in

আর্মেনিয়ান গণহত্যা: বিংশ শতকের প্রথম হলোকাস্ট

আজ আপনাদের শোনাব ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস অথচ বিস্মৃতপ্রায় এক গণহত্যার আখ্যান। আর্মেনিয়ান গণহত্যা – অটোমান সাম্রাজ্যের তুর্কিদের চালানো এক নির্মম হত্যাযজ্ঞের নাম। ১৯১৫ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে, তুর্কি সরকার আর্মেনিয়ানদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার এক ভয়াবহ অভিযান শুরু করে। ১৯২০’র দশকের শুরুর দিকে যখন তারা এ অভিযান থামায়, ততদিনে মৃত আর্মেনিয়ানের সংখ্যা ৬ লক্ষ থেকে ১৫ লক্ষের ভিতর। এছাড়া দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে আরো লক্ষ লক্ষ আর্মেনিয়ান।

আজকের দিনে অধিকাংশ নিরপেক্ষ ইতিহাসবিদই এ ঘটনাকে একটি গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তাদের মতে এটি একটি পূর্ব-পরিকল্পিত ও নিয়মানুগ হত্যাযজ্ঞ, যার মাধ্যমে তুর্কিরা চেয়েছিল একটি গোটা জাতিকে পৃথিবীর বুক থেকে হাপিস করে দিতে।

তুর্কি সরকারের উদ্দেশ্য ছিল আর্মেনিয়ানদের পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া; Image Source: Wikimedia Commons

প্রেক্ষাপট

আর্মেনিয়ান মানুষরা ইউরেশিয়ার ককেশাস অঞ্চলকে তাদের বাসস্থান বানিয়ে এসেছে প্রায় ৩,০০০ বছর ধরে। এর মধ্যে কিছু সময় আর্মেনিয়ান সাম্রাজ্য ছিল স্বাধীন, তাদের একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ছিল। উদাহরণস্বরূপ, চতুর্থ শতক থেকে শুরু করে, আর্মেনিয়ানরাই ছিল খ্রিস্টান ধর্মকে নিজেদের আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসেবে ঘোষণা দেয়া পৃথিবীর প্রথম জাতি।

কিন্তু অধিকাংশ সময়ই, এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরেছে। অবশেষে পঞ্চদশ শতকে আর্মেনিয়া পরিণত হয় শক্তিশালী অটোমান সাম্রাজ্যের একটি অংশে।

তাদের অধিকাংশ প্রজার মতোই, অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনকর্তারাও সকলে ছিল মুসলিম। আর্মেনিয়ানদের তারা নিজ ধর্ম পালনের মাধ্যমে আংশিক স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখার অনুমতি দিয়েছিল বটে; কিন্তু আর্মেনিয়ানদের মধ্যেই যাদেরকে তারা নাস্তিক বা অবিশ্বাসী বলে মনে করত, তাদের প্রতি নানা বৈষম্য ও অবিচার করত।

এছাড়া সামগ্রিকভাবেই মুসলিমদের চেয়ে খ্রিস্টানদের উপর শাসক মহলের কড়াকড়ির মাত্রা একটু যেন বেশিই ছিল। মুসলিমদের তুলনায় খ্রিস্টানদের উপর ধার্যকৃত করের পরিমাণ বেশ অনেকটাই বেশি ছিল, অথচ রাজনৈতিক ও আইনগত অধিকারের ক্ষেত্রে তাদের জন্য বরাদ্দ থাকত খুবই সামান্য।

২০১৫ সালে শতবছর পূর্ণ হয়েছে আর্মেনিয়ান গণহত্যার; Image Source: wbur.org

এই এত ধরনের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, অটোমান শাসনের অধীনে আর্মেনিয়ানরা বেশ ভালোই উন্নতি করছিল। শিক্ষাদীক্ষা থেকে শুরু করে ধনসম্পদ, সবকিছুতেই তুর্কি প্রতিবেশীদের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল আর্মেনিয়ানরা।

আর্মেনিয়ানদের এ ক্রমোন্নতি তাদেরকে তুর্কিদের চক্ষুশূলে পরিণত করে। বিদ্বেষ এক পর্যায়ে সন্দেহে গিয়ে ঠেকে। তুর্কিরা মনে করতে থাকে, খ্রিস্টান আর্মেনিয়ানরা হয়তো অটোমান খলিফাদের চেয়ে খ্রিস্টান সরকারের প্রতিই বেশি আনুগত্য দেখাবে, বিশেষত তুরস্কের পাশেই যেহেতু রয়েছে রাশিয়ার সীমান্ত।

অটোমান সাম্রাজ্যের ভিত যখন টলে যায়, সাম্রাজ্যটি ভেঙে টুকরো টুকরো হবার উপক্রম হয়, তখন আর্মেনিয়ানদের প্রতি তাদের ক্রোধের মাত্রাও যেন বহুগুণে বেড়ে যায়। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে, তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ আনুগত্য লাভের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। আর্মেনিয়ানরা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লাভের আশায় আন্দোলন শুরু করলে, ক্রুদ্ধ সুলতান সাফ জানিয়ে দেন, আর্মেনিয়ান সমস্যার তিনি “চিরস্থায়ী সমাধান” করে দিতে চলেছেন। ১৮৯০ সালে এক প্রতিবেদককে তিনি জানান, খুব শীঘ্রই আর্মেনিয়ানদের দফারফা করে দেবেন।

প্রথম আর্মেনিয়ান গণহত্যা

আর্মেনিয়ানদের আন্দোলন যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, তখন তুর্কি শাসকরাও নেয় এক চরম পদক্ষেপ। তাদের নির্দেশে তুর্কি সামরিক নেতা, সৈন্য থেকে শুরু করে সাধারণ জনতা, সকলে একাট্টা হয়ে আর্মেনিয়ান গ্রাম ও শহরগুলো আক্রমণ করতে থাকে, এবং নির্মমভাবে আর্মেনিয়ান নাগরিকদের হত্যা করতে থাকে। এভাবে লক্ষ লক্ষ আর্মেনিয়ানের মৃত্যু ঘটে।

তরুণ তুর্কি

১৯০৮ সালে একটি নতুন সরকার আসে তুরস্কের ক্ষমতায়। এক দল সংস্কারবাদী নিজেদের “তরুণ তুর্কি” পরিচয় দেয়, এবং তারাই সুলতান আবদুল হামিদকে সরিয়ে ক্ষমতার দখল নিয়ে অপেক্ষাকৃত আধুনিক ও সাংবিধানিক একটি সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

গণহত্যার পেছনে দায়ী ছিল তরুণ তুর্কিরা; Image Source: Wikimedia Commons

শুরুতে আর্মেনিয়ানরা বেশ আশাবাদী ছিল যে এবার হয়তো নতুন রাষ্ট্রে তারা সমানাধিকার লাভ করবে। কিন্তু শীঘ্রই তাদের বোধোদয় হয় যে, আর্মেনিয়ান প্রশ্নে তরুণ তুর্কিরাও তাদের পূর্বসূরীদের থেকে খুব একটা ব্যতিক্রম কিছু নয়। অতিমাত্রিক জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় আচ্ছন্ন তরুণ তুর্কিদের লক্ষ্য ছিল একটিই, তা হলো তাদের সাম্রাজ্যের “তুর্কিকরণ”। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সকল অ-তুর্কি, বিশেষত খ্রিস্টান অ-তুর্কিরা ছিল তাদের নতুন রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা

১৯১৪ সালে জার্মানি ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের সমর্থনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয় তুর্কিরা। একই সময় অটোমান ধর্মীয় নেতারা তাদের মিত্র বাদে সকল খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে একটি পবিত্র যুদ্ধেরও ডাক দেয়।

এ সময় অনেক তুর্কি সামরিক নেতাই মনে করতে থাকে যে, আর্মেনিয়ানরা বিশ্বাসঘাতক। তাদের মতে, আর্মেনিয়ানরা যদি মনে করে মিত্রশক্তি জয়লাভ করলে তারা স্বাধীনতা পাবে, তাহলে হয়তো তারা শত্রুপক্ষের হয়ে লড়াই করতে শুরু করবে।

বাস্তবিকই, যুদ্ধ যত এগোতে থাকে, আর্মেনিয়ানরা স্বেচ্ছাসেবী ব্যাটেলিয়ন গড়ে তুলতে থাকে ককেশাস অঞ্চলে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রাশিয়ান সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করতে। এই ঘটনা, এবং আগে থেকেই আর্মেনিয়ানদের ব্যাপারে তুর্কিদের সাধারণ সন্দেহ মিলে, তুর্কি সরকার এক চরম সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়। তা হলো: আর্মেনিয়ানদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে।

আর্মেনিয়ান গণহত্যার সূচনা

১৯১৫ সালের ২৪ এপ্রিল শুরু হয় আর্মেনিয়ান গণহত্যা। ওইদিন তুর্কি সরকার কয়েকশো আর্মেনিয়ান বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করে। এরপর তুর্কি সেনারা আর্মেনিয়ান সাধারণ মানুষকে টেনে-হিঁচড়ে তাদের ঘর থেকে বের করতে থাকে এবং কোনো খাবার বা পানি ছাড়াই মেসোপটেমিয়ান মরুভূমিতে পাঠাতে থাকে।

মৃত্যুর মিছিলের মানুষগুলোর পরনের জামাকাপড় তারা খুলে নিতে থাকে, এবং প্রখর রোদের মধ্যে তাদেরকে হাঁটতে বাধ্য করে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা মারা যায়। কেউ যদি হাল ছেড়ে দিয়ে থেমে যায়, তাহলে তাকে তৎক্ষণাৎ গুলি করে হত্যা করা হয়।

মেসোপটেমিয়ান মরুভূমির উদ্দেশে মৃত্যুর মিছিল; Image Source: Wikimedia Commons

একই সময় তরুণ তুর্কিরা নতুন একটি বিশেষ সংস্থার সৃষ্টি করে, যারা আবার “কিলিং স্কোয়াড” বা “বুচার ব্যাটেলিয়ন” নামে নতুন একটি সংস্থার জন্ম দেয়। এক অফিসারের ভাষ্যমতে, এই সংস্থাটির উদ্দেশ্য ছিল “খ্রিস্টান উপকরণের তরলীকরণ”।

এই কিলিং স্কোয়াডগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গড়ে তোলা হতে থাকে খুনী বা প্রাক্তন অভিযুক্তদের সমন্বয়ে। তারা আর্মেনিয়ানদের নদীর পানিতে ডুবিয়ে মারা, পাহাড়ের চূড়া থেকে ছুঁড়ে ফেলা, ক্রুশবিদ্ধ করা, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা ইত্যাদি নৃশংস সব পথে হাঁটতে থাকে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই, আর্মেনিয়ান গ্রাম ও শহরগুলো পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে মৃত মানুষের লাশের স্তূপে।

এছাড়া পুরনো অনেক নথি থেকে জানা যায়, তুর্কিকরণের অংশ হিসেবে সরকারি দলগুলো অনেক আর্মেনিয়ান শিশুকে অপহরণ করে তাদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে, এবং সেই শিশুগুলোকে বিভিন্ন তুর্কি পরিবারে পাঠিয়ে দেয়। কিছু জায়গায় তারা আর্মেনিয়ান নারীদের ধর্ষণ করে তুর্কি হারেমে যোগ দিতে বা দাসী হয়ে থাকতে বাধ্য করে। আর্মেনিয়ানদের শূন্য গৃহে এসে উঠতে থাকে সাধারণ তুর্কিরা, এবং ধন-সম্পদ ইচ্ছামতো লুটও করে।

যদিও বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে, তবে অধিকাংশ সূত্রই এ তথ্য স্বীকার করে যে গণহত্যার পূর্বে অটোমান সাম্রাজ্যে প্রায় ২০ লক্ষ আর্মেনিয়ানের বাস ছিল। কিন্তু ১৯২২ সালে যখন গণহত্যা শেষ হলো, তখন সেখানে মাত্র ৩,৮৮,০০০ আর্মেনিয়ান অবশিষ্ট ছিল।

পরবর্তী ঘটনাক্রম

১৯১৮ সালে অটোমানরা আত্মসমর্পণ করলে, তরুণ তুর্কির নেতারা জার্মানিতে পালিয়ে যায়। জার্মানি কথা দিয়েছিল, গণহত্যার জন্য তারা কোনো তরুণ তুর্কি নেতার বিচার করবে না। অবশ্য এক দল আর্মেনিয়ান জাতীয়তাবাদী “অপারেশন নেমেসিস” নামে একটি পরিকল্পনা করেছিল। পরিকল্পনাটি ছিল গণহত্যার নেতাদের খুঁজে বের করে হত্যা করার।

সেই থেকে তুর্কি সরকার কখনোই স্বীকার করেনি যে আসলেই এমন একটি গণহত্যা কখনো ঘটেছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা অবশ্য এটুকু স্বীকার করে যে, তখন যুদ্ধ চলছিল এবং সেই যুদ্ধে আর্মেনিয়ানরা ছিল বিরুদ্ধ শক্তি, তাই যুদ্ধের অংশ হিসেবেই তারা কিছু আর্মেনিয়ানকে হত্যা করেছিল।

বর্তমান অবস্থা

আজকের দিনে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের বন্ধু রাষ্ট্র। তাই এসব পশ্চিমা দেশের সরকাররাও বহুদিন আগে ঘটে যাওয়া গণহত্যার ব্যাপারে কথা বলতে আগ্রহী নয়। এমনকি ২০০৪ সালের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদপত্র “নিউ ইয়র্ক টাইমস”-এ আর্মেনিয়ান গণহত্যার উল্লেখও করা হয়নি। তবে অবশেষে ২০১০ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল প্যানেল ভোটের মাধ্যমে এ গণহত্যাকে স্বীকারের সিদ্ধান্ত নেয়। সব মিলিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ৩১টি দেশের সরকার ও সংসদ এ গণহত্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

২০১০ সালে আর্মেনিয়ান গণহত্যাকে স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র; Image Source: The New York Times

কিন্তু তারপরও, তুরস্কে পরিবর্তন এসেছে খুবই কম। আর্মেনিয়ানদের অনবরত চাপ, এবং বিশ্বব্যাপী সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলা মানুষদের নিয়মিত আহবান সত্ত্বেও, আর্মেনিয়ানদের সাথে আসলে কী হয়েছিল তা নিয়ে কথা বলা এখনো তুরস্কে নিষিদ্ধ।

তবে বিশ্ব ইতিহাস বিষয়ে সচেতন অনেকেই এখন আর্মেনিয়ান গণহত্যাকে “আর্মেনিয়ান হলোকাস্ট” কিংবা “বিংশ শতকের প্রথম হলোকাস্ট” হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

মানসা মুসার মহানুভবতায় মিশরের মহাবিপর্যয়

প্রাচীন গ্রিস ও নগর-রাষ্ট্রের উদ্ভব