in

বিশ্বখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রদের ঐতিহাসিক ভিত্তি (দ্বিতীয় পর্ব)

গল্প-উপন্যাসে বা নাটক-সিনেমায় যেসব কাল্পনিক চরিত্রের দেখা আমরা পাই, তারা অবশ্যই কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়। তবে তাই বলে তারা একেবারে যে বাস্তবতা বিবর্জিত, তেমনটিও কিন্তু নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবের নানা মানুষের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই নির্মাণ করা হয় ওইসব কাল্পনিক চরিত্র।

বিশেষ এ ধারাবাহিকে আমরা তুলে ধরছি সেইসব জগদ্বিখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রদেরই কথা, যাদের প্রকৃত ভিত্তি আসলে বাস্তবের ঐতিহাসিক কোনো ব্যক্তি। প্রথম পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম শার্লক হোমস ও হ্যানিবাল লেকটারের প্রসঙ্গে। এ পর্বে থাকছে অনন্য কার্টুন চরিত্র পাপাই দ্য সেইলর এবং দারুণ রোমাঞ্চকর সিক্রেট এজেন্ট জেমস বন্ডের কথা।

পাপাই দ্য সেইলর

পাপি দ্য সেইলর একটি কার্টুন চরিত্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯২৯ সালে, থিম্বল থিয়েটার নামক কিং ফিচারস সিন্ডিকেট ডেইলি স্ট্রিপে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর হওয়ার আগে তো বটেই, এমনকি যুদ্ধ চলাকালীনও চরিত্রটি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের জনপ্রিয়। যুদ্ধ শেষ হলেও কমেনি এর জনপ্রিয়তা, বরং পুরো ১৯৫০ ও ‘৬০-এর দশক জুড়ে কার্টুনপ্রেমীরা বুঁদ হয়ে ছিল এ চরিত্রের প্রতি ভালো লাগায়।

অসম্ভব শক্তির অধিকারী পাপাই; Image Source: Amazon

পাপাইয়ের জনপ্রিয়তা কেবল কমিক স্ট্রিপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একে একে এর দেখা মিলেছে প্রায় সব ধরনের মার্চেন্ডাইজ, ভিডিও গেমস, ভিডিও কার্টুন, কমিক বই, চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন ইত্যাদিতে। এবং অবশ্যই এর নাম যুক্ত হয়ে আছে অলিভ ওয়েলের সাথেও।

এলজি ক্রিসলার সিজার নির্মিত এ কার্টুন চরিত্রটি, ওই স্ট্রিপের আর সকল চরিত্রের মতোই, গড়ে উঠেছিল একজন বাস্তব মানুষের উপর ভিত্তি করে।

সিজার ছিলেন চেস্টার, ইলিনয়ের বাসিন্দা, এবং তিনি এ চরিত্রটিকে নির্মাণ করেছিলেন তার স্মৃতিতে থাকা ওই অঞ্চলের এক স্থানীয় ব্যক্তিকে ভিত্তি করে। সেই মানুষটির নাম ছিল ফ্র্যাঙ্ক ফিয়েগেল, যদিও এলাকার সবার কাছে রকি নামেই তিনি ছিলেন সমধিক পরিচিত। ছেলেবেলা থেকেই রকির সুনাম গড়ে ওঠে তার শারীরিক কাঠিন্যের সুবাদে। মায়ের সাথে থাকতেন তিনি, এবং কখনোই কোনো লড়াই থেকে পিছপা হতেন না। এমনকি একবার স্থানীয় পাঁচটি ছেলের সাথেও অসম লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। তিনজনকে ধরাশায়ী করার পর বাকি দুইজনকে তাড়া করেছিলেন তারা পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত।

পাপাইয়ের স্রষ্টা এলজি ক্রিসলার সিজার; Image Source: BBC

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রকি পরবর্তীতে জর্জ গজনি নামক এক ব্যক্তির সেলুনে কাজ করতেন। নিজের শিফটের কাজ শেষে, এক বা দুই গ্লাস বিয়ার খেয়ে বাইরে রাখা চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়তেন তিনি। সব সময় একটি পাইপ থাকত তার মুখে। ফলে একটু যেন অদ্ভূতই দেখাত তাকে। আর সেজন্যই স্থানীয় শিশুদের প্রিয় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তারা নানাভাবে বিরক্ত করত তাকে।

সে যা-ই হোক, রকি তার প্রথম জীবনের শক্তিমত্তা ও অকুতোভয় মানসিকতা পরবর্তী জীবনেও ধরে রাখতে পেরেছিলেন কি না, সে ব্যাপারে কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। ধরে রাখারই কথা, তবে এটিও ভুলে গেলে চলবে না যে আসলেই তিনি যদি ধরে রাখতেন, তাহলে আলাদাভাবেও তার নামডাক শোনা যেত হয়তো। এছাড়া পালংশাকের সাথেও তার তেমন যোগসূত্র ছিল না, যেমনটি ছিল না মূল কমিক স্ট্রিপের পাপাইয়েরও। পাপাইকে পালং শাকের প্রতি দুর্বল হতে দেখা গিয়েছে কেবল অ্যানিমেটেড কার্টুনগুলো আসার পর থেকে।

পালং শাকের দারুণ ভক্ত পাপাই; Image Source: Kidozi

রকি ফিয়েগেল স্পষ্টতই তার সারাটা জীবন কাটিয়েছেন চেস্টারে। পেশায় নিজেও নাবিক না হলেও, তার অতিমানবিক শারীরিক শক্তি ও পাইপ টানার প্রবণতাই দৃশ্যমান হয়েছে পাপাই দ্য সেইলরের চরিত্রে। ১৯৪৭ সালে ৭৯ বছর বয়সে মারা যান তিনি। তার কবরের ফলকে রয়েছে প্রকৃত পাপাইয়ের একটি ছবি, যা দেখে অনেকেই বলেন যে সেটি হুবহু তারই ছবি।

জেমস বন্ড

শুরুতেই একটি কথা বলে রাখা দরকার: লেখক ইয়ান ফ্লেমিং যেভাবে তার উপন্যাসগুলোতে জেমস বন্ড চরিত্রটিকে এঁকেছিলেন, তার সাথে বর্তমান বন্ড সিরিজের চলচ্চিত্রগুলোর খুব কম মিলই রয়েছে। তাছাড়া ১৯৫০ এর দশকে চরিত্রটিকে নিয়ে সাধারণ মানুষের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা-ও এখন আর বিদ্যমান নেই।

ফ্লেমিং মূলত কেবল একজন মানুষের কথা মাথায় রেখে বন্ড চরিত্রটিকে সৃষ্টি করেননি। কাল্পনিক এ এজেন্ট ছিল “যুদ্ধ চলাকালীন তার দেখা সকল সিক্রেট এজেন্ট ও কমান্ডো টাইপদের একটি সংমিশ্রণ”। এমনকি ফ্লেমিংয়ের নিজের ভাই পিটারও ছিলেন তেমনই একজন কমান্ডো, যার ছায়া পড়েছে বন্ড চরিত্রটিতে। এছাড়াও ফ্লেমিংয়ের মতে প্রভাবশালী আরো অনেককেই অনুসরণ করেছিলেন তিনি।

জেমস বন্ড চরিত্রে বড় পর্দায় দেখা গেছে যাদের; Image Source: Esquire

ফ্লেমিং ছিলেন একজন শখের অরনিথোলজিস্ট (পক্ষীবিজ্ঞানী)। তার কাছে ছিল অসংখ্যা বার্ড ওয়াচার’স গাইড। তেমনই একটি বইয়ের লেখক ছিলেন বিখ্যাত আমেরিকান পাখি বিশারদ জেমস বন্ড। ফ্লেমিং-ও তার চরিত্রটির জন্য এ নামই বেছে নেন। পরবর্তীতে এর কারণও ব্যাখ্যা করেন তিনি।

“আমি চেয়েছিলাম চরিত্রটি হবে খুবই নীরস, এবং সেজন্যই জেমস বন্ড নামটি আমার কাছে উপযুক্ত মনে হয়েছিল। এটি ছিল আমার শোনা সবচেয়ে নীরস নাম।”

বন্ডের বেশির ভাগ আচরণ ও স্বভাব ছিল ফ্লেমিংয়ের নিজের ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। যেমন উপন্যাসের পাতায় বন্ড যেসব ব্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করত, সেগুলো ছিল আসলে ফ্লেমিংয়ের ব্যক্তিগত পছন্দ। আবার গলফ খেলার প্রতি ভালোবাসাও বন্ড পেয়েছে সরাসরি তার স্রষ্টার থেকেই। জুয়া খেলার প্রতি বন্ডের মতো ফ্লেমিং-ও ছিলেন পক্ষপাতদুষ্ট। ফ্লেমিং ও বন্ড দুজনেই তাদের ভদকা মার্টিনির সাথে কেভিয়ার পছন্দ করতেন।

ফ্লেমিংয়ের নিজের সাথেই সবচেয়ে বেশি মিল ছিল বন্ডের; Image Source: flemingsbond.com

জেমস বন্ড দেখতে কেমন, এ ক্ষেত্রে ফ্লেমিংয়ের বক্তব্য ছিল খুবই সুস্পষ্ট। বন্ড দেখতে শন কনারি বা ড্যানিয়েল ক্রেইগের ধারেকাছেও ছিল না। ফ্লেমিং চেয়েছিলেন বন্ড হবে দেখতে অনেকটা আমেরিকান সংগীতশিল্পী ও সুরকার হোগি কারমাইকেলের মতো। ক্যাসিনো রয়্যাল উপন্যাসে ফ্লেমিং এমনকি ভ্যাসপার লিন্ড নামক চরিত্রটিকে দিয়ে এ কথা বলিয়েছিলেনও যে বন্ড দেখতে কারমাইকেলের মতো।

ফ্লেমিং নির্মিত জেমস বন্ড চরিত্রটি আর বর্তমান সময়ে রূপালী পর্দায় দেখা যায় যে জেমস বন্ডকে, তারা একেবারেই আলাদা। তাদের চরিত্র, সময়, প্রেক্ষাপট, শত্রু সব কিছুই ভিন্ন। তারপরও এ কথা সহজেই বলা যায় যে, মূল জেমস বন্ড চরিত্রটি আসলে বহু মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সংকলন। আরো সহজ করে বলতে, ফ্লেমিং এ চরিত্রটিকে দাঁড় করিয়েছেন তার নিজের ও আশেপাশের মানুষদের আদলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

ভারতে জন্ম যেসব খেলার

যেভাবে শত্রুমুক্ত হয় মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন মিরপুর