in

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (পর্ব ২)

শুনতে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু মানুষের চেয়ে কোনো স্থানের নামের তাৎপর্য কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেশি হয়ে থাকে। কেন বলছি এ কথা? একটু নিজেই ভেবে দেখুন। কোনো মানবসন্তানের জন্ম হলে তার বাবা-মা নিজেদের ইচ্ছামতো যা কিছু একটা নাম রেখে দিতে পারে তার। কিন্তু কোনো স্থানের নাম রাখা কি এতটাই সহজ? একদমই না। বরং কোনো স্থানের নামকরণ একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া। ওই স্থানের গুণ, বৈশিষ্ট্য, বিশেষত্ব ইত্যাদির সমন্বয়ে, কিংবা কোনো স্মরণীয় ঘটনার সম্মানার্থে, স্থানটির একটি উপযুক্ত নামকরণ করা হয়। তাই তো নাম থেকেই স্থানটির ইতিহাস, ঐতিহ্যের অনেকখানিটা জেনে নেয়া সম্ভব।

যে শহরের ইতিহাস যত বেশি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ, সে শহরের এলাকাগুলোর নামের ইতিহাসও তত বেশি অভিনব। তাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাসও যে বিশেষ বিশেষত্ব বহন করবে, তাতে আর আশ্চর্য কী! একে তো প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য অনুযায়ী ঢাকার বয়স দেড় সহস্রাধিক, এমনকি রাজধানী হিসেবেও ৪০০ বছরের বেশি সময় পার করে ফেলেছে সে। এদিকে শহরটিতে হাট-বাজার এবং অলিগলির সংখ্যাও এত বেশি যে, একসময় একে ডাকা হতো “বায়ান্ন বাজারের তিপ্পান্ন গলি” বলে। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই হাজার হাজার গলি-বাজারের গল্প মিশে রয়েছে শহরটির বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাসে।

গত পর্বে আমরা জেনেছি ঢাকার বেশ কিছু এলাকার নামকরণের মজাদার ইতিহাস সম্পর্কে। চলুন এবার জেনে নিই আরো কিছু।

বিখ্যাত কাকরাইল মসজিদ; Image Source: wefindyougo.com

কাকরাইল

আমাদের দেশে সম্মানিত ব্যক্তির নামানুসারে সড়কের নামকরণের চর্চাটি খুবই প্রচলিত। আর ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজরা তো বরাবরই সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে এসেছে। বিশেষত ইংরেজরা কমিশনারদের নামানুসারে সড়কের নামকরণের রেওয়াজটি ছিল খুবই জনপ্রিয়। তাই উনিশ শতকের শেষ দশকে ঢাকার কমিশনার হিসেবে যখন দায়িত্ব পালন করছিলেন মি. ককরেল, তাকে সম্মান জানিয়ে একটি রাস্তার নামকরণ করে ফেলা হয়। কালক্রমে সেই ককরেলই পরিণত হয়েছে কাকরাইলে, আর এখন একটি গোটা এলাকাই পরিচিত সে নামে।

আজিমপুর

আজিমপুরের নামকরণ নিয়ে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে। ইতিহাসবিদদের এক পক্ষ মনে করেন, এলাকাটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র সুবাদার শাহজাদা আজমের শাসনামলে (১৬৭৭-১৬৭৯), এবং তার নাম আজম থেকেই এসেছে আজিমপুর নামটি। তবে অন্য আরেক পক্ষের অভিমত, আওরঙ্গজেবের পুত্র নন, বরং পৌত্র, সুবাদার আজিমুশশানের শাসনামলে (১৬৯৭-১৭০৩) উত্থান ঘটেছিল এলাকাটির, এবং তার নাম থেকেই এলাকার নামের সৃষ্টি।

কারওয়ান বাজার; Image Source: Dhaka Tribune

কারওয়ান বাজার

কারওয়ান নাকি কাওরান, এ নিয়ে রয়েছে প্রচুর বিতর্ক। তবে মজার ব্যাপার হলো, আসল শব্দটি হলো কারাবান, যার অর্থ সরাইখানা। দিল্লির সুলতান শেরশাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিখ্যাত গ্রান্ড ট্রাংক রোড বা সড়ক-ই-আজম। পরবর্তীতে ঢাকার মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খানের আমলে ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত অংশটি নতুন করে নির্মিত হয়। তখন এ সড়কের কিছুদূর পরপর স্থাপিত হয়েছিল সরাইখানা বা কারাবান। ধারণা করা হয়ে থাকে, বর্তমান কারওয়ান বাজার এলাকায় ছিল এমনই একটি সুপরিচিত কারাবান, যা থেকে এলাকাটির নাম দাঁড়িয়েছিল কারাবান বাজার, এবং পরবর্তীতে কারওয়ান বাজার।

শাহবাগ

বর্তমান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রাজকীয় অবস্থান দখল করে রেখেছে শাহবাগ। এবং কী কাকতালীয় ঘটনা, শাহবাগের নিজের নামেও কিন্তু রাজকীয় শব্দটির উপস্থিতি রয়েছে। কারণ শাহবাগ শব্দের আভিধানিক অর্থ রাজকীয় বাগান। মুঘল সম্রাটরা যখন ঢাকাকে প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন, এরপর এই এলাকায় একটি বিশালাকার, দৃষ্টিনন্দন বাগানও গড়ে তোলেন তারা। আজ সেই বাগানের স্মৃতিচিহ্নটুকু পর্যন্ত চোখে পড়ে না। কিন্তু তবু সেটি রয়ে গেছে স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে, যারা রাজকীয় বাগানকে স্মরণ করে পুরো এলাকাকে শাহবাগ নামে ডাকার মাধ্যমে।

শাহবাগ; Image Source: Dhaka Tribune

পরীবাগ

শাহবাগের অদূরেই কিন্তু আজকের পরীবাগ। অনেকের মতে, নবাব সলিমুল্লাহর সৎ বোন ছিলেন পরীবানু। নবাব সলিমুল্লাহ এই এলাকায় তার সৎ বোনের জন্য একটি বাগানবাড়ি গড়ে তোলেন। সেই বাগানবাড়িতেই বসবাস করতে থাকেন পরীবানু, এবং তার নামানুসারেই এলাকাটির নাম দাঁড়িয়ে যায় পরীবাগ।

শ্যামলী

বাগানের কথা যখন হচ্ছেই, তখন একসময় শ্যামলিমায় ঢাকা ঢাকার আরেকটি স্থানের কথাও না বললেই নয়, যেটি আজ শ্যামলী নামে পরিচিত। এই এলাকার নামকরণের ইতিহাস অবশ্য খুব প্রাচীন নয়। পাকিস্তান আমলে, ১৯৫৭ সালে সমাজকর্মী আব্দুল গণি হায়দারসহ বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি মিলে এই এলাকায় বাড়ি করেন। তবে বাড়ি তো করেছেন, কিন্তু মনমতো নাম খুঁজে পাচ্ছিলেন না তারা। তখন সবাই মিলে আলোচনায় বসেন, এবং এলাকায় প্রচুর গাছপালা থাকার সুবাদে, এলাকাটির নাম তারা দেন শ্যামলী।

মগবাজার

মগবাজারের নামকরণ সম্পর্কিত সবচেয়ে প্রচলিত তত্ত্ব হলো, মগ তথা বর্মী বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের থেকে এসেছে এই এলাকার নাম। ঢাকায় মগরা এলো কোত্থেকে, তা জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৬২০ সালে, যখন মগ সাম্রাজ্য তৎকালীন মুঘল সুবা বাংলার কেন্দ্রস্থল ঢাকা শহরে আক্রমণ চালায়। এরপর মুঘল সুবাদার ইসলাম খান মগদের তখনকার ঘাঁটি ঘাঁটি চট্টগ্রাম এলাকা জয় করেন। সেখানকার মগ শাসক মুকুট রায় ও তার অনুসারীরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে, ইসলাম খান তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন, এবং ঢাকার একটি বিশেষ এলাকায় থাকার অনুমতিও প্রদান করেন, যা আজ পরিচিত মগবাজার নামে। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন অবশ্য এ তত্ত্ব মানেন না। বরং তার মতে, উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্তও এই এলাকাটি ছিল ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। মুঘল শাসনামলের অনেক পরে, ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন বাংলায় আশ্রয় গ্রহণকারী মগ সর্দার কিং ব্রিং ও তার অনুসারীরা এসে বসবাস করতে শুরু করেছিল এই এলাকায়, যেখান থেকে মগবাজার নামের উৎপত্তি।

মগবাজারে ছিল মগদের বাস; Image Source: YouTube

ইস্কাটন

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে ঢাকার বেশ খ্যাতি ছিল ইউরোপীয়দের কাছে। ইউরোপীয় নানা দেশের, নানা জাতের বণিকেরা এসে ভিড় জমাত ঢাকায়, গড়ে তুলত নিজস্ব আস্তানা। বাদ যায়নি স্কটল্যান্ডের বণিকরাও। জেনে অবাক হবেন, একসময় ঢাকায় “সোনালী আঁশ” পাটের একচেটিয়া ব্যবসা ছিল এই স্কটিশদের হাতেই। তারা নিজেদের মতো করে একটি বসতিও গড়ে তুলেছিল ঢাকার বুকে, এবং আরো স্থাপন করেছিল একটি স্কটিশ চার্চও। কিন্তু স্থানীয়দের জিভে স্কটিশ শব্দটি আসত না, তাই স্কটিশদের বসতিকে তারা বিকৃতভাবে ইস্কাটন বানিয়ে নিয়েছিল!

শেষ কথা

ঢাকার ইতিহাস নিয়ে বিশেষ এই আয়োজনের এখানেই কিন্তু শেষ নয়। ঢাকা শহরের হৃদয়ে তো রয়েছে আরো অসংখ্য এলাকা, যাদের নামকরণের ইতিহাসও দারুণ চমকপ্রদ। সেরকম কিছু এলাকার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে আবারো হাজির হব পরের পর্বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (পর্ব ১)

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (পর্ব ৩)