in

যেভাবে এফসি বার্সেলোনা হয়ে উঠেছে কাতালান গৌরবের প্রতীক

১৮৯৯ সালের ২৯ নভেম্বর। সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপনের ডাকে সাড়া দিয়ে একত্র হলো স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের একঝাঁক ফুটবলার। পরস্পরের অপরিচিত ওই ফুটবলাররাই সম্মিলিতভাবে গড়ে তুলল ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর একটি, এফসি বার্সেলোনা। এবং সাফল্য তাদের অনুসরণ করল খুব শীঘ্রই।

আজকে, ক্লাবটির মটো হলো “মেস কুই উন ক্লাব,” যার অর্থ “একটি ক্লাবের চেয়েও বেশি কিছু।” গালভরা শোনালেও, এর চেয়ে বড় সত্য কিন্তু আর কিছুই হতে পারে না। স্রেফ একটি ফুটবল দল হওয়া সত্ত্বেও ক্লাবটি এখন কাতালান গৌরবের মূর্ত প্রতীক। স্পেনের সরকারি শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও সদা সরব এই ক্লাবটিই।

এই ক্লাবটি সৃষ্টির পেছনে প্রধান অবদান যেই মানুষটির, তিনি একজন সুইস-জার্মান, নাম হ্যান্স-ম্যাক্স গাম্পার। একজন পুরোদস্তুর ক্রীড়াপ্রেমী ব্যক্তিত্ব গাম্পারের বয়স ১৮৯৯ সালে ২২ বছরের বেশি ছিল না। তবে ইতিমধ্যেই তিনি তার নিজ দেশে ফুটবল খেলে দারুণ অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন, এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এফসি জুরিখেরও। এছাড়াও রাগবি খেলার অভিজ্ঞতাও তার ছিল লিওঁতে।

গাম্পারের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় এফসি বার্সেলোনা; Image Source: Wikimedia Commons

১৮৯৮ সালে কাতালুনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনায় ভ্রমণ করেন গাম্পার, এক চাচার বাসায়। ঠিক বর্তমানের মতোই, তখনো মাদ্রিদীয় শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছিল উত্তর স্পেনের এই অঞ্চলটি।

তার আগে-পরের অন্য বহু পর্যটকের মতো, তরুণ গাম্পারও প্রেমে পড়ে যান এই শহরের, এবং মনস্থির করে ফেলেন, এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন তিনি। এমনকি বার্সেলোনার প্রতি তার ভালোবাসা এতটাই জোরালো ছিল যে, আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নাম বদলে কাতালান সংস্করণ হুয়ান গাম্পারও করে ফেলেন তিনি।

বার্সেলোনা শহরের প্রেমে পড়েছিলেন গাম্পার; Image Source: Apartment Barcelona

বার্সেলোনায় অবস্থানকালে কয়েকটি সুইস কোম্পানির হয়ে অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছিলেন গাম্পার। চার্চের পর অন্যান্য প্রোটেস্ট্যান্টদের সাথে ফুটবল খেলাটা বেশ উপভোগ করতেন তিনি। এবং ১৮৯৯ সালের অক্টোবরে তার কাছে মনে হলো, এই শহরের একটি নিজস্ব ফুটবল ক্লাবেরও বড্ড প্রয়োজন।

যে সংবাদপত্রে তিনি কাজ করতেন, সেই লস দেপোর্তেই ওই বছরের ২২ নভেম্বর একটি বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে দিলেন তিনি। এবং পরের একটি সপ্তাহ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন আগ্রহীদের কাছ থেকে প্রত্যুত্তর পাওয়ার। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, কাজটি শুনতে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে ছিল ততটাই কঠিন। কেননা স্পেনে ফুটবলের প্রতি মানুষের আগ্রহ তখনকার দিনে ছিল না বললেই চলে। গাম্পারের মতো কিছু বিদেশীর হাত ধরেই সেখানে ঢিমেতালে বাড়ছিল খেলাটির জনপ্রিয়তা।

২৯ নভেম্বর বার্সেলোনার জিমনাসিও সোলেতে তিনি দেখা করলেন সেইসব উৎসাহী খেলোয়াড়ের সাথে, যারা তার ডাকে সাড়া দিয়েছিল। সব মিলিয়ে সাড়া দেয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা ছিল ১১। এদের মধ্যে স্প্যানিশ ও সুইসরা তো ছিলই, এমনকি ছিল ইংরেজরাও। ছিলেন ক্লাবের প্রথম প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার ওয়াইল্ড, এবং ভ্রাতৃদ্বয় জন ও উইলিয়াম পারসনস।

গাম্পারের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন ১১ জন মেধাবী ফুটবলার; Image Source: Wikimedia Commons

সেদিনের সাক্ষাতে নির্ধারিত হলো দলটির নাম ও বর্ণ, এবং সৃষ্টি হয়েছিল নীল ও লাল রঙের ব্লগরানা কিটও। সম্ভবত এই কিটের অনুপ্রেরণা গাম্পার পেয়েছিলেন নিজ জন্মশহরের ক্লাব এফসি বাসেলের থেকে।

গাম্পার নিজে ছিলেন একজন দুর্দান্ত খেলোয়াড়। তাই ক্লাবের প্রথম কয়েক মৌসুমে প্রশাসনিক ভূমিকায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার পরিবর্তে, মাঠে অন্যদের সাথে দাপিয়ে বেড়ানোকেই শ্রেয় মনে করলেন তিনি। ১৮৯৯ থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে শতাধিক গোলের দেখাও পেয়ে গেলেন।

এই সময়কালের মধ্যেই, ১৯০২ সালে ক্লাবটি তাদের প্রথম ট্রফি জয় করল, এবং পৌঁছে গেল প্রথম কিংস কাপ বা কোপা দেল রে-র ফাইনালেও, যেখানে অবশ্য বিজকায়ার কাছে ২-১ ব্যবধানে হার মানতে হলো তাদেরকে।

তবে ১৯০৫ সালের পর থেকে মাঠ ও মাঠের বাইরে কিছুটা ধূসর সময়ই কাটতে লাগল এফসি বার্সেলোনার। তখন গাম্পার বাধ্য হলেন ক্লাবটির প্রেসিডেন্ট পদ গ্রহণ করে সেটিকে অর্থনৈতিক দুর্দশার হাত থেকে রক্ষা করতে। চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করলেন গাম্পার, এবং পুনরায় ক্লাবটিকে সাফল্যের মহাসড়কে তুলে আনার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করলেন।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে গাম্পারের যোগ্য নেতৃত্বেই এফসি বার্সেলোনা স্থানান্তর করল একটি স্থায়ী স্টেডিয়ামে, ডেকে আনল একজন ফুল-টাইম ম্যানেজার ইংলিশম্যান জ্যাক গ্রিনওয়েলকে, এবং ছয়টি কোপা দেল রে ও চারটি পাইরেনিস কাপ জিতে বয়ে আনল নিজেদের প্রথম “স্বর্ণযুগ”। সবচেয়ে বড় কথা, ক্লাবটি পরিণত হলো কাতালান গৌরবের প্রতীকে।

কাতালুনিয়ার মানুষের কাছে এফসি বার্সেলোনা তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যম; Image Source: Getty Images

খেলার সাথে রাজনীতি মিশতে খুব বেশি সময় লাগল না। বিংশ শতকের প্রথম কয়েক দশকের মধ্যেই এফসি বার্সেলোনা পরিণত হলো প্রধানতম বস্তুতে, যার মাধ্যমে কাতালানরা তাদের জাতীয় পরিচয় প্রকাশ করতে পছন্দ করে। তাই তো ফুটবলের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই এমন অনেকেও স্রেফ জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমর্থন করতে শুরু করল ক্লাবটিকে।

এ সময়ে গাম্পার একটি সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তার হাতে গড়া ক্লাবটি ক্রমশই কীভাবে কাতালুনিয়ার গণমানুষের আবেগের ধারক ও বাহকে পরিণত হচ্ছন। তাই তিনি ক্লাবটির আনুষ্ঠানিক ভাষা রাজকীয় কাস্তিলিয়ান স্প্যানিশ থেকে বদলে কাতালুনিয়ার স্থানীয় ভাষা করে দিলেন।

এদিকে স্পেনের শাসনক্ষমতার মসনদে তখন অধিষ্ঠিত ছিলেন স্বৈরশাসক প্রিমো দে রিভেরা, যিনি ক্রমাগত স্পেনের শাসনব্যবস্থাকে মাদ্রিদের কেন্দ্রীভূত করে চলছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই কাতালানের মানুষ স্বায়ত্তশাসন দাবি করত। তাই ১৯২৫ সালে তারা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের জন্য, একটি খেলা শুরুর আগে জাতীয় সংগীত চলাকালে দুয়োধ্বনি দিতে লাগল।

এই ঘটনায় যেন কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেল গোটা দেশের উপর দিয়ে। স্বৈরশাসক প্রিমো দে রিভেরা ভাবলেন, “যথেষ্ট হয়েছে, আর না।” জোরপূর্বক গাম্পারকে তার পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করলেন তিনি। ক্লাব ছাড়ার পর পরিত্যক্ত ও সর্বস্বান্ত অবস্থা হলো গাম্পারের, এবং ১৯৩০ সালে তিনি নিজ হাতে কেড়ে নিলেন নিজের জীবন।

এরপরের সময়গুলো ছিল এফসি বার্সেলোনার জন্য খুবই কঠিন। ১৯৩৬ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হলো। কাতালান স্বাধীনতার পক্ষপাতী হওয়ায় ওই একই বছর ফ্যাসিবাদীরা হত্যা করল ক্লাবটির প্রেসিডেন্ট ইয়োসেপ সানিওলকে। তবে এতে দমে গেল না কাতালুনিয়ার স্বাধীনতাকামী জনগণ, বরং আরো তেঁতে উঠল তারা।

ফ্যাসিবাদীদের হাতে শহীদ হন সানিওল; Image Source: Wikimedia Commons

বছর দুয়েক বাদে কাতালুনিয়া দখল করে নিল জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বাহিনী। এফসি বার্সেলোনা তখন বিবেচিত হচ্ছিল সরকারবিরোধী মনোবৃত্তির সূতিকাগার হিসেবে। তাই শোষকগোষ্ঠী আবারো আঘাত হানল এই ক্লাবের উপর। বদলে গেল এর আনুষ্ঠানিক ভাষা ও ক্রেস্ট। সদস্যপদে ব্যাপক কাটছাঁট করা হলো, এবং ক্লাবটির শীর্ষ খেলোয়াড়রাও সবাই নিজেদের জান বাঁচাতে বিদেশে পালিয়ে গেল।

বেশ লম্বা একটা সময়ের পর পরিস্থিতি আবারো শান্ত হয়েছিল বটে, এবং ১৯৫০-র দশক ছিল ক্লাবটির জন্য আরেকটি স্বর্ণালী সময়কাল। একঝাঁক হাঙ্গেরিয়ানের আগমনে জ্বলে উঠল ক্লাবটি। লা লিগা প্রাণ ফিরে পেল তাদের খেলোয়াড়ি দক্ষতার বিচ্ছুরণে।

বিশ্বজোড়া খ্যাতি ক্যাম্প ন্যুর; Image Source: Goal

১৯৫৭ সালে সম্পন্ন হলো এফসি বার্সেলোনার জগদ্বিখ্যাত স্টেডিয়াম ক্যাম্প ন্যুর নির্মাণ কাজ। তবে এটি নির্মাণ করতে গিয়ে ক্লাবটিকে অর্থনৈতিক দৈন্যদশার শিকার হতে হলো, যার ফলস্বরূপ ১৯৬০-র দশকে ক্লাবটি আরেকটি বন্ধুর পথের সম্মুখীন হলো। খানিকটা দেরিতে হলেও, পরিস্থিতি খোলনলচে পালটে গেল ১৯৭৩ সালে ৯,৩০,০০০ পাউন্ডের রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে ডাচ মিডফিল্ডার ইয়োহান ক্রুইফের আগমনের মাধ্যমে। তিনি নেতৃত্ব দিলেন খেলার মাঠে ক্লাবটির সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময়ের।

ক্রুইফের পায়ের জাদুতে প্রাণ ফিরে পায় বার্সেলোনা; Image Source: Daily Star

শারীরিক অবয়বে ছোটখাট হলে কী হয়েছে, ফুটবল নিয়ে কারিকুরি-কসরতে ক্রুইফ ছিলেন অদ্বিতীয়। সমসাময়িক আর সকলের চেয়ে কয়েক ধাপ উপরে ছিলেন তিনি। তাই তো বার্সেলোনার হয়ে খেলার সময়েই তিনবার বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের সম্মাননা ব্যালন ডি’অর পুরস্কার জিতে নিলেন তিনি।

১৯৮৮ সালে আবারো ম্যানেজার হিসেবে ফিরে এলেন তিনি, এবং ক্লাবটির মাঝে গেঁথে দিলেন নিজের পাসিং নির্ভর ফুটবলের বীজ। একই দীক্ষায় দীক্ষিত হলো ক্লাবটির অ্যাকাডেমি লা মাসিয়াও, যা সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখল ক্লাবটির ভবিষ্যতে। “টোটাল ফুটবল” নামের একদম নতুন ঘরানার এক খেলোয়াড়ি কৌশলের উদ্ভাবন ঘটিয়েছিলেন তিনি, যার সুফল আজো ভোগ করে চলেছে ক্লাবটি।

চলতি শতকে বার্সেলোনার সবচেয়ে বড় সাফল্যের কৃতিত্ব গার্দিওলা-মেসি জুটির; Image Source: Getty Images

ক্ষুদ্র অবয়ব অথচ সর্বোচ্চ কৌশলগত দক্ষতার মাধ্যমে যে সফল হওয়া যায়, সে দৃষ্টান্ত প্রথম স্থাপন করেছিলেন ক্রুইফই। আজ সেই একই দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই সময়ের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসির মাঝেও। এবং এটিও মোটেই কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, মেসিও বেড়ে উঠেছেন ক্রুইফের নিজস্ব ছাঁচে ঢেলে সাজানো লা মাসিয়াতেই।

ক্রুইফের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্রদের একজন ছিলেন স্থানীয় মিডফিল্ডার পেপ গার্দিওলা। ম্যানেজার হিসেবে সেই পেপ গার্দিওলার নেতৃত্বেই ২০০৮-২০১২ সময়কালে সর্বজয়ী দল হয়ে উঠেছিল এফসি বার্সেলোনা। তবে গার্দিওলা এখন আর নেই ক্লাবটির সাথে। লা লিগাকে নিজস্ব সম্পত্তি বানিয়ে ফেললেও, চার মৌসুম ধরে ক্লাবটি জেতে না ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই চ্যাম্পিয়নস লিগ। কিন্তু আশার প্রদীপ হিসেবে এখনো রয়েছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী লিওনেল মেসি। খুব শীঘ্রই হয়তো তার হাত (পড়ুন পা) ধরেই কাটবে খরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

চন্দ্রজয় নিয়ে জনমনে যত প্রশ্ন

এলন মাস্কের প্রতিশ্রুতি: কতটা সফল হয়েছেন তা অর্জন করতে?