in

বিশ্বখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রদের ঐতিহাসিক ভিত্তি (প্রথম পর্ব)

গল্প-উপন্যাসের পাতায় কিংবা নাটক-সিনেমার রূপালী পর্দায় আমরা প্রতিদিন শত শত কাল্পনিক চরিত্রের দেখা পাই। অবশ্যই নির্মাতারা তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই সৃষ্টি করেন ওইসব চরিত্র, তাই তাদের সাথে আমাদের পারিপার্শ্বিক জীবনের অনেকের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া খুবই সম্ভব।

কিন্তু তারপরও সময়ের সাথে সাথে কিছু কাল্পনিক চরিত্র এতটাই কিংবদন্তীতুল্য হয়ে ওঠে যে, তারা আসলেই যে কাল্পনিক চরিত্র, সে কথাটি আমাদের আর স্মরণে থাকে না। যেমন ধরুন, আপনি যদি একবার লন্ডনের ২২১ বি বেকার স্ট্রিটে অবস্থিত জাদুঘরটি ঘুরে দেখেন, আপনার হয়তো বিশ্বাসই হতে চাইবে না যে শার্লক হোমস নামে বাস্তবে কেউ ছিল না, কিংবা এ নামে কেউ লন্ডনের সড়ক ধরে রহস্য সমাধানের উন্মত্ত নেশায় অবিরাম ছুটে চলত না।

দ্য শার্লক হোমস মিউজিয়াম; Image Source: Wikimedia Commons

তবে মজার ব্যাপার হলো, শার্লক হোমস কিংবা আরো অনেক বিশ্ববিখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রের উপস্থিতি কেবল সাদা পৃষ্ঠার উপর কালো হরফে, কিংবা পর্দার চলমান ছবিতে হলেও, তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক অনেক ব্যক্তির ছায়া রয়েছে। বলা ভালো, সেইসব ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছায়া অবলম্বনেই নির্মাণ করা হয়েছে এসব কাল্পনিক চরিত্র।

বিশেষ এই ধারাবাহিকের মাধ্যমে আপনাদের সামনে তুলে ধরব এমনই কিছু জগদ্বিখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রের প্রকৃত ঐতিহাসিক শিকড়। আজ প্রথম পর্বে থাকছে সর্বকালের জনপ্রিয়তম গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস এবং দুর্ধর্ষ লিথুনিয়ান-আমেরিকান সিরিয়াল কিলার হ্যানিবাল লেকটারের কাহিনী।

শার্লক হোমস

শার্লক চরিত্রে দারুণ জনপ্রিয় বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ; Image Source: BBC

স্যর আর্থার কোন্যান ডয়েল এতটাই বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন তার কাল্পনিক চরিত্র শার্লক হোমসের উপর যে, একটি কাহিনীতে তো তাকে মেরে ফেলতেও উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া ছিল আরো চরম। তাই শেষমেষ শার্লককে আবারো ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।

কোন্যান ডয়েল এই চরিত্রটির ভিত্তি খুঁজে পেয়েছিলেন এডিনবরার রয়্যাল ইনফার্মারির এক সার্জন, জোসেফ বেলের থেকে। তরুণ বয়সে ডয়েল বেলের ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতেন। এবং পরবর্তীতে, বেলের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার সাথে দারুণ সখ্যতা বজায় রেখেছেন ডয়েল।

আপনারা শার্লক হোমসের কাহিনীতে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, তার মধ্যে কেবল পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে। এ ক্ষমতার বাস্তব অধিকারী মূলত ছিলেন বেলই।

নিজের সময়ে খুবই নামকরা একজন চিকিৎসক ছিলেন বেল। এমনকি রানী ভিক্টোরিয়া যখনই স্কটল্যান্ড ভ্রমণে আসতেন, তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবেও নিযুক্ত হতেন তিনি। শিক্ষার্থীদের প্রতি লেকচার কিংবা ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণে বেল পর্যবেক্ষণের প্রতি বরাবরই অনেক জোর দিতেন। তিনি বলতেন, ডায়াগনোসিস পরে, আগে প্রয়োজন নিজস্ব পর্যবেক্ষণ। শার্লকের গোয়েন্দাগিরিতেও আমরা দেখেছি কীভাবে সে ক্রাইম সিন বা রিপোর্ট খতিয়ে দেখার আগে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

ড. জোসেফ বেল; Image Source: Wikimedia Commons

ফরেনসিকসের একজন পথপ্রদর্শক ছিলেন বেল, এবং এডিনবরায় যখনই কোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হতো, স্থানীয় পুলিশ ছুটে আসত তার সাথে পরামর্শ করতেন। বেল প্রায়ই কাজ করতেন ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরার ফরেনসিকসের অধ্যাপক হেনরি লিটল জনের সাথে। ডয়েল শার্লকের চরিত্রে লিটল জনের কিছু বৈশিষ্ট্যের বীজও বুনে দিয়েছিলেন। এদিকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অনুরোধে বেল জ্যাক দ্য রিপারের করা খুনগুলোর উপরও একটি ব্রিফিং পেপার তৈরি করেছিলেন।

যদিও ডয়েল বরাবরই বলে এসেছেন যে শার্লক হোমস চরিত্রটির অনুপ্রেরণা বেল, কিন্তু ড. বেল নিজে ব্যাপারটিকে বারবার অস্বীকার করেছেন। অন্য যেকোনো ভক্তের মতো তিনি নিজেও শার্লক হোমসের কাহিনীতে বুদ হয়ে থাকছেন, এবং সেই পাঠের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি একবার ডয়েলকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, “আসলে তুমি নিজেই শার্লক হোমস, এবং সেটি তুমি নিজেও খুব ভালো করেই জানো।”

মজার ব্যাপার হলো, ডয়েল শার্লক হোমসকে নিয়ে মোট ৬০টি কাহিনী লিখেছিলেন। কিন্তু সেসব কাহিনীতে মহান এ গোয়েন্দা একবারের জন্যও বলেননি, “এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন।”

হ্যানিবাল লেকটার

রেড ড্রাগন ছবির একটি দৃশ্য; Image Source: Universal Pictures

১৯৮১ সালে টমাস হ্যারিস রচিত রেড ড্রাগন উপন্যাসে প্রথম আগমন ঘটে হ্যানিবাল লেকটারের। এবং তারপর থেকেই অনেক জল্পনা কল্পনা হয়েছে দুর্ধর্ষ এ চরিত্রের মূল ভিত্তি নিয়ে। বিভিন্ন লেখকই চেষ্টা করেছেন এ চরিত্রটির সাথে বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সিরিয়াল কিলার যেমন অ্যালবার্ট ফিশ কিংবা আন্দ্রেই চিকাতিলোর যোগসূত্র স্থাপন করতে।

অবশেষে চরিত্রটির স্রষ্টা হ্যারিস দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর, ২০১৩ সালের গ্রীষ্মে এসে চরিত্রটির বাস্তব জীবনের উৎসের কথা প্রকাশ করেন। অবশ্য তিনি মানুষটির প্রকৃত নাম খোলাসা করার বদলে তাকে ড. সালাজার নামে অভিহিত করেন।

টমাস হ্যারিস; Image Source: The Independent

হ্যারিস জানান যে একজন সংবাদ প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করার সময় তিনি মেক্সিকোর মন্টেরেতে অবস্থিত নুয়েভো লিওন স্টেট প্রিজন পরিদর্শনে যান, সেখানকার এক বন্দির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে। সেই বন্দিটির নাম ছিল ডাইকস সিমনস, যে এক বছর আগে কারাগার থেকে পালাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ ও গুলিবিদ্ধ হয়েছিল।

গুলিবিদ্ধ সিমনসের জীবন তখন বাঁচিয়েছিল আরেক কারাবন্দি, যার নাম হ্যারিস বলেন ড. সালাজার। ওয়ার্ডেনের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ার পর হ্যারিসঃ হতবিহবল হয়ে পড়েন সিমনসের শারীরিক বিকৃতি সম্পর্কে ওই বন্দির প্রশ্ন শুনে। তাকে আরো বিস্তারিতভাবে প্রশ্ন করা হয় সিমনসের ভিক্টিমদের ব্যাপারে, এবং তারা কীভাবে যন্ত্রণা ভোগ করেছিল।

পরবর্তীতে হ্যারিস ওয়ার্ডেনের কাছ থেকে জানতে পারেন যে ড. সালাজার নিজেও বন্দি হয়েছে হত্যার অভিযোগে, তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে, এবং সে একজন ‘ক্রিমিন্যালি ইনসেইন” ব্যক্তি। ওয়ার্ডেন হ্যারিসকে আরো জানান যে ড. সালাজারকে কখনোই কাস্টোডি থেকে মুক্ত করা হবে না।

হ্যারিসের বলা কাহিনীর উপর ভিত্তি করে প্রতিবেদকেরা পরবর্তীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন ড. সালাজারের প্রকৃত পরিচয় খুঁজে বের করার লক্ষ্যে। মেক্সিকান প্রিজন রেকর্ড ঘেঁটে তারা জানতে পারেন, ড. সালাজার আসলে আলফ্রেদো ট্রিভিনো, এক ধনাঢ্য মন্টেরে পরিবারের একজন চিকিৎসক।

ট্রিভিনোই প্রকৃত হ্যানিবাল লেকটার; Image Source: Daily Mail

চিকিৎসক হিসেবে মন্টেরেতে কর্মরত থাকাকালীন ট্রিভিনো তার প্রেমিকাকে খুন করে, এবং তার শরীর কেটে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এ অপরাধের জন্য তাকে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। ট্রিভিনোকে ওই একই এলাকায় সংঘটিত আরো বেশ কিছু হত্যাকাণ্ডের জন্যও অভিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণের অভিযোগের সেসব হত্যাকাণ্ডের দায়ে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

মজার ব্যাপার হলো, ট্রিভিনোর সাজা পরে আরো অনেক কমিয়ে দেয়া হয়, এবং ২০ বছর কারাবন্দি থাকার পর ১৯৮১ সালে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। ঘটনাক্রমে, ওই বছরই বইয়ের পাতায় আগমন ঘটে হ্যানিবাল লেকটারের। এদিকে ট্রিভিনো মেক্সিকোতে আবারো তার চিকিৎসা পেশায় ফিরে আসে, এবং সেখানেই ২০০৯ সালে তার মৃত্যু হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

যেভাবে শত্রুমুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর

কেমন ছিল প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক পরিবেশ?