in

কেমন ছিল প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক পরিবেশ?

ভারত হলো একটি পেনিনসুলা বা উপদ্বীপ – এক খণ্ড ভূমি যা তিন দিক থেকে পানি দ্বারা বেষ্টিত। এর পশ্চিমে রয়েছে আরব সাগর, পূর্বে রয়েছে বঙ্গোপসাগর, এবং পশ্চিমে রয়েছে ভারত মহাসাগর। এছাড়াও ভারত এশিয়ার বাকি অঞ্চলের থেকে বিচ্ছিন্ন উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমে হিমালয় পর্বতমালার মাধ্যমে। হিমালয়ে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টসহ আরো বেশ কয়েকটি অন্যতম সর্বোচ্চ পর্বতসমূহ।

ভারতের ভৌগোলিক অবস্থা খুবই বিচিত্র। এর রয়েছে একাধারে মরুভূমি, পর্বত, বনভূমি, জঙ্গল। এখন আপনাদের সামনে সংক্ষেপে তুলে ধরব, প্রাচীন ভারতের ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে।

পৃথিবীর বুকে অন্যতম সমৃদ্ধ মানবসভ্যতা ছিল প্রাচীন ভারতে; Image Source: Ancient History Encyclopedia

বৃষ্টি ও পানি

প্রাচীন ভারতের মানুষের জীবন অতিমাত্রায় প্রভাবিত ছিল আবহাওয়া দ্বারা। ভারত সাধারণত খুবই উষ্ণ ও শুষ্ক একটি দেশ। কিন্তু মে মাসে এখানে আগমন ঘটে বর্ষা মৌসুমের। বর্ষা মৌসুমে এখানে হয় প্রচুর বৃষ্টিপাত। এ সময় ভারতে এমনকি কয়েক সপ্তাহ বা মাসব্যাপীও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এবং তার ফলে সৃষ্টি হয় বন্যার। অবশ্য এরপরও ভারতের মানুষের কাছে বৃষ্টি আসে আশীর্বাদ হয়ে। কেননা বৃষ্টিই যে দীর্ঘদিন শুষ্ক হয়ে থাকা ফসলি জমিগুলোকে সিক্ত করে তোলে, এবং তাদের উর্বরতা শক্তি ফিরিয়ে আনে। যেসব বছরে বর্ষা মৌসুম আসে না, দেরিতে আসে, কিংবা তেমন একটা জোরালো হয় না, সেসব বছরে ভারত ভোগে প্রবল খরায়।

প্রাচীন ভারতীয়রা তাদের বসতি গড়ে তুলত নদীর ধারে, কিংবা এমন কোনো স্থানে, যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির মজুদ রয়েছে। পশ্চিম ভারতের (বর্তমানে পাকিস্তান) ছিল ইন্দু নদী, আর পূর্ব ভারতের ছিল গঙ্গা নদী। দেশের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকার ছিল হিমালয় পর্বতমালা। পর্বতমালা থেকে বরফ গলে এসে মেটাত এ অঞ্চলের পানির চাহিদা। তাছাড়া পূর্ব ভারত প্রায়ই আরেকটি বর্ষা মৌসুম পেত সেপ্টেম্বর মাসে, যার ফলে মে মাসের পর বছরের এই আরেকটি সময়ও তাদের ফসলি জমি পানি পেত। এ কারণেই ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে পূর্বাংশের মাটি ছিল বেশি উর্বর ও ফসল উৎপাদনের জন্য অধিক উপযোগী।

ভারতীয় ভৌগোলিক পরিবেশের পেছনে বিশেষ অবদান রয়েছে হিমালয়ের; Image Source: Wired

কৃষিকাজ

হরপ্পায় বসবাসরত প্রাচীন ভারতীয়রা চাষ করত গম, তরমুজ, মটর, খেজুর, তিলের বীজ, এবং তুলার। হরপ্পানদেরও বহু সহস্র বছর আগে, যখন মানবসভ্যতা প্রথম হাজির হয়েছিল প্রাচীন ভারতে, তারা আবিষ্কার করেছিল যে ডুমুর ও পেঁয়াজ সদৃশ উদ্ভিদ সেখানে ইতিমধ্যেই জন্মাচ্ছে। এছাড়াও তারা খুঁজে পেয়েছিল আখ, নারকেল, কলা, আম এবং লেবুও; যেগুলো সবই তখন তাদের কাছে একদমই নতুন ও অপরিচিত ঠেকেছিল।

প্রাচীন ভারতীয়রা এর কিছুদিনের মধ্যে আবিষ্কার করেছিল এমন একটি জিনিস, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রাকে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাবিত করবে, এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে তাদের বাণিজ্যের পথ শুধু প্রশস্তই করবে না, তাদেরকে বেশ অনেকটা এগিয়েও রাখবে। কী সেই জিনিস? সেটি হলো মসলা!

ভারতীয় মসলার জয়গান গায় গোটা বিশ্ব; Image Source: Scroll.in

তারা আবিষ্কার করল যে, গোল মরিচ এখানে প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। একই কথা প্রযোগ্য আদা ও দারুচিনির ক্ষেত্রেও। প্রকৃতপক্ষে দারুচিনি হলো ছোট একটি গাছের অন্তঃস্থিত বাকল, যা খাবার সংরক্ষণে সাহায্য তো করেই, পাশাপাশি নিজের স্বাদও অসাধারণ। এভাবেই এটি এক পর্যায়ে হয়ে ওঠে সমগ্র পৃথিবীর কাছে পরম প্রার্থনীয় একটি মসলা।

মিশরীয় থেকে শুরু করে সুদূর ইউরোপের গ্রিক কিংবা রোমানরা সকলেই এক পায়ে খাড়া ছিল বিপুল পরিমাণে অর্থের বিনিময়ে হলেও ভারতীয়দের কাছ থেকে দারুচিনি সংগ্রহ করতে।

এছাড়া ভারতীয়রা কৃষিকাজের অনেক খুঁটিনাটি কলাকৌশল সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছিল তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও। পশ্চিম ভারতের অধিবাসীরা ধান চাষ করত, যা তারা শিখেছিল থাইল্যান্ডের মানুষের কাছ থেকে। আবার উত্তর ভারতীয়রা ভুট্টা চাষ করতে শিখেছিল পূর্ব আফ্রিকানদের থেকে, এবং মসুর ডাল চাষ করতে শিখেছিল পশ্চিম এশিয়ানদের থেকে।

প্রাচীন ভারতের সমৃদ্ধিতে কৃষিকাজের রয়েছে বিশেষ অবদান; Image Source: ENVIS

যখন আর্যরা (কিংবা ইন্দো-ইউরোপীয়রা, অর্থাৎ কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যস্থিত অঞ্চল থেকে আসা মানুষেরা) ভারতে এসেছিল, তারা তাদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল গম ও বার্লি উৎপাদনের অভূতপূর্ব জ্ঞান। এছাড়া সিল্ক রোড তথা চীন থেকে বাণিজ্যের উদ্দেশে পশ্চিমে যাওয়ার পথের বাণিজ্যকরেরা ভারতে নিয়ে এসেছিল পীচ বা জামজাতীয় ফল, যা পরবর্তীতে ভারতীয়রাও জন্মাতে শুরু করেছিল।

এরপর বছরের পর বছর ধরে বণিকরা তাদের সাথে করে বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন উদ্ভিদ ভারতে নিয়ে আসতে শুরু করে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল বর্তমানে আমাদের নিত্যকার অনুষঙ্গ চা-ও। এভাবে নিত্যনতুন চাষযোগ্য ফসল যেমন ভারতীয়দের রুচির পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রাখছিল, তেমনই তাদের উপার্জনের পথ প্রশস্ত করতেও সাহায্য করছিল।

বন্য জীবজন্তু

প্রাচীন ভারতের অনেক বন্য জীবজন্তুই ছিল সাধারণ মানুষের নিকট আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টির কারণ। এমনই একটি জন্তু হলো রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বর্তমানেও ভারতে কিছু পরিমাণ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আছে বটে, কিন্তু অতীতের তুলনায় তা কিছুই না। এদের গায়ের রং হলুদ থেকে হালকা কমলার উপর গাঢ় বাদামী বা কালো রঙের ডোরাকাটা। বাঘেরা একাকী জীবনযাপন করতে পছন্দ করে, এবং প্রতিটি বাঘ একটি বিশাল জায়গা জুড়ে বিচরণ করে। বিড়ালজাতীয় হলেও, আদতে তারা অন্য বিড়ালদের মতো নয়, বরং সাঁতার কাটতে তারা খুব পছন্দ করে!

ভারতীয় সিংহ; Image Source: downtoearth.org.in

প্রাচীন ভারতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য জীব ছিল এশিয়াটিক লায়ন। এরা সমভূমি বা ঘাসজমির উপর বসবাস করে। আফ্রিকার সিংহদের চেয়ে আকার আকৃতিতে খানিকটা ছোট হলে কী হবে, জাতে কিন্তু তারা অভিন্ন। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মতো, এরাও একাকী জীবনযাপনে অভ্যস্ত।

এছাড়াও ভারতের অন্যান্য বন্য জানোয়ারের মধ্যে রয়েছে হাতি, গণ্ডার, কালো ভালুক, জলা মহিষ, বানর, বুনো কুকুর এবং নীল ষাঁড়, যেটি কিনা এশিয়ার বৃহত্তম কৃষ্ণসারমৃগ।

গৃহপালিত জন্তু

প্রায় সকল প্রাচীন সভ্যতার জন্যই গৃহপালিত জন্তু, বিশেষত গবাদি পশু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যতিক্রম নয় প্রাচীন ভারতও। মালবাহী গাড়ি ঠেলে নেয়া থেকে শুরু করে ফসলি জমিতে হাল টানা, সকল ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতো এরা। আর এর পাশাপাশি এদের মূল কাজ যেটি, অর্থাৎ দুধ উৎপাদন করা, তা তো রয়েছেই। এই দুধ দিয়ে প্রাচীন ভারতীয়রা তৈরি করত দই ও পনির। দুধ উৎপাদনের জন্য প্রাচীন ভারতীয়রা অন্য যে জীবটির উপর নির্ভর করত, সেটি হলো জলা মহিষ। পরবর্তীতে প্রাচীন ভারতীয়রা মুরগি, ছাগল ও ভেড়া পালন করতেও শেখে।

পারিয়াহ কুকুর; Image Source: Madras Courier

১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে মুসলিমরা প্রথম ভারতে উট নিয়ে আসে। তখন উট ব্যবহৃত হতো মানুষ ও মালামাল বহনের কাজে। এছাড়া ভারতীয়রা হাতিও ধরে আনত ভারি মালামাল বহন করতে কিংবা যুদ্ধে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। প্রাচীন ভারতের কিছু কিছু সভ্যতায় বিড়াল ও কুকুরের সাথেও মানুষের ছিল বেজায় সখ্য। বিশেষ করে কুকুরকে খুবই গুরুত্ব দেয়া হতো। অনেকের মতেই ভারতীয় পারিয়াহ কুকুর হলো প্রথম গৃহপালিত কুকুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

বিশ্বখ্যাত কাল্পনিক চরিত্রদের ঐতিহাসিক ভিত্তি (প্রথম পর্ব)

মানবসভ্যতার ইতিহাস বদলে দেয়া ১০ উদ্ভাবন