in

ক্রুসেড (পর্ব ১): যেভাবে সূচনা ঘটেছিল ধর্মযুদ্ধের

বিশ্ব ইতিহাস পাঠের একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রয়েছে ক্রুসেড। আভিধানিকভাবে এর অর্থ হলো ধর্মযুদ্ধ। অনেকের কাছে এটি আবার পবিত্র যুদ্ধও বটে। কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যের ব্যাপারে জনগণ শক্ত ধারণা পোষণ করলে তাকে ক্রুসেড নাম দেয়া হয়ে থাকে।

তবে বিশ্ব ইতিহাসে ক্রুসেডের সংজ্ঞা অনেকটাই ভিন্ন, এবং সুনির্দিষ্ট। ক্রুসেড বলতে এখানে মূলত পবিত্র ভূমি অর্থাৎ জেরুজালেম এবং কন্সটান্টিনোপলের অধিকার নেয়ার জন্য ইউরোপের খ্রিস্টানদের সম্মিলিত শক্তি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ১০৯৬ (মতান্তরে ১০৯৫) থেকে ১২৯১ সাল পর্যন্ত সর্বমোট আটবার যে যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেছিল সেগুলোকে বোঝানো হয়ে থাকে।

রক্তক্ষয়ী, সহিংস ও বর্বর এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইউরোপীয় খ্রিস্টানরা নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিল, এবং এই যুদ্ধই মধ্যপ্রাচ্য দখলের লড়াইয়ে তাদেরকে অন্যতম ক্ষমতাধর একটি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

মোট আটবার যুদ্ধ হয়েছিল খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যে; Image Source: History

প্রিয় পাঠক, ধারাবাহিক এই রচনার মাধ্যমে আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরব ক্রুসেডের একদম নিরপেক্ষ ও নির্মোহ বিবরণ। আশা করা যায়, ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি সম্পর্কে আপনাদের জ্ঞানের আগ্রহ মেটাতে সহায়ক হবে এই ধারাবাহিকটি।

প্রথমেই শুরু করা যেতে পারে ক্রুসেডের সূচনা নিয়ে। ঠিক কী কারণে, কোন প্রেক্ষাপটে এরকম ভয়াবহ একটি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল বর্তমান বিশ্বের প্রধান ও বৃহত্তম দুইটি ধর্মের অনুসারীরা?

এ প্রশ্নের সদুত্তর পেতে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে একাদশ শতকে। এ শতকের শেষ দিকে পশ্চিমা ইউরোপ আবির্ভূত হয়েছিল বিশ্বব্যাপী একটি খুবই প্রভাবশালী শক্তিরূপে। যদিও তারা বেশ খানিকটা পিছিয়েই ছিল বিভিন্ন ভূমধ্যসাগরীয় সভ্যতা, যেমন মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (আগে যেটি রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাংশ ছিল) ও ইসলামিক সাম্রাজ্যের থেকে।

পবিত্র ভূমি জেরুজালেমের দখলদারিত্ব ছিল ক্রুসেডের মূল কারণ; Image Source: DOC Research Institute

সেলজুক তুর্কিদের আক্রমণের শিকার হওয়ার পর বাইজেন্টিয়াম তাদের সাম্রাজ্যের একটি বড় অংশ হারিয়ে বসে। বেশ কয়েক বছরের চরম বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধের শেষে, ১০৮১ সালে সেনাপতি অ্যালেক্সিয়াস কমনিনাস দখল করে নেন বাইজেন্টাইন সিংহাসন। সেই সাথে তিনি সম্রাট প্রথম অ্যালেক্সিয়াস হিসেবে পাখির চোখ করেন সাম্রাজ্যের বাকি অংশ পুনরুদ্ধারকে।

১০৯৫ সালে অ্যালেক্সিয়াস দূত পাঠান পোপ দ্বিতীয় উর্বানের কাছে। তুর্কি আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্য পোপের কাছে পশ্চিম থেকে সাহায্য স্বরূপ বেতনভোগী সৈন্যদল প্রত্যাশা করেন তিনি। বহুদিন ধরেই পূর্ব ও পশ্চিমের খ্রিস্টানদের মধ্যকার সম্পর্ক একদমই ভালো ছিল না। বিভিন্ন কারণে পারস্পরিক ঝামেলা লেগেই থাকত। কিন্তু এমন একটি সময়ে অ্যালেক্সিয়াসের তরফ থেকে অনুরোধ এসেছিল, যখন সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে শুরু করেছে।

১০৯৫ সালের নভেম্বরে, দক্ষিণ ফ্রান্সের কাউন্সিল অব ক্লেরমন্তে পোপ পশ্চিমা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা হাতে অস্ত্র তুলে নেয়, এবং মুসলিমদের দখলদারিত্ব থেকে পবিত্র ভূমিকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বাইজেন্টাইনদেরকে সাহায্য করে।

মূলত মদিনায় মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করতে থাকে, এবং একাদশ শতকের দিকে বলা যেতে পারে সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলই মুসলমান শাসনের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। এ সময় মুসলিমরা দখল নিয়ে নিয়েছিল পবিত্র ভূমি হিসেবে খ্যাত জেরুজালেমেরও।

মুসলিমদের এই আধিপত্য ইউরোপের অবশিষ্ট অঞ্চলের খ্রিস্টান শাসকদের ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণেই পোপ তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করার জন্য পবিত্র ভূমি জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করেন।

পোপ দ্বিতীয় উর্বান; Image Source: YouTube

পোপ তার ভাষণে স্মরণ করিয়ে দেন, কীভাবে ফ্রাংক জাতির রাজা শার্লমাঞ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে স্যাক্সনদেরকে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেছিলেন এবং স্পেনের মুসলিম শাসকদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন।

পোপ উপস্থিত জনতাকে উজ্জীবিত করতে বলেন, “যে ব্যক্তিই পবিত্র তীর্থযাত্রায় যাওয়ার মনস্থির করবে এবং ঈশ্বরের নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবে, সে তার কপালে বা বুকে ঈশ্বরের স্মারক হিসেবে ক্রুশ ধারণ করবে। যখন, প্রতিজ্ঞা পুরোপুরি পূরণ করার পর সে প্রত্যাবর্তনের ইচ্ছা পোষণ করবে, তখন ক্রুশটিকে সে তার পেছনে, ঘাড়ের মাঝখানে স্থাপন করতে পারবে।”

পোপ উর্বানের এই আহ্বান ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল অভিজাত সেনা সদস্যদের থেকে শুরু করে একদম সাধারণ ছাপোষা মানুষ সকলের মাঝেই। হাজার হাজার মানুষ ধর্মীয় আবেগের বশবর্তী হয়ে, পোপের ডাকে সাড়া দিয়ে যোগ দিতে থাকে সশস্ত্র তীর্থযাত্রায়। আর তাদের পরনে থাকে চার্চের প্রতীক ক্রুশ।

এভাবে ক্রুশ পরিহিত অবস্থায় তীর্থযাত্রা তথা যুদ্ধের উদ্দেশে রওনা করেছিল বলেই, পরবর্তীতে খ্রিস্টানদের এই ধর্মযুদ্ধটির নাম হয়ে যায় ক্রুসেড, আর এতে অংশগ্রহণকারীরা পরিচিত হয় ক্রুসেডার হিসেবে।

ক্রশ পরিহিত যোদ্ধাদের তীর্থযাত্রা; Image Source: Wikimedia Commons

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল শ্রেণী-পেশার প্রায় ৯০ হাজার নারী, পুরুষ এবং শিশু-কিশোর অংশ নিয়েছিল ১০৯৬ থেকে ১০৯৯ সাল পর্যন্ত সংগঠিত প্রথম ক্রুসেডে।

এ ক্রুসেডে অংশ নেয়ার পেছনে সাধারণ মানুষ ও নাইটদের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিল খুবই সহজ, আর তা হলো ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করে ইহকাল ও পরকালে বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত হওয়া। তবে যারা তাদেরকে এই ক্রুসেডে অংশগ্রহণের মন্ত্রণা দিয়েছিল, তাদের মনে যে বিবিধ প্রকারের জাগতিক উদ্দেশ্য ছিল, তা অনুমান করতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না।

যেমন: বাইজেন্টাইন সম্রাটের উদ্দেশ্য ছিল হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়া এবং একটি হুমকিস্বরূপ প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকে ঘায়েল করা। এদিকে পোপের লক্ষ্য ছিল ইটালিতে তার প্যাপাসি (পোপতন্ত্র) বা ক্ষমতা সুসংহত করা এবং খ্রিস্টান চার্চের প্রধান হিসেবে নিজের কর্তৃত্ব স্থাপন করা। এছাড়া বণিকদের নজর ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাণিজ্যের কেন্দ্রগুলো নিজেরা দখল করে মনোপলি কায়েমের প্রতি।

১০৯৬ সালে শুরু হয় প্রথম ক্রুসেড; Image Source: History

ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধগুলোতে কী হয়েছিল, আর তাদের ফলাফল তৎকালীন বিশ্বকে কীভাবে বদলে দিয়েছিল, এবং বর্তমান বিশ্বকেও কীভাবে আড়াল থেকে প্রভাবিত করছে, সেসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সাজানো হবে এ ধারাবাহিকের পরের পর্বগুলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

পৃথিবীর যে স্থানগুলোতে যীশুখ্রিষ্ট ভ্রমণ করেছিলেন!

ক্রুসেড (পর্ব ৩): কনস্টান্টিনোপল পতন ও খ্রিস্টানদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা