in

যে জামা পরলে শরীর ঘামাবে না

ঘর থেকে বেরিয়েছেন। এখনো গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। অথচ গরমে পুরো শরীর ঘেমে ভিজে আছে। বরাবরের মতো গায়ের জামাটা পিঠের সাথে লেগে আছে। বিচ্ছিরি লাগছে! কিন্তু কিছুই করার নেই। এই জামা শুকাবে, তারপর আবার ভিজবে। পুরোটা দিন এভাবেই চলতে হবে। এমনটা ঠিক কতবার হয়েছে আপনার সাথে? নিশ্চয়ই অনেকবার?

আপনার এই সমস্যার সমাধান বিজ্ঞানীরা অনেকদিন আগে থেকেই খুঁজছিলেন। ঘাম শুষে নিতে পারে দ্রুত এবং ভিজে যায় না এমন জামা তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তারা। বছরের পর বছর ধরে খেলোয়াড়দের জন্য এমন জামা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে যেটি মানুষের শরীর থেকে ঘাম নিঃসরণের ব্যাপারটিকেই থামিয়ে দেবে। যেটি মানুষের শরীরের তাপমাত্রাকে এমন পর্যায়ে রাখবে, যেন ঘাম বের না হয়।

খুব যে সাফল্য পাওয়া গিয়েছে এসব চেষ্টায় তা কিন্তু নয়। তবে বিজ্ঞানীরা বারবার পরীক্ষা করেছেন নতুন সব তন্তু নিয়ে। সম্প্রতি এমন আরেকটি চেষ্টা করেছেন তারা। আর এই চেষ্টার ফলাফল হিসেবেই এমন এক কাপড় তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তারা, যেটি খুব সহজেই বাইরের আবহাওয়ার সাথে মিলিয়ে কাপড়ের ভেতরের আবহাওয়াকেও বদলে নিতে পারে। ফলে বাইরের বাতাসের আর্দ্রতা কমে গেলেও কাপড়ের ভেতরে থাকা ব্যক্তি মোটেও সেটা অনুভব করবেন না।

পুরো সময়ে তাই যেন মানব শরীর একই রকম তাপমাত্রা পেতে পারে সেটাই নিশ্চিত করবে নতুন এই প্রযুক্তি; Image Source: blog.drupa.com

উষ্ণতা ও আর্দ্রতা পেলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এমন কাপড় তৈরি করেছেন ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের গবেষকেরা। আর তাদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইউহুয়াং ওয়াং এবং ওউইয়াং মিন। এই প্রক্রিয়ায় বাইরের পরিবেশ নয়, প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে কাপড় ও শরীরের মধ্যকার ক্ষুদ্র পরিবেশকে। সেখানে কতটা উষ্ণতা থাকছে, কতটা থাকছে না সেটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে এই কাপড়।

মূলত, আমাদের শরীর উষ্ণতা গ্রহণ করে ও নিঃসরণ করে ইনফ্রারেড রেডিয়েশনের মাধ্যমে। আর তাই এই শক্তিকে ধরে রাখতেই আমরা শীতকালে অনেক কাপড় পরিধান করি। আবার গরমের দিনে এই শক্তি যাতে বেশি না জমে তাই কম কাপড় পরিধান করি। কিন্তু বর্তমানে ব্যাপারটা ঠিক এতটা সহজ নেই।

আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠলেন ঠান্ডা আবহাওয়ায়, অফিসে যেতে যেতে প্রচন্ড গরম, আবার অফিসে ঢুকেই এয়ার কন্ডিশনের শীতল বাতাসা; বেশ অস্বস্তিকর একটি ব্যাপার। এই পুরো সময়ে যেন মানব শরীর একই রকম তাপমাত্রা পেতে পারে সেটাই নিশ্চিত করবে নতুন এই প্রযুক্তি। এতে জীবন হয়ে উঠবে আরো বেশি আরামদায়ক ও সহজ।

তাপ শুষে নেয় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত; Image Source: advpulse.com

এই কাপড়ে চেষ্টা করা হয়েছে এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের যেটি বুঝতে পারবে কখন একজন মানুষের শরীর গরম হয়ে উঠছে এবং কখন ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। গরম হয়ে গেলে নিজ থেকে ইনফ্রারেড রেডিয়েশন নিঃসরণ করবে। আবার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসলে সেটা পুনরায় তৈরি করবে। এতে একজন মানুষের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ীই কাজ করতে পারবে এই প্রযুক্তি। কীভাবে?

পুরো প্রযুক্তিটিই এর উপরের পর্যায় নির্ভর। এর উপরের পলিমার তন্তুগুলো কার্বন ন্যানোটিউবের একটি পাতলা আস্তরণের আড়ালে থাকবে। যখন পোশাক পরিধানকারী গরম অনুভব করবেন তখন কার্বন ন্যানোটিউবগুলো ছড়িয়ে পড়বে এবং ফাঁকা অংশ দিয়ে বাতাসকে প্রবেশ করার জায়গা করে দেবে। অন্যসময় এটি শক্তভাবে একে অন্যের গায়ে আটকে থাকবে এবং বাতাস প্রবেশের স্থান সংকুচিত করে দেবে।

এটি উষ্ণতা শুষে নেওয়ার এই কাজটি ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত করতে সক্ষম। পোশাকটির প্রস্তুতকারকদের মতে, অনেকগুলো কাজের জন্য এবং অনেকগুলো মাসের জন্য এখন তাই শুধু একটি পোশাক কিনে নেওয়াই যথেষ্ট।

নতুন এই প্রযুক্তির বাজারজাতকরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে; Image Source: specialtyfabricsreview.com

সাধারণত, খেলোয়াড়দের জন্য যে পোশাক তৈরি করা হয় সেগুলোতে খেয়াল রাখা হয় যেন সেগুলো বাতাস যাওয়া আসার ব্যাপারটি পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। আর নতুন এই প্রযুক্তিটি শুধু সেটাই করছে না, একই সাথে এটি শরীরের সবরকম আবহাওয়ার চাহিদাকেই মেটাচ্ছে। যেটি কিনা সবার জন্য অনেক বেশি নতুন। বর্তমানে অবশ্য আর অনেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন এমন নতুন কিছু তৈরি করার যেটা বিজ্ঞানীদের নতুন এই আবিষ্কারকেও টেক্কা দিয়ে যাবে।

ব্যাপারটা অবশ্য এত সহজ কিছু নয়। এমন কোনো কাপড় তৈরি করা যেটা শীতে আরাম দেবে, গরমে গায়ে ঘাম ঝরাবে না, সবসময় একটা নিরবিচ্ছিন্ন তাপমাত্রা ধরে রাখবে- এই পুরো ব্যাপারটিকে সত্যি করা তোলা খুব সহজ কাজ নয়। নতুন এই প্রযুক্তির বাজারজাতকরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং আরো নানারকম হিসাব-নিকেশ মিলিয়ে তৈরি কয়েছে নতুন এই কাপড়। তাই এর মূল্যটাও কি সাধারণের হাতের নাগালের বাইরে থাকবে না?

বাজারে এলে অবশ্য বেশ বড় একটা টক্কর দিতে হবে নতুন এই পণ্যকে; Image Source: www.sciencedaily.com

অবশ্য নির্মাতারা এই সম্ভাবনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন। খুব দ্রুতই নিজেদের এই নতুন পণ্য বাজারে আনবেন তারা। আর সেটাও বেশ কম দামে। অন্তত, এই দামে পোশাক কিনে ঠকতে হবে না ক্রেতাদের; এতটুকু আশ্বাস দিয়েছেন তারা। বাজারে এলে অবশ্য বেশ বড় একটা টক্কর দিতে হবে নতুন এই পণ্যকে।

ঘামের ক্ষেত্রে সাহায্যকারী কাপড় যে একেবারে বাজারে নেই তা তো নয়। তবে তাদের প্রযুক্তি কাজটা করে একটু অন্যভাবে যেমন কেউ পিসিএম ব্যবহার করেন কাপড়ে, যেটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর উষ্ণতা বা তাপকে দেহের বাইরে নিঃসরণ করে। সব দিক মানিয়ে চলতে পারলে নতুন এই প্রযুক্তিটি একেবারেই আলাদা কিছু হিসেবে বাজার মাত করে দেবে, সেটা বলে দেওয়াই যায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

কেন অতীতে ছবি তোলার সময় মানুষ হাসত না?

আফ্রিকার প্রভাবশালী পাঁচ সাম্রাজ্য