in

চীনের মহাপ্রাচীর: মানুষের এক অসামান্য সৃষ্টি

চীনের মহাপ্রাচীর কথা কে না শুনেছে! চীনের নাম শুনলেই অনেকের চোখের সামনে প্রথম এই মহাপ্রাচীরের দৃশ্যই ভেসে ওঠে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক চীনের টিকিট কাটে কেবল একবার নিজ চোখে এই অসামান্য আশ্চর্যটিকে দেখতে। এ মহাপ্রাচীর নিয়ে বিভিন্ন কিংবদন্তী ও উপকথারও প্রচলন রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো: চাঁদ থেকে নাকি পৃথিবীর এই একটি জিনিসেরই দেখা মেলে! যদিও তা নিছকই অতিকথন বৈ আর কিছু নয়, তবু এ মহাপ্রাচীর সম্পর্কে এমন অনেক তথ্যই রয়েছে যা হয়তো আপনাদের অজানা। তাহলে চলুন, জেনে নেয়া যাক চীনের মহাপ্রাচীরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

চীনের মহাপ্রাচীর; Image Source: The Jakarta Post

চীনের মহাপ্রাচীর কী?

এটি মূলত একটি দেয়াল, কিংবা বলা যায় পাথর ও মাটি দিয়ে তৈরি দীর্ঘ প্রাচীর সারি, যা তৈরি হয়েছে চীনের উত্তর সীমানার প্রতিরক্ষার জন্য। মিং সাম্রাজ্য কর্তৃক নির্মিত এ মহাপ্রাচীরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫,৫০০ মাইলের মতো। এছাড়া যদি আপনারা অন্য সকল চীনা সাম্রাজ্য কর্তৃক নির্মিত অংশগুলো সমেত গণনা করতে চান, এবং সাথে নিতে চান এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখাকেও, তাহলে মহাপ্রাচীরটির দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে ১৩,১৭১ মাইলে! তাহলে এখন বুঝতে পারছেন তো, কেন এটির নাম মহাপ্রাচীর তথা “দ্য গ্রেট ওয়াল”?

এ মহাপ্রাচীর নির্মিত হয়েছে কেন?

এ মহাপ্রাচীরটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো চীনের উত্তরাঞ্চলকে মঙ্গলদের আক্রমণের হাত থেকে থেকে রক্ষা করা। ছোট ছোট বিভিন্ন প্রাচীর অতীতে বিভিন্ন সময়ই নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু চীনের প্রথম সম্রাট, কিন শি হুয়াঙ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি উত্তরাঞ্চলের সীমান্তকে রক্ষা করার জন্য কেবল একটি দৈত্যাকার প্রাচীর তৈরি করবেন। তিনিই নির্দেশ দেন একটি একক ও শক্তিশালী প্রাচীর নির্মাণের, যেটির সাথে থাকবে হাজার হাজার পর্যবেক্ষণ চৌকিও (লুক-আউট টাওয়ার), যার মাধ্যমে তার সৈন্যরা বহিঃশক্তিদের আক্রমণের প্রচেষ্টার দিকে লক্ষ্য রাখতে, এবং তার সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে পারবে।

১৩ হাজারের বেশি দৈর্ঘ্য এ প্রাচীরের; Image Source: Travel China Guide

কে নির্মাণ করেন মহাপ্রাচীনটি?

যেমনটি আগেই বলেছি, প্রকৃত মহাপ্রাচীরটির নির্মাণকাজ শুরু হয় কিন রাজবংশের আমলে। তবে তারাই এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ করে যেতে পারেনি। পরবর্তী রাজবংশগুলোতেও এ কাজ অব্যাহত থাকে। কিন্তু মিং রাজবংশ এসে পুরো মহাপ্রাচীরটিরই পুনঃনির্মাণের কাজ শুরু করে। আজ আমরা যে মহাপ্রাচীরটিকে চিনি, তার অধিকাংশই মিং রাজবংশের শাসনামলে নির্মিত।

এ মহাপ্রাচীর নির্মাণের কাজে কিন্তু সাধারণ রাজমিস্ত্রীদের নিয়োগ দেয়া হয়নি। প্রাচীরটি নির্মিত হয়েছে কৃষকশ্রেণী, দাস, অপরাধী এবং সেই সকল লোকের হাতে, যাদেরকে সম্রাটরা শাস্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এছাড়া সৈন্যরাও নিযুক্ত ছিল প্রাচীর নির্মাণ ও সার্বিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের কাজে।

কয়েক মিলিয়ন মানুষ কাজ করেছিল এ প্রাচীর নির্মাণে; Image Source: Weebly

ধারণা করা হয়, সমগ্র মহাপ্রাচীরটির নির্মাণকাজ শেষ হতে লেগেছিল এক সহস্রাব্দেরও (১০০০ বছর) বেশি সময়, এবং এ জন্য কয়েক মিলিয়ন মানুষ কাজ করেছিল। কিছু বিজ্ঞানীর মতে, সম্ভবত এক মিলিয়নের মতো মানুষ মারা গিয়েছিল প্রাচীরটি নির্মাণকালে। যারা এ নির্মাণকাজের সাথে জড়িত ছিল, তাদের সাথে মোটেই সদাচরণ করা হতো না। এমনকি বহু মানুষ তো মারা গেলে তাদেরকে এ প্রাচীরের নিচেই কবর দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কী কী উপাদান দিয়ে নির্মিত হয়েছে মহাপ্রাচীরটি?

সাধারণত তখনকার দিনে হাতের কাছে যা যা উপাদান-উপকরণ পাওয়া যেত, সেগুলো দিয়েই চলত প্রাচীরের নির্মাণকাজ। শুরুর দিকে নির্মাণকাজে বড় বড় পাথরের চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া হতো মাটি, ধূলাবালি, আবর্জনা ইত্যাদি। তবে মিং রাজবংশের শাসনামলের শেষ দিকে প্রাচীরের অধিকাংশই নির্মিত হয়েছিল ইট দিয়ে।

এটি কি ছিল কেবলই একটি প্রাচীর?

প্রকৃতপক্ষে, একক ও দৈত্যাকার প্রাচীরটি ছিল চীনের উত্তর সীমান্ত প্রতিরক্ষার নিমিত্তে নির্মিত একটি দুর্গ। এটি কেবল নামেই একটি প্রাচীর ছিল। কিন্তু সেই সাথে এর কিছুদূর পর পর পর্যবেক্ষণ চৌকি তো ছিলই, সেই সাথে ছিল সংকেত প্রেরণকারী চৌকিও (বেকন টাওয়ার)। সেই সাথে প্রাচীরে কর্মরত সৈন্যদের বাসস্থানের জন্য ছিল বিভিন্ন ব্ল্যাকহাউজের ব্যবস্থাও।

প্রধানত প্রাচীর ও চৌকিগুলো প্রহরার জন্য সৈন্য নিযুক্ত করা হতো। এছাড়া কিছুদূর পর পর প্রাচীরের অদূরে বিভিন্ন শহরও গড়ে তোলা হতো, যেন হঠাৎ করে প্রাচীর শত্রুদের আক্রমণের সম্মুখীন হলে সেখান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে সৈন্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়। অনেকেরই ধারণা, মিং সাম্রাজ্যের সূর্য যখন মধ্য গগণে, তখন প্রাচীরটি প্রহরার জন্য এক মিলিয়নের বেশি সৈন্য নিযুক্ত করা হতো।

প্রাচীরের চেয়েও বেশি কিছু ছিল এ মহাপ্রাচীর; Image Source: Travel + Leisure

চীনের মহাপ্রাচীর সম্পর্কিত কিছু চমকপ্রদ তথ্য

  • মহাপ্রাচীরের বিভিন্ন স্থানে মোট ৭ হাজারেরও বেশি পর্যবেক্ষণ চৌকি রয়েছে।
  • বর্তমানে মহাপ্রাচীরের অধিকাংশ অংশই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, এবং এর ফলে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য ও স্মৃতি বিলুপ্তির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। তবে বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রাচীরটিকে, এবং তার ইতিহাসকে, বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।
  • মহাপ্রাচীরের সব জায়গার উচ্চতা ও প্রস্থ কিন্তু সমান নয়। তবে এ মুহূর্তে আমরা মিং সাম্রাজ্যের রেখে যাওয়া যে প্রাচীরটি দেখতে পাই, সেটির গড় উচ্চতা ৩৩ ফুট লম্বা এবং প্রস্থ ১৫ ফুট চওড়া।
  • বলাই বাহুল্য, এটি এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট স্থাপত্যকর্ম।
  • মহাপ্রাচীরের বাইরের দিকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অংশে পরীখা খনন করে রাখা হতো, যাতে করে শত্রুদের পক্ষে আক্রমণ করা আরো দুরূহ ও দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে উঠত।
  • কোনো আক্রমণ হলে তা জানান দেয়ার জন্য ধূম্র সংকেত ব্যবহার করা হতো। যত বেশি শত্রু আক্রমণ করত, তত বেশি ধোঁয়া বের করে সংকেত প্রদান করা হতো। তাই শত্রুর পরিমাণ বুঝে নতুন সৈন্য সরবরাহ করা যেত।

পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি এটি; Image Source: Wallpaper Cave

  • এটি পৃথিবীর নতুন সপ্তম আশ্চর্যের অন্তর্ভুক্ত।
  • অনেকেই মনে করে মহাপ্রাচীরটিকে নাকি চাঁদ থেকে খালি চোখেই দেখা যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটি নিছকই একটি কিংবদন্তী।
  • ঠেলাগাড়ি হলো চীনাদের আবিষ্কার, এবং এ মহাপ্রাচীর নির্মাণের সময় কাঁচামাল পরিবহণের ক্ষেত্রেও ঠেলাগাড়ি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।
  • প্রাচীরটি নির্মাণের সময় উঁচু-নিচু সব ধরনের ভূখণ্ডের উপরই স্থাপত্য কাঠামো নির্মিত হয়েছে, এমনকি বাদ যায়নি পাহাড়-পর্বতও। প্রাচীরটির সর্বোচ্চ জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার ফুটেরও বেশি উঁচুতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

যেভাবে এল বাবা দিবস

ক্রিকেট খেলায় ব্যবহৃত যত অত্যাধুনিক প্রযুক্তি