in

ক্রুসেড (পর্ব ২): প্রথম দুই ধর্মযুদ্ধ এবং জেরুজালেমের পতন

বিশ্ব ইতিহাসে ক্রুসেড তথা ধর্মযুদ্ধ এক বিশেষ তাৎপর্যময় জায়গা দখল করে আছে। আপনাদের সামনে ক্রুসেডের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যেই আমাদের এই ঐকান্তিক প্রয়াস। গত পর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এক ন্যাক্কারজনক ধারাবাহিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও কারণ। এ পর্বে জানাব প্রথম দুইটি ক্রুসেড ও পবিত্র ভূমি জেরুজালেমের পতন আখ্যান।

প্রথম ক্রুসেড (১০৯৬-৯৯)

পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের সৈন্যদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় ক্রুসেডারদের পৃথক চারটি বাহিনী, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন রেমন্ড অব সেইন্ট গিলস, গডফ্রে অব বুলিয়ন, হিউ অব ভারমান্ডয়েজ এবং বহেমন্ড অব টারান্টো। এই চারটি বাহিনী বাইজেন্টিয়ামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে ১০৯৬ সালের আগস্ট মাসে।

এছাড়া নাইট ও সাধারণ মানুষদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা, একটি অপেক্ষাকৃত কম সংগঠিত দল, যেটি পরিচিত “পিপল’স ক্রুসেড” নামে, অন্যদের আগেই যাত্রা শুরু করে দিয়েছিল। এ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন পিটার দ্য হারমিট নামের এক জনপ্রিয় ধর্যযাজক।

মুসলিমদের কাছে নির্মম পরাজয় বরণ করে পিটার ও তার শিষ্যরা; Image Source: Wikimedia Commons

অ্যালেক্সিয়াস এ দলটিকে বলেছিলেন অন্যান্য ক্রুসেডারদের জন্য অপেক্ষা করতে। কিন্তু সম্রাটের উপদেশের তোয়াক্কা না করে, আগস্টের শুরুতেই বসফোরাস প্রণালী অতিক্রম করে বসে পিটারের দল। তারাই ছিল প্রথম ক্রুসেডার, যাদের সাথে মুসলিমদের সংঘর্ষ হয়েছিল। কিন্তু তারা একদমই সুবিধা করতে পারেনি তুর্কি যোদ্ধাদের বিপক্ষে। সিবোটাসে তুর্কিরা তাদেরকে রীতিমতো গুঁড়িয়ে দেয়।

এদিকে ১০৯৬ সালেই কাউন্ট এমিকোর নেতৃত্বে ক্রুসেডারদের আরেকটি দল রাইনল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে ইহুদিদের উপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে ইহুদিদের মনে তীব্র ক্ষোভ সঞ্চার হয়, এবং ইহুদি-খ্রিস্টান সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।

ক্রুসেডারদের প্রধান চারটি সৈন্যবাহিনী যখন কনস্টান্টিপোলে এসে পৌঁছায়, অ্যালেক্সিয়াস নির্দেশ দেন যেন প্রতিটি বাহিনীর নেতা নিজেদের বিশ্বস্ততার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেন, এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে তুর্কিদের কাছ থেকে ফিরে পাওয়া কিংবা নতুন জয় লাভ করা সকল ভূমিতেই তারা বাইজেন্টাইন সম্রাটের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেবেন। বহেমন্ড বাদে বাকি সকলেই অ্যালেক্সিয়াসের সামনে শপথ গ্রহণ করেন।

বহেমন্ড বাদে সকলে শপথ করে অ্যালেক্সিয়াসের কাছে; Image Source: Wikimedia Commons

১০৯৭ সালের মে মাসে ক্রুসেডার এবং তাদের বাইজেন্টাইন মিত্রশক্তিরা নিসিয়া (বর্তমান ইজনিক, তুরস্ক) আক্রমণ করে। নিসিয়া ছিল তখনকার দিনে আনাতোলিয়ায় অবস্থিত সেলজুক রাজধানী। জুন মাসের শেষ দিকে শহরটি আত্মসমর্পন করে।

জেরুজালেমের পতন

ক্রুসেডারদের সাথে বাইজেন্টাইন নেতাদের সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হতে শুরু করে। কিন্তু তারপরও, দুই পক্ষের মিলিত শক্তি আনাতোলিয়ার ভিতর দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে, এবং ১০৯৮ সালের জুন মাসে দখল করে নেয় সিরিয়ার বিখ্যাত শহর এন্টিওক।

এন্টিওক দখলের পর সেটির দখলদারিত্ব নিয়েও ক্রুসেডারদের মধ্যে ব্যাপক অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তবে কিছুকাল পর সেসব কলহ-বিবাদকে পাশ কাটিয়ে তারা আবার ঠিকই অগ্রসর হয় জেরেজালেমের উদ্দেশে। জেরুজালেম তখন ছিল মিশরীয় ফাতিমিদদের দখলে। শিয়া মুসলিম হওয়ার সুবাদে, ফাতিমিদরা ছিল সুন্নি সেলজুকদের শত্রু।

জেরুজালেমের পতন; Image Source: Wikimedia Commons

১০৯৯ সালের জুনে জেরুজালের অদূরে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করে খ্রিস্টানরা। আর জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ই তারা নিরুদ্ধ নগরীর আতাবেগকে (গভর্নর) বাধ্য করে ফেলে আত্মসমর্পণ করতে। বহেমন্ডের ভাতিজা ট্যাংক্রেড কথা দিয়েছিলেন নগরীর অধিবাসীদের জীবনরক্ষার, কিন্তু তা সত্ত্বেও ক্রুসেডাররা জেরুজালেমে প্রবেশ করে সেখানকার নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে সকলকে নির্বিচারে হত্যা করে।

এভাবেই রক্তস্নাত জেরুজালেমের পতন ঘটে ক্রুসেডারদের হাতে। ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞের একটি হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে এটি।

দ্বিতীয় ক্রুসেড

আশাতীত কম সময়ের মধ্যে নিজেদের লক্ষ্য পূরণ করে, প্রথম ক্রুসেডের পরপরই অধিকাংশ ক্রুসেডার ফিরে যায় নিজেদের বাড়ি। এদিকে নতুন অর্জিত সাম্রাজ্য শাসনের জন্য থেকে যায় কিছু সংখ্যক ক্রুসেডার, যারা চারটি পশ্চিমা উপনিবেশ বা ক্রুসেডার রাজ্য গড়ে তোলে জেরুজালেম, এডেসা, এন্টিওক এবং ত্রিপলিতে।

বিশাল বিশাল সব প্রাসাদ অধ্যুষিত রাজ্যগুলোতে ক্রুসেডাররা ১১৩০ সাল পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই নিজেদের আধিপত্য বজার রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু এরপরই দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটে মুসলিমদের। এবার তারাও তৎপর হয়ে পবিত্র ভূমি ফিরে পেতে, আর সেজন্য খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে তারা শুরু করে তাদের নিজস্ব পবিত্র যুদ্ধ (কিংবা জিহাদ)। এই খ্রিস্টানরা পরিচিত ছিল “ফ্র্যাংক” নামে।

খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে মুসলিমরাও শুরু করে জিহাদ; Image Source: The Conversation

১১৪৪ সালে সেলজুকের সেনাপতি ও মসুলের আতাবেগ জেনগি দখল করে নেন এডেসা। ফলে ক্রুসেডারদের হাতছাড়া হয়ে যায় তাদের সর্ব উত্তরের রাষ্ট্রটি।

এডেসা পতনের সংবাদ পুরোপুরি হতভম্ব করে দেয় সমগ্র ইউরোপকে। তখন পশ্চিমের অধিবাসী খ্রিস্টান কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় নতুন আরেকটি ক্রুসেডের ডাক দেয়ার। অসাধারণ দুই শাসক, ফ্রান্সের রাজা সপ্তম লুই এবং জার্মানির রাজা তৃতীয় কনরাডের নেতৃত্বে দ্বিতীয় ক্রুসেডের সূচনা হয় ১১৪৭ সালে।

সে বছরের অক্টোবরে তুর্কি বাহিনী ডোরিলিয়ামে বিলুপ্তি ঘটায় কনরাডের একটি বাহিনীর। অথচ এখানেই প্রথম ক্রুসেডে দারুণ একটি জয় পেয়েছিল খ্রিস্টানরা।

এরপরও, লুই ও কনরাড তাদের অনেক সৈন্যকে জেরুজালেমে জড়ো করার পর, তারা সিদ্ধান্ত নেন সিরীয়দের শক্তিশালী ঘাঁটি দামাস্কাস দখল করার। এ অভিযানে তারা সাথে নেয় প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য সংবলিত একটি বাহিনী (তখন পর্যন্ত ক্রুসেডারদের সর্বোবৃহৎ বাহিনী)।

উপায়ন্তর না দেখে দামাস্কাসের শাসক বাধ্য হন মসুলে জেনগির উত্তরসূরী নূর আল-দিনের সাহায্য প্রার্থনা করতে। তার প্রার্থনায় সাড়া দেন আল-দিন, এবং মুসলিমদের যৌথ শক্তির হাতে ক্রুসেডারদের এক শোচনীয় পরাজয় ঘটে। এভাবেই সমাপ্তি ঘটে দ্বিতীয় ক্রুসেডের। আর ১১৫৪ সালে দামাস্কাসকে নিজের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন আল-দিন।

মুসলিমদের কাছে খ্রিস্টানদের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয় দ্বিতীয় ক্রুসেড; Image Source: History

কেউ যেন ভাববেন না, এই দুইটি ক্রুসেডের মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটেছিল ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ভয়াবহ রক্তের লড়াইয়ের। এরপরও প্রায় দেড়শো বছর ধরে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল তারা, আর এ সময়কালের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল আরো ছয়টি ক্রুসেড। কী ফলাফল ছিল সেগুলোর? আর কীভাবেই বা আজকের দিনেও সেগুলোর নির্যাস পেয়ে চলেছি আমরা? এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সাজানো হবে পরের পর্বগুলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

ক্রুসেড (শেষ পর্ব): ধর্মযুদ্ধের সমাপ্তি ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব

যে কারণে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ