in

আফ্রিকার প্রভাবশালী পাঁচ সাম্রাজ্য

প্রাচীন সুদান থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় জিম্বাবুয়ে, চলুন জেনে নিই আফ্রিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী পাঁচটি সাম্রাজ্য সম্পর্কে, যারা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী জায়গা দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

কুশ সাম্রাজ্য

মিশরীয়দের অনুকরণ করত কুশিরা; Image Source: National Geographic Society

অনেক সময়ই তাদের মিশরীয় প্রতিবেশীদের কাছে ঢাকা পড়ে যায় বটে, কিন্তু তারপরও প্রায় এক হাজারেরও বেশি সময় ধরে আফ্রিকার স্থানীয় শক্তি হিসেবে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল কুশ সাম্রাজ্য। প্রাচীন নুবিয়ান সাম্রাজ্য তাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে, যখন তারা নীল নদের অববাহিকায় একটি বিশাল এলাকাজুড়ে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেছিল। সেই সাম্রাজ্যটি আজ পরিচিত সুদান নামে। কুশদের সম্পর্কে যত যা তথ্য আজ জানা যায়, তার অধিকাংশই এসেছে মিশরীয়দের মারফত। এবং সেখান থেকে আমরা জানতে পারি, এটি ছিল একটি অর্থনৈতিক কেন্দ্র, যেখানে ছিল গজদন্ত, ধূপ, লোহা এবং বিশেষত সোনার খুব বড় বাজার। সাম্রাজ্যটি একাধারে ছিল মিশরের বাণিজ্য সঙ্গী এবং সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এমনকি ২৫তম রাজবংশ হিসেবে এটি এক পর্যায়ে মিশরকে শাসনও করেছে। পাশাপাশি তারা তাদের প্রতিবেশীদের বিভিন্ন রীতি-নীতি ও প্রথাও গ্রহণ করেছিল। যেমন কুশিরা বেশ কিছু মিশরীয় দেবতার উপাসনা করত, মৃতদেহকে মমিতে রূপান্তরিত করত, এমনকি নিজেদের মতো করে পিরামিডও নির্মাণ করত। প্রাচীন কুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী মেরোতে এখন রয়েছে দুই শতাধিক পিরামিডের ধ্বংসস্তূপ, যা কিনা হার মানিয়েছে মূল মিশরীয় পিরামিডের সংখ্যাকেও।

পান্টদের ভূমি

পান্টের উদ্দেশে যাত্রা করছে এক দল মিশরীয়; Image Source: Getty Images

আফ্রিকান সভ্যতাগুলো যে বাকি বিশ্বের কাছে রহস্যময়, তা আর নতুন কী! কিন্তু পান্টদের মতো রহস্যময় সভ্যতা খুব কমই রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এ সভ্যতার সম্পর্কে যা জানা যায়, তা এমনকি খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ আগেকার। মিশরীয় বিভিন্ন দলিল থেকে জানা যায় এটি নাকি ছিল ‘দেবতাদের ভূমি”, এবং আবলুস, গন্ধরস ও সোনায় সমৃদ্ধ। এছাড়াও এখানে ছিল বিভিন্ন অদ্ভূত জন্তু-জানোয়ার, যেমন বনমানুষ, চিতাবাঘ ইত্যাদি। মিশরীয়রা বিশালাকার কাফেলা ও ফ্লোটিলা পাঠাত পান্টদের কাছে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে রানী হাশাপসেটের রাজত্বকালে। তবে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বের করা যায়নি যে এ সাম্রাজ্যটি আসলে কোথায় ছিল। রহস্যময় এ সাম্রাজ্যটির অবস্থান আজ ঐতিহাসিকদের কাছে খুব বড় একটি বিতর্কের বিষয়বস্তু। আরব উপদ্বীপ এবং লেভান্ত – দুটিই প্রস্তাবিত হয়েছে সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে; যদিও অনেকে মনে করে এটির অবস্থান ছিল আসলে পূর্ব আফ্রিকায়, লোহিত সাগরের অববাহিকায় কোনো একটি জায়গায়।

কারথেজ

প্রাচীন কারথেজের ধ্বংসাবশেষ; Image Source: PlanetWare

কারথেজরা সবচেয়ে বেশি পরিচিত পুনিক যুদ্ধে রোমানদের প্রতিপক্ষ হিসেবে। এটি মূলত উত্তর আফ্রিকার একটি বাণিজ্য কেন্দ্র, যা প্রায় ৫০০ বছর ধরে ক্রমোন্নতি করে আসছিল। ফিনিশীয়দের আমলে, বর্তমান তিউনিসিয়ায়, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম বা নবম শতকে এ নগর-রাষ্ট্রটির প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। কারথেজদের আধিপত্য ছিল বস্ত্র, সোনা, রূপা এবং কপারের বাণিজ্যে। নিজেদের সেরা সময়ে এ নগরীটিতে বাস ছিল প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের। পাশাপাশি তাদের ছিল সুরক্ষিত একটি বন্দর, যেখানে ২২০টি জাহাজ একসাথে নোঙ্গর ফেলতে পারত। সমুদ্রচারী বণিক হওয়ার দরুণ, কারথেজদের কাছে এই বন্দর ও জাহাজগুলোর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কারথেজরা এক পর্যায়ে নিজ অঞ্চলের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা থেকে স্পেন এবং ভূমধ্যসাগরের কিছু অঞ্চলেও। কিন্তু প্রভাব বিস্তারের নেশাই তাদেরকে দাঁড় করায় শক্তিশালী রোমানদের মুখোমুখি। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৪ অব্দ থেকে শুরু হয় এই দুই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই, যার ফলাফল তিনটি রক্তক্ষয়ী পুনিক যুদ্ধ। সর্বশেষ যুদ্ধটি শেষ হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬ অব্দে, এবং কারথেজরা একদম গুঁড়িয়ে গিয়েছিল এ যুদ্ধের দরুণ। এক সময়ের প্রবল প্রতিক্রমশালী কারথেজদের ধ্বংসস্তূপ আজ পড়ে রয়েছে তিউনিস নগরীতে।

সোংহাই সাম্রাজ্য

সোংহাই সাম্রাজ্য; Image Source: Epic World History

যদি জিজ্ঞেস করা হয় এ সাম্রাজ্যের প্রধান বিশেষত্ব কী, তবে উত্তরটি হবে এর বিশালাকার দৈর্ঘ্য। আফ্রিকার ইতিহাসে এমন সাম্রাজ্য আর খুব কমই পাওয়া যাবে, যেটি আকারে সোংহাই সাম্রাজ্যের চেয়ে বড়। সাবেক মালি সাম্রাজ্য থেকে পঞ্চদশ শতকে গঠিত এই পশ্চিম আফ্রিকান সাম্রাজ্যটি ছিল পশ্চিম ইউরোপসহ বর্তমান সময়ের এক ডজন আধুনিক রাষ্ট্রের মিলিত আকৃতির চেয়েও বড়। তেজস্বী বাণিজ্য নীতি এবং বাস্তবসম্মত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুবাদে সাম্রাজ্যটি একটা সময় দারুণ উন্নতি করেছিল। ষোড়শ শতকে ধার্মিক রাজা প্রথম মুহাম্মদ আসকিয়ার শাসনামলে সাম্রাজ্যটি তাদের শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছায়। আসকিয়া নতুন নতুন ভূমি জয় করেন, মিশরের মুসলিম খলিফার সাথে হাত মিলিয়ে মিত্রশক্তি গড়ে তোলেন, এবং তিমবুকতুতে শত শত ইসলামী বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। যদিও এক সময় সোংহাই সাম্রাজ্য পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি ছিল, কিন্তু ষোড়শ শতকের শেষ দিকেই গৃহযুদ্ধ ও অন্তঃকোন্দলের জের ধরে শক্তিক্ষয় হয় তাদের। আর তখন মরক্কোর সুলতান সহজেই দখল করে নেয় সাম্রাজ্যটিকে।

গ্রেট জিম্বাবুয়ে

গ্রেট জিম্বাবুয়ের নগরদুর্গের ধ্বংসাবশেষ; Image Source: Khan Academy

সাব-সাহারান আফ্রিকার সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর নিদর্শনগুলোর একটি হলো গ্রেট জিম্বাবুয়ে। এখানে রয়েছে অসংখ্য পাথরের স্তূপ, পাথরের টাওয়ার এবং প্রতিরক্ষা দেয়াল, যা তৈরি হয়েছিল গ্রানাইটের ব্লক দিয়ে। সব মিলিয়ে পাথুরে দুর্গটি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের কাছে বিবেচিত হয়ে এসেছে উপকথা ও কিংবদন্তীর উৎস হিসেবে। এক সময় মনে করা হতো এটি বুঝি বাইবেলীয় রানী শেবার বাসস্থান ছিল। কিন্তু বর্তমানে ইতিহাসবিদরা জানেন, এটি আসলে দেশীয় এক সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ, যেটি এ অঞ্চলে দারুণ সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠেছিল ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতকের মধ্যে। সাম্রাজ্যটি শাসন করত আফ্রিকার একটি বিশাল অঞ্চল, যা বর্তমানে পরিচিত বতসোয়ানা, জিম্বাবুয়ে ও মোজাম্বিক হিসেবে। বিশেষত এটি সমৃদ্ধ ছিল গবাদি পশু ও মূল্যবান সব ধাতুর কারণে। পাশাপাশি এর উপর দিয়েই গিয়েছিল ভারতীয় মহাসাগর বরাবর একটি বাণিজ্য পথ। যদিও বর্তমানে এ সাম্রাজ্যের ব্যাপারে জানা যায় খুবই কম, তারপরও বিভিন্ন শৈল্পিক ধ্বংসাবশেষ যেমন চীনা বাসনকোসন, আরব গ্লাস এবং ইউরোপীয় টেক্সটাইল থেকে আন্দাজ করা যায় যে এক সময় এটি ছিল বেশ উঁচু দরের একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। গ্রেট জিম্বাবুয়ের নগরদুর্গে এক সময় বাস ছিল ২০,০০০ মানুষের। কিন্তু সাম্রাজ্যটির পতন ঘটার পর, পঞ্চদশ শতকের কোনো এক সময় রহস্যজনকভাবে এই নগরদুর্গটিও পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

যে জামা পরলে শরীর ঘামাবে না

দ্য ওয়ার অব দ্য ওয়ার্ল্ডস: জনমনে ভীতি সঞ্চারের নেপথ্যে