ান কোলিয়া, স্টোরস্ট্যাডের সাথে। এর কারণ ছিল মূলত নদীতে ঘন কুয়াশা, যে কারণে সামনের কিছুই ঠিকভাবে দেখা যাচ্ছিল না। জাহাজটিতে মোট ৪২টি লাইফবোট ছিল, কিন্তু বিপদের মুহূর্তে পানিতে নামানো সম্ভব হয়েছিল মাত্র পাঁচটি। দুর্ঘটনার প্রকোপ আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল বরফশীতল আবহাওয়া, এবং জাহাজের দরজা ও পোর্টহোলগুলো বন্ধ করতে না পারার ফলে।

আরএমএস এমপ্রেস অব আয়ারল্যান্ডের মালিকানা ছিল কানাডিয়ান প্যাসিফিক স্টিমশিপ কোম্পানির দখলে। ফ্রান্সিস এলগারের নকশা অনুযায়ী জাহাজটি নির্মাণ করেছিল ফেয়ারফিল্ড শিপবিল্ডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। ১৯০৬ সালের জানুয়ারি মাসে আত্মপ্রকাশ করে জাহাজটি, এবং সে বছর জুনেই লিভারপুল থেকে মন্ট্রিয়াল পর্যন্ত নিজের প্রথম সফল যাত্রা সম্পন্ন করে।

এমএস এস্তোনিয়া

এমএস এস্তোনিয়া; Image Source: Wikipedia

এমএস এস্তোনিয়া ছিল মূলত একটি ২১ নট গতির ফেরি, যা একসাথে ২,০০০ জন যাত্রী ও ৪৬০টি গাড়ি ধারণ করতে পারত। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এটি ভাইকিং স্যালি, সিলজা স্টার এবং ওয়াসা কিং নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাল্লিন থেকে স্টকহোম যাত্রাকালে ফেরিটি ডুবে যায়, যার ফলে ৮৫২ জন যাত্রীর মৃত্যু ঘটে। অবশ্য মৃতের সংখ্যা আরো বাড়ত, যদি না উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে ১৩৭ জন ভাগ্যবান ব্যক্তিকে বাঁচানো সম্ভব হতো।

বাল্টিক সাগরে প্রচন্ড প্রতিকূল আবহাওয়ার কবলে পড়েছিল জাহাজটি। তখন বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪৫ মাইল পর্যন্ত। খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফেরিটি প্রথমে স্টারবোর্ড প্রান্তে হেলে পড়ে, এবং পরবর্তীতে পুরোপুরি ডুবে যায়

ফেরিটি নির্মাণ করেছিল মেয়ার ওয়্যারফট, ১৯৮০ সালে জার্মানির প্যাপেনবার্গে তাদের শিপইয়ার্ডে। শুরুতে ফেরিটি ভাইকিং স্যালি নামে পরিচিত ছিল, যখন এটি তার প্রথম মালিক রেডেরি অ্যাব স্যালির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত যানটি পরিচালনা করেছিল এস্টলাইন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

লে. সেলিম: মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গনের অকুতোভয় যোদ্ধা

যে হত্যাকাণ্ড উসকে দিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধ