in

প্রাচীন গ্রিস ও নগর-রাষ্ট্রের উদ্ভব

গ্রিক সভ্যতা যে কয়টি বড় যুগ পেরিয়ে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো আর্কেইক প্রাচীন যুগ। ক্লাসিকাল বা ধ্রুপদী যুগের তিন শতক পূর্বে, খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সাল পর্যন্ত ছিল এ যুগের বিস্তার। পৃথিবীর ইতিহাসে সেটি ছিল মোটামুটি বাস্তবধর্মী একটি সময়কাল।

এ সময়টায় গ্রিসের শিল্প, সাহিত্য ও প্রযুক্তিতে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। কিন্তু তারপরও, এ যুগের সবচেয়ে তাৎপর্যময় অনুষঙ্গ ছিল পোলিস বা নগর-রাষ্ট্রের উদ্ভাবন। পরবর্তী শত শত বছর ধরে এসব নগর-রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে গ্রিক রাজনৈতিক জীবনকে সংজ্ঞায়নের সবচেয়ে কার্যকরী চলক।

প্রাচীন যুগেই সৃষ্টি হয় গ্রিসের নগর-রাষ্ট্র; Image Source: The Great Courses Plus

নগর-রাষ্ট্রের জন্ম হলো যেভাবে

গ্রিক সভ্যতায় প্রাচীন যুগের পূর্ববর্তী যুগটি পরিচিত “অন্ধকার যুগ” হিসেবে। এ সময় মানুষজন সমগ্র গ্রিসব্যাপী ছোট ছোট কৃষিভিত্তিক গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করত। গ্রামগুলো যত বড় হতে থাকে, সেই সাথে তাদের ক্রমোন্নতিও সাধিত হয়। কেউ কেউ দেয়াল তুলতে থাকে। আর অধিকাংশই বাজার (আগোরা) ও সাম্প্রদায়িক সাক্ষাতের জায়গা বা মিলন-স্থল তৈরি করে। তারা সৈন্যবাহিনীর জন্ম দেয় এবং কর সংগ্রহ করতে থাকে।

এবং কথিত আছে, প্রতিটি নগর-রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যই একজন দেব বা দেবী থাকতেন, যাদেরকে ওই নগর-রাষ্ট্রের মানুষেরা প্রচণ্ড নিষ্ঠার সাথে সম্মান করত, তাদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিসর্জনও দিত। যেমন এথেন্সের দেবী ছিলেন এথেনা, এমনকি স্পার্টার দেবীও ছিলেন তিনিই।

অধিকাংশ নগর-রাষ্ট্রের নাগরিকরাই কমবেশি একই রকম ছিল, যেমনটি হেরোডোটাস বলেছেন যে, তাদের গবাদি পশু ছিল একই, মুখের ভাষাও ছিল অভিন্ন। তাছাড়া একই দেব-দেবীর মন্দির ভাগ করা থেকে শুরু করে একই ধর্মীয় রীতি ও প্রথা মেনে চলা, বলতে গেলে প্রায় সব দিক থেকেই নগর-রাষ্ট্রের অধিবাসীরা অভিন্ন সত্তা ধারণ ও বহন করত। কিন্তু তারপরও, আদতে প্রতিটি গ্রিক নগর-রাষ্ট্রই ছিল স্বকীয় ও স্বতন্ত্র। সবচেয়ে বড় স্পার্টা প্রায় ৩০০ বর্গমাইলেরও বেশি জায়গা নিয়ন্ত্রণ করত, অন্যদিকে সবচেয়ে ছোট নগর-রাষ্ট্রটিতে ছিল মাত্র শ’খানেক মানুষের বাস।

প্রাচীন গ্রিসের আগোরা; Image Source: Greek Reporter

তবে খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে প্রাচীন যুগের শুরুর দিকে নগর-রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলেছিল। তাদের সকলেরই অর্থনীতির মূল কাঠামো বাণিজ্য নয়, ছিল কৃষি। এ কারণেই, জমি ছিল প্রতিটি নগর-রাষ্ট্রে সম্পদের বৃহত্তম উৎস। এছাড়া প্রায় প্রতিটি নগর-রাষ্ট্রই তাদের পুরুষানুক্রমিক রাজাদের উৎখাত করেছিল, এবং শাসিত হতো গুটিকতক ধনাঢ্য অভিজাতদের দ্বারা।

এই গুটিকতক ধনাঢ্য অভিজাতের দল ক্ষমতার উপর একচেটিয়া প্রভার বিস্তার করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, তারা সাধারণ কোনো মানুষকে কাউন্সিল বা গণ-পরিষদে প্রবেশ ও সেখানে সদস্যপদ লাভের সুযোগ দিত না। তারা এমনকি মনোপলি সৃষ্টি করেছিল সেরা কৃষিজমিগুলোর উপরও। কেউ কেউ তো আরো কাঠি সরেস। নিজেদেরকে তারা ঈশ্বর প্রেরিত দূত হিসেবে দাবি করতে শুরু করে।

অ্যারিস্টটলের মতে, যেহেতু দরিদ্র ব্যক্তি ও তাদের বউ-সন্তানদেরকে ধনীদের দাসত্ব বরণ করে নিতে হয়েছিল, এবং তাদের কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতাই ছিল না, এজন্য অভিজাত ও সাধারণদের মধ্যে দীর্ঘদিন আগে থেকেই একটি দ্বন্দ্বের সূত্রপাত ঘটে।

প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে বড় নগর-রাষ্ট্র ছিল স্পার্টা; Image Source: jeguezaimbo.blogspot.com

উপনিবেশ সৃষ্টি

ধনী ও দরিদ্রের মাঝে উদ্ভূত এই অস্থিরতা দূরীকরণের অন্যতম উপায় ছিল অভিবাসন। জমি ছিল নগর-রাষ্ট্রগুলোতে সম্পদের প্রধানতম উৎস, অথচ সেগুলো পরিমাণগত দিক থেকেও ছিল অতি সীমিত। এজন্য জনসংখ্যা যখন বাড়তে শুরু করে, অনেক মানুষই বাধ্য হয় তাদের নিজেদের অঞ্চল ত্যাগ করে গ্রিস ও অ্যাগানের আশেপাশে জনবিরল বা কম বসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে গিয়ে বাস করতে।

খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালের মধ্যে গ্রিক উপনিবেশগুলো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে এশিয়া মাইনর, আবার উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে কৃষ্ণ সাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতক শেষ হওয়ার পূর্বেই, মোট গ্রিক নগর-রাষ্ট্রের সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় হাজারের অধিক।

তখনকার দিনে এই প্রতিটি ঔপনিবেশিক নগর-রাষ্ট্রই ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম। এদিক থেকে বিবেচনা করলে, প্রতিটি উপনিবেশই ছিল আমাদের বর্তমান চেনাজানা উপনিবেশের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেসব মানুষেরা এসে এসব উপনিবেশ সৃষ্টি করেছিল, তারা তাদের পূর্বতন নগর-রাষ্ট্র দ্বারা শাসিত বা পরিচালিত হতো না, এমনকি তাদের কাছে জবাবদিহি করতেও বাধ্য ছিল না। প্রতিটি নতুন নগর-রাষ্ট্রই ছিল স্বায়ত্তশাসিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ।

টাইরান্টদের উত্থান

যতই সময় এগোতে থাকে, এসব কৃষিভিত্তিক নগর-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনেকেই অন্যান্য ভোক্তা পণ্য যেমন মাটির বাসনকোসন, জামাকাপড়, ওয়াইন, লোহার দ্রব্য প্রভৃতি তৈরি করতে শুরু করে। এসব দ্রবাদির বাণিজ্যের মাধ্যমে অভিজাতরা ছাড়াও সমাজে অনেক নব্য ধনীর আবির্ভাব ঘটে। এসব নব্য ধনীরা অভিজাত বা অলিগার্কদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। নিজেদের মধ্যে ঐক্য তৈরির মাধ্যমে, ভারি অস্ত্রসস্ত্র সমেত পদাতিক সৈন্যবাহিনী (হপলিট) গড়ে তুলে নগর-রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায় তারা নতুন নেতাদের নিয়ে আসে।

উত্থান ঘটে টাইরান্টদের; Image Source: vintage.ponychan.net

এই নতুন নেতারা পরিচিত ছিল টাইরান্ট বা স্বেচ্ছাচারী শাসক হিসেবে। এমন নামকরণের কারণ হলো, নতুন এই শাসকেরা তাদের পূর্বসূরী অলিগার্কদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না, বরং স্বৈরশাসনে কেউ কেউ অতীতের সকল দৃষ্টান্তকেই হার মানিয়েছিল। তবে তাদের এ শাসন ব্যবস্থাও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ক্লাসিকাল বা ধ্রুপদী যুগে সমাজে ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু রাজনৈতিক সংস্কার আসে, যার মাধ্যমে “ডেমোক্রাটিয়া” বা “জনগণের শাসন” নামে নতুন একটি ব্যবস্থা জন্ম নেয়।

আর্কেইক রেনেসাঁ

প্রাচীন যুগের ঔপনিবেশিক অভিবাসন তৎকালীন শিল্প ও সাহিত্যে একটি বড় প্রভাব ফেলেছিল। সভ্যতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ার সাথে সাথে, গ্রিক ঘরানার শিল্প ও সাহিত্যও দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, এবং সব মিলিয়ে একটি সৃজনশীল বিপ্লবের দেখা পাওয়া যায়।

যেমন: আইওনিয়ার কিংবদন্তী কবি হোমার এই প্রাচীন যুগেই ইলিয়াড ও ওডিসির জন্ম দিয়েছিলেন। ভাস্কররা মৃত ব্যক্তিদের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কৌরোই ও কোরাই সৃষ্টি করতে শুরু করেছিলেন। বিজ্ঞানী ও গণিতবিদদেরও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছিল। এ যুগেই অ্যানাক্সিম্যান্ডার অভিকর্ষ বলের একটি তত্ত্বের জন্ম দেন; জেনোফেনস তার আবিষ্কৃত ফসিলের কথা লিপিবদ্ধ করেন, পিথাগোরাস তার বিখ্যাত উপপাদ্য আবিষ্কার করেন।

পিথাগোরাস; Image Source: Greek Reporter

সামগ্রিকভাবে প্রাচীন যুগে গ্রিসের নগর-রাষ্ট্রগুলোয় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রাযুক্তিক ও শৈল্পিক যে অগ্রগতিগুলো হয়েছিল, পরবর্তী শতকগুলোতে তা গ্রিসসহ গোটা বিশ্বকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যেতে ব্যাপক সাহায্য করেছিল। আজ মানুষ হিসেবে আমরা যতটা উন্নতি করেছি, তার পেছনে প্রাচীন গ্রিসের অবদান তাই অনস্বীকার্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

আর্মেনিয়ান গণহত্যা: বিংশ শতকের প্রথম হলোকাস্ট

কিভাবে প্লাস্টিকের জিনিসের জীবাণু দূর করবেন?