in

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (পর্ব ৩)

“নামে কিছু আসে যায় না, গোলাপকে যে নামেই ডাকো না কেন, সে গন্ধ বিতরণ করবেই।”

মহান এ উক্তিটি কার, জানেন? স্বয়ং শেক্সপিয়ারের। নামকরণের গুরুত্বকে এভাবেই এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তারপরও কি নামকরণের গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেছে? কমেনি।

বরং বিবেচ্য যদি হয় কোনো স্থানের নামকরণ, তবে তো এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরো বেড়ে যায়। কেননা নাম তো শুধু নাম নয়। এটি কেবল সম্বোধনের কাজেই ব্যবহৃত হয় না। কোনো স্থানের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি অতি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলো প্রতিফলিত হয় তার নামের মাধ্যমেই।

তাই তো বিশেষ এ ধারাবাহিকের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করেছি ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার নামকরণের পেছনের ইতিহাস আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার। গত দুই পর্বের সূত্র ধরে, চলুন এ পর্বেও শুরু করে দেয়া যাক ইতিহাসের চাকায় চড়ে ঢাকার অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো।

চকবাজার

চকবাজারের নাম কে না শুনেছে! প্রতি বছর রমজান মাসে ইফতারির বিশাল বাজার বসায় এর খ্যাতি গোটা দেশজুড়ে। এছাড়া বছরের অন্যান্য সময়েও এখানে পাওয়া যায় দারুণ সব কাবাব। মজার ব্যাপার হলো, মুঘল আমলে গোড়াপত্তন ঘটা এ এলাকার পূর্বনাম আসলে চৌক বন্দর। তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি ছিল এর। ১৭০২ সালে নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর হাত ধরে এই পাদশাহী বাজারটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক বাজারে পরিণত হয়। পরবর্তীতে আবারো নতুন করে এর সংস্কার ও পুনঃনির্মাণ করেন ওয়াল্টার সাহেব।

এককালে ঢাকা ছিল বাগানের শহর; Image Source: Wikimedia Commons

মালিবাগ

গত পর্বগুলোয় বলেছি, ঢাকা শহরে বাগ বা বাগানের কোনো অভাব নেই। কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, সবজিবাগান থেকে শুরু করে শাগবাগ, পরীবাগ, স্বামীবাগ, মধুবাগ, টোলারবাগ ইত্যাদি এলাকাগুলোর নামকরণ তো হয়েছে সেসব জায়গায় অবস্থিত বাগানের কারণেই। এবং বুঝতেই পারছেন, বাগান করতে গেলে সেই বাগান দেখাশোনার জন্য প্রয়োজন মালিরও। ঢাকা শহরেও একসময় ছিল এমন প্রচুর মালি। সেই মালিরা নিজেদের বসতি গড়ে তুলেছিল যে এলাকায়, সেটিই আজ পরিচিত মালিবাগ নামে। এবং বলাই বাহুল্য, নিজেদের এলাকায়ও তারা বেশ জোরেশোরেই বাগান করত।

ইংলিশ রোড ও ফ্রেঞ্চ রোড

নাম শুনে মনে হওয়াই স্বাভাবিক, এই দুইটি সড়কের আশেপাশে বুঝি ইংরেজ ও ফরাসিদের আবাসস্থল ছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ইংলিশ ও ফ্রেঞ্চ দ্বারা আসলে কোনো জাতিবিশেষকে বোঝানো হয়নি। বরং এ দুটি আসলে দুজন ব্যক্তির নাম। ঢাকার একসময়কার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন মি. ইংলিশ। তার সম্মানার্থে ধোলাইখাল পাড়ের এই রাস্তাটির নামকরণ হয়েছে ইংলিশ রোড। একই রকম কাহিনী ফ্রেঞ্চ রোডের ক্ষেত্রেও। ঢাকার আরেক বিভাগীয় কমিশনারের নাম ছিল মি. এফসি ফ্রেঞ্চ। তার সম্মানে ১৯১৮ সালে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি এ রাস্তার নাম রাখে ফ্রেঞ্চ রোড।

ফরাশগঞ্জে ছিল ফরাসি বণিকদের আস্তানা; Image Source: Dhaka Tribune

ফরাশগঞ্জ

তবে ঢাকা শহরে ফরাসি জাতির নামানুসারে একটি এলাকা আসলেই আছে, যার নাম ফরাশগঞ্জ। বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে গড়ে উঠেছে ফরাসি বণিকদের স্মৃতিবিজড়িত এই এলাকা। ১৭৮০ সালে ঢাকার তৎকালীন নিমতলী কুঠির নায়েবে নাজিম নওয়াজিশ মোহাম্মদ খানের অনুমতি নিয়ে ফরাসি বণিকরা এখানে একটি গঞ্জ বা বাজার প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে ছিল কাঁচা হলুদ, আদা, রসুন ও মরিচের পাইকারি আড়ৎ। শুরুতে এর নাম দেয়া হয়েছিল ফ্রেন্সগঞ্জ। কিন্তু সাধারণ মানুষের মুখে ফ্রেন্সগঞ্জ হয়ে উঠেছিল ফরাসিগঞ্জ। এবং কালক্রমে সেই ফরাসিগঞ্জের বর্তমান রূপ ফরাশগঞ্জ।

ওয়ারী

বর্তমানে ঢাকা শহরে রয়েছে গুলশান, বনানী, বারিধারার মতো অভিজাত সব এলাকা। অথচ উনিশ শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত ঢাকা শহরে তেমন কোনো অভিজাত এলাকা ছিল না। তাই ১৮৮৪ সালে ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকায় একটি অভিজাত এলাকা গড়ে তুলতে হবে। যখন এই এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা হচ্ছিল, তখন ঢাকায় ম্যাজিস্ট্রেট পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন মি. অয়্যার। পৌরসভা তার সম্মানে এলাকার একটি রাস্তার নাম করে অয়্যার স্ট্রিট, আর পুরো এলাকার নাম হয়ে যায় অয়্যার। কিন্তু স্থানীয়রা শুরুতে সেই অয়্যারকে বানিয়ে দিয়েছিল উয়ারী। এবং এখন সেই উয়ারীও আরো বেশি বিকৃত হয়ে পরিণত হয়েছে ওয়ারীতে।

বংশাল পুকুর; Image Source: Dhaka Tribune

বংশাল

ইংরেজি শব্দ কতটা বিকৃত হতে পারে, তার আরো একটি চরম নিদর্শন বংশাল। মেরামতের জন্য বিভিন্ন নৌযানকে নৌবন্দরের যে বিশেষ তীরে নোঙর করা হয়, ব্রিটিশ আমলে সেটির নাম ছিল ব্যাঙ্কশাল। ঢাকার ধোলাইখাল যখন বুড়িগঙ্গার সাথে যুক্ত ছিল, ইংরেজরা সেখানে গড়ে তুলেছিল একটি ব্যাঙ্কশাল। মেরামতের জন্য নৌযান খাল দিয়েই আনা নেয়া করা হতো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ব্যাঙ্কশাল কথাটা বেশিদিন টেকেনি। স্থানীয়রা ব্যাঙ্কশালের বাংলা সংস্করণ হিসেবে আবিষ্কার করে বসেছিল বংশাল শব্দটি।

মিরপুর

ঢাকায় রয়েছে পুরের ছড়াছড়ি। কল্যাণপুর, শাহজাহানপুর, সূত্রাপুর, মোহাম্মদপুর, নবাবপুর, কমলাপুর এবং আরো কত কত পুর। কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় যে পুর, তার নাম মিরপুর। এককালে এই এলাকায় বসত ছিল মীর সাহেবের। তার নামানুসারেই গোটা এলাকা পরিচিত হয়েছে মিরপুর নামে। তবে এখানে যে নদী বন্দর রয়েছে, মুঘল আমলে তা ছিল শাহ বন্দর নামে খ্যাত। আর পাক আমলে এলাকাটি অবাঙালি অধ্যুষিত ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা শত্রুমুক্ত হলেও, মিরপুর ছিল ব্যতিক্রম। সবার শেষে, ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বাধীন হয় মিরপুর। তাই তো একে মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

মিরপুর ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণাঙ্গন; Image Source: Dhaka Tribune

ফার্মগেট

ফার্মগেটের নাম কে না শুনেছেন! প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু যেসব শিক্ষার্থীরা কোচিং করতে ঢাকায় পাড়ি জমায়, তাদের বেশিরভাগেরই প্রধান গন্তব্য এই ফার্মগেট। এই এলাকার নামকরণের কারণও বেশ অদ্ভূত। ব্রিটিশ সরকার কৃষি উন্নয়ন, কৃষি ও পশুপালন গবেষণার নিমিত্তে একটি ফার্ম বা খামার নির্মাণ করেছিল এই এলাকায়। সেই ফার্মের গেট বা প্রধান ফটকের নামানুসারেই গোটা এলাকার নাম হয়ে যায় ফার্মগেট।

শেষ কথা

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের চমকপ্রদ এসব ইতিহাস নিশ্চয়ই উপভোগ করছেন? এই বিশেষ ধারাবাহিকের এখানেই শেষ নয়। পরের পর্বে তুলে ধরা হবে ঢাকার আরো কয়েকটি এলাকার নামকরণের ইতিহাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Loading…

0

Comments

0 comments

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (পর্ব ২)

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার নামকরণের ইতিহাস (শেষ পর্ব)