in

বাংলাদেশের সাথে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক

২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কার সরকার যখন চীনের হাতে ৯৯ বছরের জন্য হাম্বানটোটা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে বাধ্য হলো, তারপর থেকেই বেড়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট অর্থনীতির দেশগুলোতে চীনের উপস্থিতি নিয়ে চিন্তা ও আশংকা। অনেক বিশেষজ্ঞেরই অভিমত, শ্রীলংকাসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের বৃহত্তর অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের মাধ্যমে, এ দেশগুলোকে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় “ঋণের ফাঁদে” ফেলতে চাইছে চীন।

দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর সাথে চীনের সাথে রয়েছে বহুমাত্রিক সম্পর্ক। একদিকে ভুটানের সাথে যেমন তাদের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কই নেই, অন্যদিকে বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলংকার সাথে তাদের রয়েছে খুবই গভীর সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্রতর দেশগুলোর সাথে চীনের সম্পর্কের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন সিএনএ-র স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি অ্যানালাইসিস প্রোগ্রামের পরিচালক নিলান্তি সমরনায়ক।

হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে চীন; Image Source: China Daily

এখানে “ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি”-র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশটুকু।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

বাংলাদেশকে কোনোভাবেই একটি ছোট দেশ বলা যায় না। অন্তত জনসংখ্যার বিচারে তো নয়ই। বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ এটি। কিন্তু বিচার্য যদি হয় ভারতের সাথে সামঞ্জস্যহীন সম্পর্ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর সাথে সাদৃশ্য, তবে এটিকে একটি “ক্ষুদ্রতর” রাষ্ট্র হিসেবেই গণ্য করতে হবে।

১৯৭১ সালকে ব্যতিক্রম ধরলে – যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল চীনের মিত্র পাকিস্তানের থেকে – বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ক সব সময়ই ছিল বেশ ইতিবাচক। ঢাকার সাথে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও সামরিক বন্ধন ক্রমশ মজবুত হয়ে চলেছে। যদিও অর্থনৈতিক দিক থেকে শ্রীলংকার সাথে চীনের সম্পর্ক সবচেয়ে প্রোথিত, কিন্তু সামরিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাথেই তাদের ঘনিষ্ঠতা সবচেয়ে বেশি জোরালো।

শেখ হাসিনা ও শি জিংপিং; Image Source: The Asian Age

অর্থনৈতিক সম্পর্ক

স্বাধীনতার পর থেকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে সফলতার দরুণ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের কাছে বাংলাদেশ বরাবরই “সাফল্যের আদর্শ”। তৈরি পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ, এবং এটিই দেশটির বৃহত্তম রপ্তানি দ্রব্য।

বাংলাদেশের জন্য চীন আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস, এবং তাদের সামগ্রিক আমদানির সিকিভাগই আসে চীন থেকে। কিন্তু রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশী পণ্যের প্রধান গন্তব্য, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থই ত্বরান্বিত করছে দেশটির অর্থনীতিকে।

প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগে, বাংলাদেশ বিভিন্ন সহযোগীর কাছ থেকে বিনিয়োগ লাভ করে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে চীনও। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সময়কালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান তিন সহযোগী ছিল মিশর, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া। হংকং (চীন) থেকে আসা বিনিয়োগ ছিল তালিকার চতুর্থ অবস্থানে, আর চীনা মূলভূমি ছিল এ তালিকার দশম। তবে হংকং ও চীনা মূলভূমির মোট বিনিয়োগকে একত্র করলে, মিশর ও সিঙ্গাপুরের পর তৃতীয় অবস্থানেই (৬০১.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ছিল চীন।

বিনিয়োগ সহযোগিতা ছাড়াও, বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ বিভিন্ন সহযোগীর কাছ থেকে অনুদান ও ঋণ গ্রহণ করেছে। উল্লেখযোগ্য যে, ২০০৭ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত সিংহভাগ অনুদান ও ঋণের উৎসই ছিল ভারত, এবং পরের দুইটি অবস্থান যথাক্রমে রাশিয়া ও চীনের দখলে। চীনের কাছ থেকে এ সময়কালের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে মোট ৩৫৮.৪ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ২১৭.৭ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে, আর অবশিষ্ট ১৪০.৭ মিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের অংশ হিসেবে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের অবদান আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশেও রয়েছে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ; Image Source: The Daily Star

২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরে আসেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং। এটি ছিল ১৯৮৬ সালের পর প্রথম বাংলাদেশে কোনো চীনা রাষ্ট্রপ্রধানের আগমন। এ সময় তিনি মোট ২৭টি উন্নয়ন প্রকল্পে বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদানের প্রস্তাব দেন। অবশ্য এই বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রকাশিত সর্বশেষ উপাত্ত থেকে জানা যায়, সেবার শি জিংপিংয়ের সফরে কেবল তিনটি প্রকল্পের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মূল্যমান ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মাত্র।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় অন্যান্য প্রকল্পগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা লাভের জন্য চীনের সাথে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রকল্পে শক্তি ও অবকাঠামোর পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতেও জোর দেয়া হচ্ছে।

ঢাকা বর্তমানে বেশ ভালোভাবেই অবগত রয়েছে চীনের তথাকথিত “ঋণের ফাঁদ” সম্পর্কে। তাছাড়া অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশ, বিশেষত শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা থেকেও তারা শিক্ষা অর্জন করেছে। তাই আশা করা যেতে পারে যে, ঋণের ফাঁদ, বিশেষ করে চীনের পাতা ঋণের ফাঁদ বাংলাদেশের জন্য খুব একটা চিন্তার কারণ হতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে, সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী মাত্র দুইটি দেশ ঋণ দৈন্যের আশঙ্কা থেকে সুরক্ষিত, যার মধ্যে বাংলাদেশ একটি।

অবশ্য এ কথাও অনস্বীকার্য যে, ইতিপূর্বে বাংলাদেশ আর্থিক অনুদান থেকে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা লাভ করে এসেছে, ভবিষ্যতে আর তা পাবে না। এর কারণ, প্রথমত, ২০১৫ সালে দেশটির বিশ্বব্যাংকের চোখে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় উত্তরণ ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, দেশটি জাতিসংঘের চাহিদা অনুযায়ী ২০২৪ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে আসার যোগ্যতাও অর্জন করেছে।

বাংলাদেশ এখন নিম্ন-মধ্য্যম আয়ের দেশ; Image Source: Dhaka Tribune

যদিও এ বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবেই বেশ ইতিবাচক, কিন্তু তারপরও, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকা যতই সামনের দিকে এগিয়ে যাক না কেন, অনাগত ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিবেশ বাংলাদেশের জন্য ক্রমশ প্রতিকূল হয়ে উঠতে থাকবে। বাংলাদেশের অবস্থা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অনেকটা মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার মতো, যাদেরও অর্থনৈতিক অগ্রসরতা ও মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণের পর বৈদেশিক সাহায্যের উৎস সীমিত হয়ে এসেছিল।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে যখন অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা কমে যায়, তখন এ ধরনের সরকারগুলো আর্থিক অনুদান ও ঋণের জন্য অন্য কোথাও হাত বাড়ায়। সেরকম একটি “বিপদের বন্ধু” হলো চীন, যারা প্রায়সই চড়া সুদে ঋণ প্রদান করে থাকে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এরকম অবস্থা হতে পারে সঙ্গিন, কেননা তারা স্বীকার করে যে বহিরাগত ঋণ তাদের জিডিপির অংশ হিসেবে ২০০৯ সালের পর থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে, এবং এখন তাদেরকে সজাগ হতে হবে ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরাও শ্রীলংকার অভিজ্ঞতার পর থেকে খুবই সচেতন হয়ে উঠেছে, এবং তারা ক্রমাগত চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীন বিনিয়োগগুলোর সম্ভাব্য প্রভাবের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে চলেছে।

চীনের থেকে দুইটি মিং-ক্লাস সাবমেরিন কিনেছে বাংলাদেশ; Image Source: Dhaka Tribune

সামরিক সম্পর্ক

ঐতিহাসিক নানা চড়াই উৎরাইয়ের কারণে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্তর্ভুক্ত নয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দিকগুলো। অপরদিকে চীন এ খাতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন সময় স্বেচ্ছায় নানা সাহায্য করে এসেছে, এবং বহু বছর ধরে তারাই বাংলাদেশে সমরাস্ত্রের সবচেয়ে বড় যোগানদাতা।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উপাত্ত বলছে, বিগত দুই দশকে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র ক্রয় করেছে, যা অন্য যেকোনো দক্ষিণ এশীয় দেশের থেকে বেশি। তাছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন বাংলাদেশকে সমরাস্ত্র দেয়ও অন্য যেকোনো যোগানদাতার চেয়ে অনেক কম মূল্যে।

২০১৬-১৭ সালে বাংলাদেশ একটি মাইলফলক অর্জন করে, যখন তারা চীনের থেকে ক্রয় করে দুইটি মিং-ক্লাস সাবমেরিন। যদিও মিং-ক্লাস একটি অপেক্ষাকৃত পুরনো প্ল্যাটফর্ম, কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য, যারা সবে সাবমেরিন পরিচালনা করতে শিখছে, এটি খুবই কার্যকরী। বাংলাদেশ যে এ ধরনের জলযান কিনতে পারছে, এ থেকেও প্রতিফলিত হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামরিক বাহিনীকে উচ্চমানের সমরাস্ত্রের অধিকারী করে তোলার ব্যাপারে বেইজিংয়ের সাগ্রহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনের যে দিকটি আজো রহস্যাবৃত

উত্তাল ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন