in

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (শেষ পর্ব)

কোনো স্থানের নামকে অনেকেই অভিহিত করে স্থাননাম হিসেবে। স্থাননাম বলতে বোঝানো হয় কোনো একটি স্থানের শনাক্তকারী বর্ণনা। আর এই ধরনের নামকরণের পেছনে প্রধান যে উদ্দেশ্য কাজ করে তা হলো সংশ্লিষ্ট স্থানের নিজস্ব একটি পরিচিতি তৈরি করা, যা আশেপাশের অন্যান্য সব স্থানের চেয়ে স্বকীয় ও ভিন্ন। এ কারণে স্থাননামকে চাইলে এক ধরনের বর্ণনামূলক শনাক্তি বা বর্ণনামূলক পরিচয়পত্রও বলা যেতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনবহুল শহরটির নাম ঢাকা। একে দেশের সবচেয়ে ইতিহাস সমৃদ্ধ শহর বললেও অত্যুক্তি হবে না। মুঘল আমলের তিনটি রাজধানীর একটি হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিল এই শহর। তারও অনেক আগে থেকে এর গৌরবোজ্জ্বল অস্তিত্ব তো ছিলই, রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে পরবর্তী ৪০০ বছর সে গৌরবের উত্তরোত্তর বিকাশ ও বিস্তৃতি ঘটেছে। তাই তো ঢাকার প্রায় প্রতিটি এলাকার সাথেই এখন মিশে আছে শত বছরের পুরনো ইতিহাস, যা প্রভাব ফেলেছে তাদের নামকরণে।

বিশেষ এই ধারাবাহিকে আমরা আপনার সামনে উন্মোচন করছি নামকরণের সেইসব চমকপ্রদ ইতিবৃত্তই। আজ থাকছে চতুর্থ ও শেষ পর্ব।

মোহাম্মদপুর

নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন, আমাদের দেশে স্থাননামের ক্ষেত্রে ‘পুর’ শব্দটি খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু ঠিক কতটা জনপ্রিয়, তা হয়তো আন্দাজ করতে পারেননি এতদিন। দেশের মোট ৬৮টি উপজেলা ও ১২টি জেলার নামের শেষে রয়েছে ‘পুর’ শব্দটি! তেমনই ঢাকার অনেক এলাকার নামের শেষেও রয়েছে এ শব্দটি। তেমনই একটি এলাকা হলো মোহাম্মদপুর। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নামানুসারেই এসেছে এই মোহাম্মদ। ১৯৪৭ সালে যখন ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে গেল, অনেক উদ্বাস্তু মুসলিমই চলে আসে তৎকালীন পাকিস্তানে। তখন অনেক অবাঙালি মুসলিমও ভিড় জমায় ঢাকায়, এবং সবাই মিলে লালমাটিয়ার পাশে একটি এলাকায় বাস করতে থাকে। অবাঙালি মুসলিমদের এই আবাসিক এলাকারই নামকরণ হয় মোহাম্মদপুর হিসেবে, এবং ১৯৫৮ সালে এই এলাকায় তাদের স্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা হয়।

ভারত ভাগের পর বহু অবাঙালি মুসলিম এসে ভিড় জমিয়েছিল ঢাকায়; Image Source: The Guardian

জয়নাগ রোড

সম্মানিত বা প্রভাবশালী ব্যক্তির নামে রাস্তার নামকরণ তো হরহামেশাই হয়। কিন্তু টাকার বিনিময়ে রাস্তার নাম নিজের নামে করে নেয়ার কথা শুনেছেন কখনো? এমনই একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্তের নাম জয়নাগ রোড। বকশিবাজারের নিকটস্থ এই জায়গাটির পূর্ব নাম কিন্তু ছিল ভিন্ন কিছু। সবাই সেটিকে চিনত চুহার বাজার হিসেবে। কেননা এখানকার অনেকেই তখন বিলেতি সাদা ইঁদুর বা গিনিপিগ পালত, এবং দেদারসে সেগুলোর বিকিকিনিও হতো। ঢাকাইয়া ভাষায় ইঁদুরকেই ডাকা হয় ‘চুহা’ নামে, আর সেখান থেকে গোটা একটি এলাকার নামই দাঁড়িয়ে যায় চুহার বাজার নামে। কিন্তু স্থানীয় অনেকেই নিজ এলাকার এমন নামকরণ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল না। তারা চাচ্ছিল সম্মানজনক ভিন্ন কোনো নামে হোক তাদের এলাকার নাম। এমনই এক প্রেক্ষাপটে, ১৯২১ সালে মাত্র ৩০০ টাকার বিনিময়ে জয়নাগ নামধারী এক স্থানীয় ধনবান ব্যক্তির নামে বদলে যায় রাস্তার নাম।

গোপীবাগ

ঢাকায় যে বাগের ছড়াছড়ি, এবং সেসব বাগের উৎপত্তি বাগান থেকে, সে আলাপ তো আগেই সেরে নিয়েছি। তবে বাগান ছাড়াও যে বাগ হতে পারে, এমন উদাহরণও কিন্তু রয়েছে। সেটি হলো গোপীবাগ। অন্তত ইতিহাস খুঁড়ে এই এলাকায় কোনো বাগানের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। এলাকাটি ছিল গোপীনাথ সাহা নামক একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর নিজস্ব সম্পত্তি। তিনি এখানে স্থাপন করেছিলেন গোপীনাথ জিউর মন্দির। এবং সেই মন্দিরের (কিংবা তার নিজের) নামানুসারেই এলাকাটির নাম হয়ে যায় গোপীবাগ।

খিলগাঁও ফ্লাইওভার; Image Source: Flickr

খিলগাঁও

খিলগাঁওয়ের নামকরণের পেছনে যতটা না আছে ইতিহাস, তার থেকে বেশি আছে কিংবদন্তী। সেই কিংবদন্তী মতে, অনেক অনেক দিন আগে কোনো এক সময়ে এই জায়গার পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হতো পাণ্ডুনদী। সেই নদীর তীরেই পত্তন ঘটেছিল কূলগ্রাম নামক একটি গ্রামের। ধারণা করা হয়, কালক্রমে সেই কূলগ্রামেরই হয়তো বর্তমান রূপ খিলগাঁও। অবশ্য মুঘল নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, সেখানে খিলগাঁওকে উল্লেখ করা হয়েছে কেলগাঁও নামে। কে জানে, কেলগাঁও-ও হয়তো কূলগ্রামেরই অপভ্রংশ।

ইন্দিরা রোড

অনেকেরই ধারণা, ইন্দিরা রোডের নামকরণ বুঝি হয়েছে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামে। কিন্তু সেটি সর্বৈব ভুল ধারণা। তাহলে সঠিক ধারণা কোনটি? বলছি, শুনুন। ১৯৩০ সালের দিকে এই এলাকায় থাকতেন দ্বিজদাস বাবু নামের এক বিত্তশালী ব্যক্তি। তার ছিল বিশাল বাড়ি, আর সেই বাড়ির পাশ দিয়েই গিয়েছিল রাস্তাটি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দ্বিজবাবুর বড় মেয়ে ইন্দিরা অকালে মারা যায়। সেই মৃত মেয়ের নামানুসারেই দ্বিজবাবু রাস্তাটির নাম রাখেন ইন্দিরা রোড।

ধূপখোলা মাঠের পাশ দিয়েই গেছে ডিস্টিলারি রোড; Image Source: YouTube

ডিস্টিলারি রোড

চিনেছেন তো কোন সড়কের কথা বলছি? ওই যে, ধূপখোলার উপর দিয়ে যে লম্বা রাস্তাটি চলে গেছে। এমন নামকরণের কারণ, ব্রিটিশ আমলে সেখানে ছিল সরকারি ডিস্টিলারি বা মদ্য উৎপাদনকেন্দ্র ও শোধনাগার। সহজ বাংলায় যাকে বলে ভাটিখানা। ধোলাইখাল থেকে পানি উত্তোলন করে তাই দিয়ে মদ উৎপাদন করা হতো এই ভাটিখানায়।

জিগাতলা

এই এলাকার নামকরণের ইতিহাসও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। সুবা বাংলার রাজধানী যখন ঢাকা থেকে স্থানান্তরিত করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন কিছু সময়ের জন্য ঢাকায় লোকবসতি কমতির দিকে ছিল। অনেক মানুষই তল্পিতল্পা গুটিয়ে ঢাকা ত্যাগ করছিল। বিশেষত বিদেশ থেকে আগত পেশাজীবী শ্রেণীর মানুষদের তো এই শহরে থাকার আর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাই তারা অন্য কোথাও পাড়ি জমায়। ফলে ঢাকা পরিণত হয় এক পরিত্যক্ত নগরীতে, যার জায়গায় জায়গায় জন্মায় বুনো গাছপালা, পরিণত হয় জঙ্গল। অভিন্ন দশা হয়েছিল আজকের ধানমণ্ডি এলাকারও। তখন এই এলাকার কিছু জায়গায় ‘জিগা’ নামক গাছের আধিক্য দেখা যায়। কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই কিছু মানুষ সেখানে এসে জঙ্গল সাফ করে নিজেদের জন্য বাসস্থান তৈরি করতে শুরু করে। তাদের সেইসব বাসস্থানের নাম ছিল ‘টোলা’। ফলে ‘জিগা’ আর ‘টোলা’ মিলে জায়গাটির নাম হয়ে যায় জিগাটোলা। কালের প্রবাহে সেই জিগাটোলাই আজকের জিগাতলা।

হোসেনী দালানের অবস্থান বকশিবাজারে; Image Source: Flickr

বকশিবাজার

না, বকশিবাজারে বাক্স তৈরি করা হতো না। কিংবা এই এলাকার সাথে নেই বাঙালির প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীরও সুদূরতম সম্পর্ক। বকশি মূলত মুসলিমদের ব্যবহৃত একটি উপাধি বা পদবি বিশেষ। মুঘল আমলে যেসব রাজকর্মচারী বেতন বণ্টনের কাজে নিয়োজিত ছিল, তাদেরকে ডাকা হতো বকশি নামে। আর এই এলাকাতেই ছিল তাদের সরকারি বাসস্থান। তাছাড়া এখানে তারা একটি বাজারও প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই দুইয়ে মিলেই এলাকাটির নাম হয়েছে বকশিবাজার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (পর্ব ৩)

চন্দ্রজয় নিয়ে জনমনে যত প্রশ্ন