in

বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব ও নববর্ষের সূচনা

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ। যে উৎসবের নাম এলেই বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির স্মৃতি কড়া নাড়ে মনের দরজায় তা বাংলা নববর্ষ। বাঙালি তার নিজস্ব রীতিতে বরণ করে নেয় বাংলা পঞ্জিকার নতুন বছরকে। বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন আর চৈত্র – বারোটি মাস নিয়ে সাজানো বাংলা সনের আছে সুপ্রাচীন ইতিহাস। বাঙালির এই বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দের ইতিহাস বিষয়েই আলোকপাত করব আজ।

বিশেষজ্ঞদের মতে সমাজ বিকাশের ধারাবাহিক ইতিহাসের মধ্যদিয়ে একটি উন্নত পর্যায়ে এসেই কোনো জাতির নববর্ষ উৎসব ও তার পঞ্জিকার উদ্ভব ঘটে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের দিক থেকে বাংলা বর্ষবরণ ও বাঙালির বর্ষপঞ্জি উদ্ভাবনের ইতিহাস অন্যান্য সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত প্রক্রিয়ারই পরিচয় বহন করে।

সৌর পঞ্জিকা; Image Source: Kalerkantho

বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত সৌর পঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। সূর্যোদয়ের সাথে যেখানে সৌরদিন গণনা করা হয়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে আসতে যে ৩৬৫ দিন কয়েক ঘন্টা সময় প্রয়োজন হয় সে সময়কেই এক সৌর বছর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আকাশে রাশি মন্ডলিতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতেই মূলত মাসের হিসাব করা হয়ে থাকে।

নক্ষত্রমণ্ডলে চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের উপর নির্ভর করে বাংলা সনের মাসের নামকরণ করা হয়েছে। জোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ ‘সূর্যসিদ্ধান্ত’ অনুযায়ী যথাক্রমে বিশাখা, জ্যৈষ্ঠা, উত্তরাষাঢ়া, শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদ, অশ্বিণী, কৃত্তিকা, মৃগশিরা, পুষ্যা, মঘা, উত্তরফাল্গুনী ও চিত্রা নামক নক্ষত্রসমূহের নাম অনুযায়ী বারো মাসের নামকরণ হয়েছে। সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণ হয়েছে তারামন্ডলের উপর ভিত্তি করে।

সম্রাট আকবর ও তার নবরত্নসভা; Image Source: Alor Kafela

বাংলা সনের সূচনা সম্পর্কে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের নানা মত রয়েছে। বাংলা, বিহারের বেশীরভাগ ঐতিহাসিকের মতে বাংলা সনের উদ্ভাবক সম্রাট আকবর। ইসলামি শাসনামলে চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে সকল কাজকর্ম পরিচালিত হত। চান্দ্র বছর সৌর বছরের চেয়ে ১১-১২ দিন কম হওয়ায় এতে ঋতুর আবর্তন ঠিক থাকে না। কিন্তু বঙ্গদেশে চাষাবাদ ও অন্যান্য প্রধান কার্যক্রম ঋতুনির্ভর ছিল। যে কারণে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে সকল কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হচ্ছিলো না।

আইন-ই-আকবরি থেকে জানা যায় ষোড়শ শতাব্দীর দিকে সম্রাট আকবর এমন একটি ত্রুটিপূর্ণ সৌর সনের উদ্ভব করতে চেয়েছিলেন যা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্য আদর্শ হবে। যে সনের মাধ্যমে ফসল ফলানো ও প্রজাদের খাজনা দেয়ার সময়ের সুব্যবস্থাপনা করা যাবে। তাঁর নবরত্নসভার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজিকে নির্দেশ দেওয়া হয় এ কাজ বাস্তবায়ন করার। তিনি চান্দ্র ও সৌর বৈশিষ্ট্যে সমন্বিত আঞ্চলিক সনের কাঠামো নির্দেশ করে দেন।

পরবর্তীতে সে কাঠামো-সূত্র অবলম্বন করে আঞ্চলিক অধিপতিরা উড়িষ্যার আমলি সন, বিলায়েতি সন, সুরাসানি সনের মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক সন চালু করেন। এগুলোকে বলা হত ফসলি সন। শামসুজ্জামান খানের মতে, মুঘল আমলে বাংলার গর্ভনর মুর্শিদ কুলি খান এ রীতি অবলম্বন করে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তৎকালীন কেন্দ্রিয় ইলাহি সন ও হিজরী সন থেকে বঙ্গাব্দ ছিল ভিন্ন ও স্বকীয় একটি পঞ্জিকা।

বাংলা পঞ্জিকা; Image Source: Bangladesh Pratidin

কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে আকবরেরও আগে ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলার সুলতান আলা-উদ্‌-দীন হুসাইন শাহের আমলে বাংলা সনের প্রচলন হয়। আবার অনেকের মতে প্রাচীন বঙ্গদেশীয় রাজা শশাঙ্ক কতৃক চালু হয় বঙ্গাব্দ। সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে রাজা ছিলেন শশাঙ্ক। সে সময়ে নির্মিত দুটি শিব মন্দিরে বঙ্গাব্দ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। তা থেকে ধারণা করা হয় অনেক আগেই রাজা শশাঙ্ক বাংলা সনের প্রচলন করেছিলেন।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কতৃক সংস্কারকৃত নিয়মে বাংলাদেশে বাংলা সনের প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনে ও বাকি মাসগুলো ৩০ দিনে হিসাব করা হত। প্রতি চার বছর পরপর অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে হিসাব করার নিয়ম ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলা একাডেমির সংস্কারকৃত নিয়মে বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস ৩১ দিনে, কার্তিক থেকে মাঘ এবং চৈত্র মাস ৩০ দিনে ও ফাল্গুন ২৯ দিনে গণনা করা হয়। প্রতি অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩০ দিনে হিসাব করা হবে। বাংলাদেশের জাতীয় ঐতিহাসিক দিন গুলোর গ্রেগরিয়ান ও বাংলা বর্ষপঞ্জির তারিখে সমন্বয় আনতেই এ সংস্কার করা হয়।

চারুকলায় নববর্ষের প্রস্তুতি; Image Source: Sundarban Samachar

বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির সংস্কারকৃত নিয়ম অনুযায়ী বাংলা নববর্ষ অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ পালন করা হয় প্রতি বছর গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা অনুযায়ী এপ্রিলের ১৪ তারিখে। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তা উদযাপন করা হয় সনাতন বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। যা পাশ্চাত্য রীতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট নয়। ভারতের সমস্ত বঙ্গভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলে সনাতন নিরয়ণ বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা হয়। উভয় বর্ষপঞ্জির সময়ে গাণিতিক পার্থক্যের কারণে দুই দেশে প্রচলিত মাসের দৈর্ঘ্যে তারতম্য রয়েছে। সার্বজনীন প্রচলিত পঞ্জিকা গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি থেকে ৫৯৩ বছর পিছিয়ে আছে বঙ্গাব্দ

বাংলা সনের প্রচলন নিয়ে নানা বিতর্কের শেষ না হলেও বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ এই পঞ্জিকা। কৃষিক্ষেত্রে উতপ্রোতভাবে জড়িত বাংলা পঞ্জিকা নাগরিক জীবনে বর্তমানে তেমন প্রভাব বিস্তার না করতে পারলেও এর গুরুত্ব কমেনি একটুও। ধর্মীয় ক্ষেত্রে বাঙালির পূজা-পার্বণ, সামাজিক বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান, আচার পালনের ক্ষেত্রে নির্ভর করা হয় বাংলা পঞ্জিকার উপর। বাঙালির অস্তিত্বের সাথে একাত্ম হয়ে আছে বাংলা পঞ্জিকার ইতিহাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

লালন: এক অচ্ছুতের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠার গল্প

লন্ডন: দুই হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল শিখা